অমরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ওরা কথা বন্ধ করল। দু—জন তার মুখ চেনা, অমরের ক্লাসেই পড়ে। তৃতীয়জনকে সে চেনে না। মুখে আলতো হাসি ফুটিয়ে সে একবার শুধু তাকাল মাত্র, যেভাবে বয়স্করা ছোটোদের দিকে তাকায়।
যাতে উনুন কামাই না যায় সেজন্য অনন্ত বাজারে যাবার পর শীলা উনুনে আঁচ দেয়। উনুন ধরে উঠতে উঠতে বাজার এসে যায়। দু—বেলার রান্না সে সকালেই সেরে নেয় কয়লা খরচ কমাতে।
অনন্ত যখন ফিরল শীলা তখন হাঁড়িতে ফুটন্ত জলে চাল ঢালছে।
‘বাবার একটা ধুতি বার করে দাও তো।’
‘কী করবি?’
শীলা বাষ্প থেকে মুখ সরিয়ে তাকাল।
‘পরবি?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুই বার করে নে না।’
ধুতি—পাঞ্জাবি কাচিয়ে তোলা ছিল। পুরোনো হলেও ব্যবহার কম হয়েছে। অনন্ত পাট ভেঙে ধুতিদুটো তক্তাপোশের উপর ছড়িয়ে দিল। দু—তিন জায়গায় ফুটো, বোধহয় পোকায় কেটেছে।
অমর ঘরে ঢুকল। ধুতির দিকে একবার তাকিয়ে সে পিছন ফিরে তাক—এ বইখাতা গোছাতে লাগল। অনন্তের মনে হল সকলেরই জামা ফ্রক প্যান্ট থানকাপড় দরকার আর সে কিনা আস্ত দুটো ধুতি পেয়ে যাবে!
‘দুটো রয়েছে, তুই একটা নিবি নাকি?’
‘নাহ ধুতি আমার চলবে না তা ছাড়া কেমন যেন বুড়োটে দেখায়।
অনন্ত অপ্রতিভ বোধ করল। তাকে কি সত্যিই বুড়ো দেখাবে? তার বয়সি কেউ ধুতি পরে এমন কাউকে তার মনে পড়ছে না।
‘তোর জুতোটা একদম গেছে।’
অমর জবাব দিল না। চেয়ারে বসে সে একটা বইয়ের উপর ঝুঁকে পড়ল।
‘জুতো কেনার মতো টাকা তো হাতে নেই, আমি যা পাই তাতে একমাসের চালও কেনা যাবে না।’
অমর বই থেকে চোখ সরাল না। অনু ঘরে ঢুকল।
‘দাদা, আমার পেনসিলটা নিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, এই নে।’
অনু বেরিয়ে গেল। ওর ফ্রকের পিঠের বোতামগুলো নেই, একটিমাত্র সেফটিপিন দিয়ে আটকানো। অনন্ত পাট মিলিয়ে ধুতিদুটো ভাঁজ করতে লাগল।
ভাত খাবার সময় শীলা বলল, ‘চুড়িটা বিক্রি না করলে তো আর চালানো যাচ্ছে না, কয়লাওলা এসেছিল, দু—মাস ওকে কিছু দেওয়া হয়নি, বলে গেল আর কয়লা দেবে না।’
‘কত পাবে?’
‘সাড়ে আট টাকা।’
‘তোমার কাছে যা আছে তাই থেকে দিয়ে দাও।’
‘বাকি দিনগুলো যে কী করে…’
মালকোঁচা দিয়ে ধুতি তার উপর নীল শার্ট। অনন্ত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করল তাকে বুড়োটে দেখায় কি না। শীলার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘কেমন যেন দেখাচ্ছে!’
‘কেন ঠিকই তো আছে।’
‘জামাটা ময়লা, ধুতির সঙ্গে মিলছে না।’
‘রাতে সাবান দিয়ে কেচে দোব।’
‘ওদের জন্য এবার কিছু কিছু কেনা দরকার…চুড়িটা থেকে কত পাবে?’
‘আটগাছা চুড়ি, হার, তোর বাবার আংটি, বোতাম নিয়ে চারভরি সোনা বিয়েতে দিয়েছিল। চুড়িগুলোয় আছে ছ—আনা করে।’
‘এতে কতদিন আর চলবে, অমর রোজগেরে হতে হতে এখনও পাঁচ—ছ—বছর তো লাগবেই।’
‘ভগবান ঠিক চালিয়ে দেবেন।’
বেরোবার সময় শীলা তাকে চার আনা আর কাগজে মোড়া চারখানা আটার রুটি দিল। ট্রামে—বাসে না চড়ে অনন্ত প্রায় একমাইল পথ হেঁটেই যাতায়াত করে। গলি দিয়ে যাবার সময় তার মনে হল সবাই যেন তার দিকে তাকাচ্ছে। পাড়ার কোনো লোকের সঙ্গে তার কথাবার্তা বলার মতো আলাপ নেই। সমবয়সিদের সঙ্গেও দরকার না হলে সে কখনো কথা বলে না। সবাই জানে সে কুনো, মুখচোরা, অমরের ঠিক উলটোটি।
দূর থেকে অনন্ত দেখল গৌরী সুলভ পুস্তক ভাণ্ডারের কাউন্টারে দু—গ্লাস চা রেখে ফিরে যাচ্ছে। তার বুকের মধ্যে হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। চায়ের দোকানের বেঞ্চে সেই ছোকরাটাও বসে রয়েছে যাকে সে সকাল—সন্ধ্যা যাতায়াতের সময় প্রায়ই দেখে। বছর পঁচিশ বয়স হবে। ডিগডিগে, লম্বা, ফরসা চেহারা। চোখা নাক। চুলে তেল নেই, সামনের দিকটায় ঢেউতোলা। ঘাড় কামানো। টেরিলিনের কালো প্যান্ট, ছুঁচলো জুতোটায় পিতলের বকলেস। গায়ে লাল গোলগলা ঝকমকে গেঞ্জি। কোনোদিন পরে সাদা ফুলশার্ট। একদিন তার কানে এসেছিল ছোকরাটি গৌরীর বাবাকে বলছে, ‘কাকাবাবু, একদিন খিদিরপুরে আমার সঙ্গে চলুন, মাল দেখুন…’
ছোকরা এখানে কেন বসে থাকে? গৌরীর জন্য? অনন্ত একটু দমে গেল। ছোকরার জামাপ্যান্ট জুতো ঝকঝকে দামি, পরিপাটি, দেখতেও ভালো, কথা বলে ঝরঝরে। অনন্ত নিজের সঙ্গে তুলনা করার কোনো চেষ্টাই করল না। চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় সে আড়চোখে দেখল ছোকরার দিকে তাকিয়ে গলার সবুজ পাথরের মালাটা বুড়ো আঙুল দিয়ে টেনে ধরে গৌরী হাসছে…’বাবা বাজার থেকে কিন্তু এখুনি এসে যাবে, খুলে রাখি?’
অনন্ত সামনের দিকে তাকিয়ে হেঁটে গেল। চাওয়ালার মেয়েকে নিয়ে আর সে মাথা ঘামাবে না। কিন্তু মনের মধ্যে একটা জ্বালা সে অনুভব করছে। কিছু একটা যেন সে চেয়েছিল অথচ সেটা তাকে দেওয়া হল না। কারোর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার মতো দাবি বা অধিকার তার কোথাও নেই। গৌরী সম্ভবত ভালো করে কখনো তাকে লক্ষও করেনি। তার ভালো লেগেছে মানেই যে গৌরীরও ভালো লাগবে এমন কোনো কথা নেই।
দুপুরে আলুর দম নিয়ে সে মাথা নীচু করে রুটি দিয়ে খাচ্ছিল। বেঞ্চে তার পাশে মোটর গ্যারাজের দু—জন। তারা পাঁউরুটি কিনে এনেছে। এখন রাস্তায় লোক চলাচল কম। লোকদুটো কথা না বলে খেয়ে যাচ্ছে। বাঁশ দিয়ে খাড়া—করা ত্রিপলের ছায়ায় একটা টুলে গৌরী বসে। খেতে খেতে অনন্ত একবার মুখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হল। হাতায় আলুরদমের ঝোল নিয়ে গৌরী উঠে এসে তার প্লেটে ঢেলে দিল।
