‘দারুণ, বহু বছর পর এমন জিনিস খেলাম।… না, না, আর পারব না—একটা সূত্র তো পাওয়া গেছে, আপনারা গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জির কাছে প্রচুর ছবি জমা করা আছে দেখেছেন। আচ্ছা, আপনারা যদি ওঁকে বলেন, আবার ছবি কিনতে চান। তা হলে তো আপনাদের নিয়ে যাবেন ছবি দেখাতে?’
রোহিণী তাকিয়ে রইল দু—জনের মুখের দিকে। তার মনে হচ্ছে, ওদের কিছুটা উত্তেজিত করা গেছে।
‘আইডিয়াটা মন্দ নয়।’
‘যদি আবার কমসমে মাস্টারপিস পাওয়া যায়!’ পূর্বা সত্যিই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। ‘তাহলে আর একটা এনে দিই?’
‘না না, একদম নয়। কী বড়ো বড়ো সাইজ! আবার খেলে রাতে আর কিছু খেতে পারব না।’ রোহিণী আঁতকে উঠল।
‘তাহলে রাতে আর আজ খেয়ে দরকার নেই।’ পূর্বা মোয়া আনতে চলে গেল। রোহিণী আশ্বস্ত হল। ফিরে গিয়ে আজ আর সেদ্ধ ডিম চিবোতে হবে না।
‘ফোন নাম্বারটা জানা থাকলে এখুনিই ওঁকে ফোন করতাম।’
রোহিণীর মুখস্থই আছে গঙ্গাপ্রসাদের বাড়ির নাম্বার। কিন্তু এঁর কাছে এখন সেটা মুখ থেকে বার করা মানেই বুঝিয়ে দেওয়া: গঙ্গাপ্রসাদকে সে খুব ভালো করেই চেনে, ফোন নাম্বারটা পর্যন্ত মনে করে রেখে দিয়েছে।
‘আচ্ছা, ফোন ডাইরেক্টরিতে তো পাব। এক মিনিট।’ চণ্ডীদাস ঘরের একধারে ব্র্যাকেটে রাখা টেলিফোনের কাছে গিয়ে তার তলার খোপ থেকে জাবদা বইটা বার করল।
‘আগে ‘বি’—টা দেখি তারপর ‘জি’ দেখব।’ পাতা ওলটাতে ওলটাতে চণ্ডীদাস নাম খোঁজায় মগ্ন হল। রোহিণী আর একবার ছবিটার দিকে তাকাল। সাদা কালো বরফি কাটা পাথরের মেঝেয় উবু হয়ে, দু—হাতে হাঁটু জড়িয়ে, স্তন দুটি ঊরুতে চেপে নগ্ন মডেলটি বসে রয়েছে। তার দেহের গড়ন নাকি হুবহু তার মতোই।
অবাক হয়ে রোহিণী তাকিয়ে থাকল। এই ছবি দেখা মানে তো তার নিজেকেই দেখা। আমি কি এইরকমই? রোহিণী নগ্ন নারীর প্রতিটি অংশে চোখ বোলাল। নট ব্যাড! মনে মনে তারিফ করল। মোয়া—টোয়া খেয়ে এমন একটা ফিগারকে নষ্ট করা একদমই উচিত নয়। তবে মোয়া গুড়ের তৈরি, চিনিতেই তো ওজন বাড়ায়।
চণ্ডীদাস ডায়াল করছে। নম্বর তাহলে পেয়েছে। রোহিণীর চোখ—কান সজাগ হল।
‘এটা কি গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জির বাড়ি?… আমার নাম চণ্ডীদাস ঘোষাল। উনি বাড়ি আছেন কি?… আচ্ছা আমি ধরছি।’ মাউথপিসে তালুচাপা দিয়ে চণ্ডীদাস নীচুগলায় রোহিণীকে বলল, ‘আছে। চাকর ধরেছিল, ডেকে দিচ্ছে।’
রোহিণী উঠে গিয়ে চণ্ডীদাসের পাশে দাঁড়াল। প্লেট হাতে পূর্বা ঢুকল। তাতে মাছ ভাজা।
‘আগে এগুলো খান, তারপর…’ চুপ করে গেল, রোহিণী তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ‘স স স স’ শব্দ করায়।
‘হ্যালো, নমস্কার, আমার নাম চণ্ডীদাস ঘোষাল,… আমাকে আপনার হয়তো মনে নেই, বছর সাতেক আগে আমি আর আমার স্ত্রী ছবি কিনতে গেছিলাম আপনার কাছে, শোভনেশ সেনগুপ্তর ছবি… অ্যাঁ আপনার মনে আছে? হ্যাঁ হ্যাঁ একটা ন্যুড কিনেছিলাম। তা, আমরা ওনার আর একটা ছবি রাখব ঠিক করেছি। হাজার চার—পাঁচের মধ্যে হলে পারব।’ চণ্ডীদাস আড়চোখে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে মাথা কাত করল। রোহিণীও মাথা নেড়ে অনুমোদন জানাল।
‘বলুন কবে যাব ছবি দেখতে?’
সারা ঘরে এখন হিচকক ফিল্মের ক্লাইম্যাক্স। পূর্বা আর রোহিণী টানটান হয়ে তাকিয়ে চণ্ডীদাসের মুখের দিকে। সেখানে অভিব্যক্তি বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তচাপ বদলাচ্ছে।
‘তাহলে কী করা যায়?’ চণ্ডীদাস জানতে চাইছে।
ক্লাইম্যাক্সটা আর একটু উপরে উঠল।
‘পরশু আবার ফোন করব? বাড়িতে, এই সময়ে?…হ্যাঁ, হ্যাঁ, আচ্ছা, নমস্কার।’
ফোন রেখে চণ্ডীদাস হাসল এবং গম্ভীর হল।
‘কী করা যায় মানে? ছবি কি আর নেই?’ পূর্বা উদবেগ প্রকাশ করল।
‘কী করা যায় মানে হল, ছবিটবি আর ওনার কাছে নেই। শোভনেশবাবু সব ছবি নাকি দিয়ে গেছেন একজনকে। তার নাম উনি বলতে রাজি নন। তবে তাকে উনি জিজ্ঞাসা করবেন, ছবি বিক্রি করতে রাজি আছে কি না। আমাকে বললেন, পরশু ফোন করে জেনে নিতে।’
‘তার মানে ছবি তাহলে রয়েছে। কিন্তু কার কাছে, কোথায় রয়েছে, সেটা জানার জন্য পরশু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তাই তো?’ রোহিণী কথা বলতে বলতে পূর্বার হাত থেকে প্লেটটা নিল। বড়ো আকারের চারটে পার্শে মাছ ভাজা।
‘এ কিন্তু খুব অন্যায়, এতগুলো ভাজা কি খাওয়া যায়?’ মিষ্টির পর এই তেলে ভাজা মাছ। তেলও তো চর্বি তৈরি করে। কী যে মুশকিলে পড়া গেল। রোহিণী বিরক্ত হল নিজের উপর। এইসব খাবার জিনিস তার চোখের সামনে ধরে দেওয়া কেন! জিনিয়াসের স্ত্রীকে খাতির করা?
‘বসুন তো, আপনি বাচ্চচাও নন, বুড়িও নন। মোটে তো চারটে!’ পূর্বা হাত ধরে তাকে সোফায় বসিয়ে দিল।
‘যদি মিস্টার ব্যানার্জি বলেন, হ্যাঁ ছবি আছে বিক্রির জন্য, দেখতে আসুন, তাহলে?’
‘তাহলে দেখতে যাব, পছন্দ হলে কিনেও নেব। তুমি তো চার—পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম দিতে রাজি হলে।’
‘ওটা তো একটা টোপ দিলাম।’
‘সত্যি সত্যি নয়!’ পূর্বা ফ্যালফাল করে তাকিয়ে থেকে, ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠল। রোহিণী অস্বস্তি বোধ করে ভাবল, বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করবে। পূর্বা তাহলে ব্যস্ত হয়ে জল আনতে ছুটবে। সে বার দুই খুক খুক করেছে মাত্র, তখনই চণ্ডীদাস বলল, ‘চার পাঁচ কী, দশ পর্যন্ত দেব যদি এইরকম পছন্দের একখানা পেয়ে যাই।’
