পূর্বার মুখ দেখে রোহিণী বুঝল, আর তার বিষম খাবার দরকার নেই। চণ্ডীদাস সত্যিই বুদ্ধিমান লোক। পছন্দ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত তার দশ হাজার টাকার অফারটাকে সে টিকিয়ে রেখে যাবে।
‘যদি ছবি দেখতে যেতে বলেন, তাহলে আপনারা অবশ্যই যাবেন। জায়গাটা কোথায় সেটা জেনে নেওয়া দরকার। তার থেকেও বড়ো কথা, ছবিগুলো এখন কার হেফাজতে রয়েছে?’ রোহিণী দ্বিতীয় ভাজাটা মুখের কাছে থামিয়ে, কথাটা বলেই, কামড় দিল।
‘আপনি কি মনে করেন ছবিগুলো কেউ চুরি করেছে?’
‘আমি কিছুই মনে করি না। তবে নানান ধরনের কথাবার্তা কানে আসছে, ঘটনাও কিছু ঘটছে। আপনারা তো জানেনই শোভনেশের কেন যাবজ্জীবন হয়েছে। ওর বহু ছবিই—’ রোহিণী থেমে গেল। জাল হয়েছে বলে ফেলেছিল আর কী! ‘কে যে নিয়ে গেল সেই সময়।’
আর খেতে ইচ্ছে করছে না। রোহিণী উঠে দাঁড়াল। ‘পারছি না আর। শরীরটা সত্যিই ভালো নেই। বেসিনটা কোথায়?’
‘না, না, ভালো না লাগলে দরকার নেই খাওয়ার। এদিকে বেসিনটা।’ চণ্ডীদাস ব্যস্ত হয়ে ঘরের পিছনের দরজায় এগিয়ে গেল।
গাড়িতে ওঠার সময় রোহিণী বলল, ‘আমি পরশু রাতে এই সময় ফোন করে জেনে নেব, মি. ব্যানার্জি আপনাকে কী জানালেন।’
‘হ্যাঁ, তাই করবেন।’ চণ্ডীদাসের সঙ্গে পূর্বাও নমস্কার জানাল।
পার্কসার্কাস থেকে ডান দিকে ঘুরে মোটর ইস্টার্ন বাইপাস ধরে যখন সল্টলেকের দিকে যাচ্ছিল, তখন রোহিণী চিন্তায় ডুবে যাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিল। তার কাছে সবথেকে অবাক লাগছে, শোভনেশের ছবিগুলো কিনা এই ফ্ল্যাটেই ছিল আর সেখান থেকে বিক্রিও হত।
এরপর সে মীনা চ্যাটার্জির কথা ভাবল। বাঁ হাতটা আপনা থেকেই গালের দিকে উঠে গেল। বেশ জোরেই মেরেছে। বড়োই আচমকা চড়টা এল, একটু আগে আন্দাজ পেয়ে গালের মাসল শক্ত করে ফেললে এতটা লাগত না। রোহিণীর এখন মায়া হচ্ছে মীনার জন্য। ওকেই সুভাষ গায়েনের খুনি প্রতিপন্ন করার জন্য সে যা কিছু বলেছে, সবই তো আন্দাজে। আসলে ওকে চটিয়ে দিয়ে কিছু কথা বেরোয় কিনা সেটাই দেখতে চেয়েছিল। চিঠি দুটোর হাতের লেখা ওর কাজের মেয়েটির না—ও হতে পারে, সিঁড়ির বালবটা মীনা না—ও ভাঙতে পারে, সুভাষ গায়েনকে সে পাঁচিল থেকে না—ও ঠেলতে পারে—রোহিণী মাথা নাড়ল। আন্দাজগুলোকে সে টেনে লম্বা করার কাজটা একটু বেশিই করে ফেলেছিল, যেজন্য—সে গালে হাত বুলোল।
মীনার সন্দেহ, সুভাষ গায়েন ছবি জাল করার কারবার তুলে দিয়েছে বললেও, হাতে কিছু ছবি রেখে দিয়েছিল। সেই ছবিগুলো, এখন কোথায়? ওগুলোর খবর কি গঙ্গাদা জানেন না? হয়তো জানেন না, তাই হয়তো আজ মীনার কাছে এসেছিলেন খোঁজ করতে।
আর ওই চিঠি দুটো! কে এভাবে ভয় দেখাল মীরাকে? শোভনেশ নয়। যদিও বয়ান থেকে মনে হবে, সেই। মৃত্যু তালিকার তিন নম্বরে মীনা। এক নম্বর ছিল সুভাষ গায়েন। তাহলে দু নম্বরে কে? এভাবে চিঠিফিঠির কথা চিপ ডিটেকটিভ গল্পেই পাওয়া যায়। কিন্তু মীনাকে সত্যিই কেউ দিয়েছে। নইলে সে বলল কেন, কেউ ভয় দেখাতে চেয়েছে। ভালো। দেখাক। আমিও তা হলে দেখে নেব।
গাড়ি স্টেডিয়াম পেরিয়ে গেল। রোহিণী সোজা হয়ে বসল। এবার ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাড়ি পর্যন্ত। রাস্তার আলোয় সে হাতঘড়িতে সময় দেখল, পৌনে দশটা।
বাড়ির গেটের সামনে তুষার দত্তর গাড়িটা দাঁড়িয়ে। তার পিছনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রোহিণী নামল। ভিতর থেকে বেরিয়ে এল তুষার দত্ত, সঙ্গে এক বৃদ্ধ দম্পতি।
‘এখন ফিরছেন বুঝি! আমার কাকা আর কাকিমা, পৌঁছে দিতে যাচ্ছি।’
‘অ।’
‘আপনার একটা ফোন এসেছিল।’
‘ফোন? কে করেছে?’
‘নাম বলব না। আপনি নেই শুনে বলল, পরে আবার করবে।’
‘পরে মানে আজকেই কি?’
‘তাও কিছু বলল না, ঝপাত করে রেখে দিল। এই লোকগুলোকে নিয়েই হয় মুশকিল, এমন আধাখ্যাচড়া করে রাখবে ব্যাপার, এখন আপনি বসে থাকুন ফোনের জন্য। তবে যত রাতেই আসুক, আমি আপনাকে ডেকে আনব।’
‘ওঁরা দাঁড়িয়ে আছেন।’
‘ওহ, হ্যাঁ… কাকা গাড়িতে উঠুন, দাঁড়িয়ে কেন?’
‘আপনিও উঠুন, নইলে চালাবে কে?’
‘হাঁ উঠছি। আপনার বাঁ গালে একটা লালচে ভাব দেখছি, ধাক্কা—টাক্কা লেগেছিল নাকি?’
‘হ্যাঁ, একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল। ইয়া চেহারা! কী শক্ত মাসল! বোধ হয় বডিবিল্ডার।’
‘আপনি সঙ্গে সঙ্গে চড় কষালেন তো?’
‘পাগল, তাহলে আমার হাতটা ভেঙে যেত।’
‘না, না, আপনার এটা ভুল ধারণা। আপনি আমাকে মেরে দেখুন। শরীরটা ফুলের মতো নরম করে চড়টা অ্যাবসার্ব করে নেব।’
‘আচ্ছা, পরে এটা করে দেখব। ওনারা গাড়িতে বসে আছেন।’
রোহিণী হাসি চেপে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে, তখন দোতলার অন্ধকার বারান্দা থেকে কুন্তী ডাকল, ‘রুনিদি।’
মুখ তুলে সে তাকাল। ‘খবর কী তোমার?’
‘একবার আসুন না।’
একসঙ্গে দুটো করে সিঁড়ি টপকে রোহিণী দোতলায় উঠে এল। বেল বাজাবার আগেই দরজা খুলল কুন্তী।
‘এই কদিন তোমার তো টিকিটিও দেখতে পেলাম না। করো কী সারাদিন? কর্তা নেই বলে—’
কুন্তী ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বিস্ফারিত করল। ‘মাসিমার কাছে ঝাড় খেয়েছি, আবার আপনিও।’
‘বলবেনই তো। বাড়ির বউ, স্বামী এখন বাইরে, আর তুমিও সারাদিন বাইরে যদি ঘুরে বেড়াও তাহলে কি শাশুড়িরা বরণ ডালা নিয়ে অপেক্ষা করবে? এই সেদিন বাস থেকে দেখলাম তুমি বউবাজারের দিকে হেঁটে চলেছ। যাচ্ছিলে কোথায়, গহনা কিনতে?’
