বড়ো শিল্পীর স্ত্রীকে বাড়িতে এনেছে, তাকে কীভাবে যে আপ্যায়িত করবে, ঠিক করতে পারছে না ঘোষালরা।
‘শুধু জল কী দেওয়া যায়’, পূর্বা ঘোষাল দ্রুত বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রোহিণী বুঝতে পারছে তার ভাগ্যে এবার কী আসছে। প্লেট—ভরতি একগাদা মিষ্টি এবং সেই প্লেট সাফ করে তাকে অন্তত এক কিলো চর্বি সংগ্রহ করতে হবে। করতে হয় হোক, এখানে যদি পূর্বা ঘোষাল তাকে টেনে না আনত, তাহলে অনেক ব্যাপারেই সে অন্ধ থেকে যেত। চোখ খুলে যাওয়ার সাহায্য করার ঋণ শুধতে এক কিলো চর্বি বাড়িয়ে ফেলাটা কোনো ব্যাপারই নয়।
কিন্তু মাথাটা সত্যিই টিপটিপ করছে। সন্দেহ, শঠতা, ভয়, অবিশ্বাস, চমক ইত্যাদি ব্লাডপ্রেশার ও পালস রেট বাড়াবার যতরকম উপায় আছে, তার প্রত্যেকটা এখন রোহিণীর সহনক্ষমতা পরীক্ষায় নেমে পড়েছে।
সোফায় দু—হাতে কপাল চেপে ধরে রোহিণীকে বসে থাকতে দেখে চণ্ডীদাস বলল, ‘এতদিন পর ছবিটা হঠাৎ দেখার জন্যই বোধ হয়… একটা ইমপ্যাক্ট হয় তো!’
‘তাই হবে বোধ হয়।’
‘ওনার তো অনেকগুলো ছবিই তখন দেখেছিলাম, সবই কি বিক্রি হয়ে গেছে?’
‘বলতে পারব না। ছবির ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, খবরও রাখি না।’
‘সে কী! ছবির মালিক তো এখন আপনি।’
‘কিন্তু ছবিগুলো নাকি নষ্ট হয়ে গেছে। যার কাছ থেকে আপনি এই ছবিটা কিনেছেন তিনি ওঁর বন্ধু, নাম গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি। তিনি আমাকে বলেছেন, শোভনেশের সব ছবিই অযত্নে নষ্ট হয়ে গেছে।
‘ইসস, এখন তো কয়েক লক্ষ টাকা দাম হত।’
হঠাৎ রোহিণীর মনে হল, এই লোকটির কাছে তার মনের সন্দেহের কথা বোধহয় বলা যায়। বুদ্ধিমান, কর্মঠ এবং সহৃদয়, সবথেকে বড়ো কথা, শোভনেশের গুণগ্রাহী। একে কোনো কাজ করে দেবার জন্য অনুরোধ করলে সম্ভবত চেষ্টা করবে।
পূর্বা ঘরে ঢুকল, পিছনে ঝি—এর হাতে ট্রে।
‘না বলবেন না। খুব সামান্যই।’
রোহিণী প্লেটের দিকে তাকিয়েই বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ‘না’ বলব না। তবে আমারও একটা অনুরোধ আছে, সেটা রাখতে হবে।’
স্বামী—স্ত্রী তাকিয়ে রইল। ক্রিকেট—বল সাইজের দুটো মোয়ার একটা প্লেট থেকে তুলে নিয়ে রোহিণী বলল, ‘শোভনেশের ছবিগুলো আমার মনে হয়, নষ্ট হয়নি। সেগুলো কোথাও, কারোর কাছে রয়েছে।’
‘বলেন কি?’
‘আপনি যেখানে গিয়ে ছবি কিনেছেন, সেই ফ্ল্যাটেই আমি এখন থাকি। আপনি তো অনেকগুলো ছবিই সেখানে দেখেছেন।’
‘নিশ্চয়ই।’ চণ্ডীদাস বলল।
‘আপনি কিন্তু খাচ্ছেন না।’ পূর্বা বলল।
রোহিণীর মুহূর্তের জন্য সুভাষ গায়েনকে মনে পড়ল। এদের বদলে ওই লোকটা এখন থাকলে স্বচ্ছন্দে সে বলতে পারত, একটা ঠোঙায় ভরে দিন, বাড়িতে গিয়ে সকালে খাব।
‘হ্যাঁ খাচ্ছি।’ রোহিণী কামড় বসাল। অনবদ্য, মনে মনে বলল, নলেন গুড় ব্যাপারটাই অন্যরকম।
‘আমার ছবি আনার কিছুদিন পরই ওই মিসহ্যাপটা ঘটল। তার মধ্যে কি আর উনি অতগুলি ছবি বিক্রি করতে পেরেছিলেন? মনে হয় না।’ চণ্ডীদাস কথাগুলো বলল ভেবেচিন্তে।
‘আমারও তাই ধারণা। তাহলে ছবিগুলো গেল কোথায়, সেটাই খুঁজে বার করতে হবে।’
‘ওই লোকটার কাছে থাকতে পারে।’ পূর্বা বলল। ‘তখনই আমার যেন কেমন কেমন মনে হয়েছিল।’
‘তোমার আবার কী মনে হয়েছিল? কই কিছু তো তখন আমায় বলোনি।’
‘বলার মতো মনে হয়নি বলেই বলিনি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এত যে ছবি, এসবই কি ওঁর রিসেন্ট কাজ? তাইতে লোকটা বলল, প্রত্যেকটাই টাটকা। শোভনেশবাবুর ধারণা, তিনি নাকি শিগগিরই পাগল হয়ে যাবেন। তাই যা কিছু আঁকছেন, সবই তাঁর ওই বন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। পাগল হয়ে গেলে খাবেন কী? সংসার চলবে কী করে? বন্ধুই তখন ছবি বিক্রি করে ওনার খরচ চালাবে। এইরকম ঘটবেই ভেবে নিয়ে নাকি সারাদিন ধরে উনি ছবি আঁকছেন আর সেগুলো জমা করে যাচ্ছেন। তার দরুনই এত ছবি জড়ো হয়েছে।’
‘এত কথা কখন তোমাদের মধ্যে হল?’ চণ্ডীদাস জানতে চাইল।
‘তুমি তখন অন্য ঘরে কমল বলে লোকটার সঙ্গে ছবি দেখছিলে। শোন না, তারপর আমি বললাম, শোভনেশবাবুর এমন ধারণা হল কেন যে, তিনি পাগল হয়ে যাবেন? তাইতে ওই মোটা লোকটা বলল, ওদের বংশে পাগল হয় প্রতি পুরুষে একজন করে। শোভনেশবাবুর মনে হয়েছে, তিনিও হবেন। অদ্ভুত!’
‘কথাটা হয়তো ঠিকই।’ চণ্ডীদাস ছবির দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু আবেগ মাখিয়ে বলল, ‘পাগলামির ছোঁয়া না থাকলে জিনিয়াসদের ক্রিয়েটিভ প্রসেসটা… মানে সৃজনের, কী বলব…?
স্বামীকে অসহায়ভাবে কথা হাতড়াতে দেখে পূর্বা বলল, ‘পাগলরাই ভালো ছবি আঁকে।’
‘না, না, তা ঠিক বলছি না। পুরো পাগলরা আঁচড়ানো কামড়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। আমি বলছি জিনিয়াসরা এক ধরনের পাগলই হয়।’
‘চণ্ডীদাসবাবু’, আলোচনার মোড় ঘোরাবার জন্য রোহিণী দ্বিতীয় মোয়াটা তুলে নিল। তাই দেখে খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠল পূর্বার চোখ। ‘শোভনেশের সেই বন্ধুটি খুব বাজে কথা বোধ হয় বলেনি। সত্যিই ওদের বংশে এইরকম একটা ব্যাপার আছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, প্রতি পুরুষে একজন করে পাগল সত্যিই হয়েছে। কিন্তু আমাদের জানার বিষয়, ছবিগুলো এখন কোথায়, কার কাছে। আর সেটা খুঁজে বার করার জন্য আপনাদের একটু সাহায্য চাইব।’
‘আমাদের! কীরকম?’ চণ্ডীদাস বলল।
‘ভালো নয় মোয়াগুলো? জয়নগরে আমার বাপের বাড়ি থেকে আজ পাঠিয়ে দিয়েছে।’
