‘ইচ্ছে হওয়াই স্বাভাবিক। ছবি যাঁরা বোঝেন, তাঁদের কাছে শোভনেশবাবুর এই ছবিটা বারবার দেখতে ইচ্ছে করবে।’ কথাটা বলে, চণ্ডীদাস চাপা গর্বে উদভাসিত মুখটা ফিরিয়ে, বাঁ হাতটা ঘরের একটা কোণের দিকে তুলল। আকারে ঘরটি চৌকো নয়, লম্বাটে। দু—ধারের দেওয়াল ঘেঁষে সোফা, মাঝে কার্পেট, কোনো টেবিল নেই। দেওয়ালে আলোর ব্রাকেট। রোহিণী ঘরে ঢুকে বাঁদিকটা লক্ষ করেনি। প্রায় তিরিশ ফুট দূরের কাঁঠালিচাঁপা রঙের দেওয়ালে, যে—একটা ছবি সাঁটা রয়েছে, আলোর ব্যবস্থার কারসাজিতে, সেটা এতক্ষণ তার নজরে আসেনি।
রোহিণী পায়ে—পায়ে এগিয়ে গেল ছবিটার দিকে। ওদিকটায় আলো কম। চণ্ডীদাস ব্যস্ত হয়ে সুইচ বোর্ডের দিকে প্রায় ছুটে গেল। সিলিং থেকে জোরালো স্পটলাইট পড়ল, ছবির উপর। রোহিণী থমকে গিয়ে স্তম্ভিত স্বরে বলে উঠল, ‘একি!’
সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজেকে সম্বৃত করে, ছবির কাছে গিয়ে চোখ সরু করে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল। তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে স্বামী—স্ত্রী। ঘরের অন্য লোকটি, সম্ভবত ব্যবসা সংক্রান্ত কাজেই এসেছিল, ইতিমধ্যে বিদায় নিয়ে চলে গেছে।
‘খুব সস্তায়, মাত্র দেড় হাজার টাকায় পেয়েছি। ভাবলে অবাক লাগে!’
রোহিণী পিছনে না তাকিয়েই বলল, ‘এটা কি আমাদের বাড়িতেই ছিল, নাকি অন্য কোথায়?’
‘আপনাদের বাড়িতে কিছু ছবি দেখিয়েছিলেন শোভনেশবাবু। তারপর বললেন, আরও যদি দেখতে চান, তা হলে অন্য জায়গায় রাখা আছে, সেখানে গিয়েও দেখতে পারেন।’
‘গোয়াবাগানে?’ রোহিণী অস্ফুটে বলল। তার প্রথমেই মনে এসেছে সুভাষ গায়েনের কথা।
জবাব না পেয়ে রোহিণী মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। স্বামী—স্ত্রী মুগ্ধ চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে। দেখে তার মায়া হল। নিজেদের বিদগ্ধ, রুচিবান, শিল্পবোদ্ধা, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ইত্যাদি বোঝাবার জন্য নামি চিত্রকরের আঁকা ছবি কিনে এনে ঘরে রেখেছে। কিন্তু ছবিটা যে জাল, সেটা আর জানে না। রোহিণীও জানত না, যদি না সে ঠিক এই ছবিটাই কয়েকদিন আগে মীনা চ্যাটার্জির ঘরে দেখত।
ছবির আসল—নকল বোঝার মতো শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা তার নেই। কিন্তু সুভাষ গায়েন জানত কোনটে তার কারখানার প্রোডাক্ট আর কোনটে ওরিজিন্যাল। যেখানে বাস করছে, সেখানে কোনোমতেই সে লোককে দেখাবার জন্য জাল ছবি রাখবে না। অন্তত নিজের শালি, মীনার ঘরে তো নয়ই।
‘গোয়াবাগানে সুভাষ গায়েন নামে একটি লোকের কাছে ওঁর বহু ছবি ছিল। টাকাপয়সার ব্যাপারে তিনিই কথা বলতেন। কিন্তু এত কম দামে যে দিয়েছিলেন, এটা ভেবে আশ্চর্য লাগছে। সুভাষবাবু তো খদ্দেরদের গলা কাটতে ওস্তাদ ছিলেন।’
‘আমি তো গোয়াবাগানে গিয়ে ছবি কিনিনি।’
শুনেই ভ্রুকুটি করল রোহিণী। বলে কী! নকল ছবি সুভাষ গায়েন ছাড়া আর কার কাছ থেকে তাহলে কেনা সম্ভব। শোভনেশ এদের কোথায় তাহলে পাঠিয়েছিল?
‘তাহলে কার কাছ থেকে কিনেছিলেন?’ খুব স্বাভাবিক গলায় রোহিণী জানতে চাইল।
চণ্ডীদাস কিছু বলার আগেই পূর্বা বলল, ‘শোভনেশবাবু ওঁর এক বন্ধুর কাছে আমাদের যেতে বললেন। এই যে মহারানি নামে ম্যাগাজিনটা, তারই মালিক। আমরা ফোন করলাম তাঁকে। তিনি আমাদের যেতে বললেন সল্টলেকের একটা বাড়িতে, তিনতলার ফ্ল্যাটে।’
‘অ্যা!’ রোহিণী নিজের কানকে এমন অবিশ্বাস জীবনে কখনো করেনি, এবং এমন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এভারেস্টচুম্বী বিস্ময়কে শহিদ মিনারের মাথায় নামিয়ে আনতে তার অসুবিধে হচ্ছে বইকী। ‘সল্টলেকে? সি ডি ব্লক? সেকেন্ড অ্যাভিনুয়ে? তিন নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে?’
‘বোধ হয়। এখন আর ঠিক মনে করতে পারছি না। আমরা তো ওঁর গাড়িতেই গেছিলাম। সেখানে প্রচুর ছবি ছিল। দুটো ঘরে।’
‘কোনো লোকজন ছিল না? মানে সেই ফ্ল্যাটে কেউ বাস করত না?’
‘বয়স্ক একজনকে দেখেছি, কেয়ারটেকারই হবে। বেল বাজাতে সে ভিতর থেকে দরজা খুলে দিয়েছিল।’ পূর্বা বলল।
হঠাৎই রোহিণীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘কমলবাবু বোধ হয়।’
‘কমলবাবু। তাই কী?’ চণ্ডীদাস গভীর চিন্তায় ডুব দিল নামটা কুড়িয়ে আনতে। ‘হতে পারে।’
‘হতে পারে কি?’ পূর্বা তার স্বামীকে বিস্মৃতির তলদেশ থেকে টেনে তোলার জন্য বলল, ‘ওই নামেই তো উনি লোকটাকে ডেকে বললেন, ছবিগুলো দেওয়ালের গায়ে সাজিয়ে দাও, এঁরা দেখবেন। তোমার মনে পড়ছে না?’
কমলদা! রোহিণী ঢোঁক গিলল। আর কিনা গঙ্গাদার ওই ফ্ল্যাটেই জমা করা ছিল জাল ছবিগুলো! শোভনেশ নিশ্চয় তা জানত। এখন সে ছবিগুলো ধ্বংস করার জন্য এই ফ্ল্যাটে আসতে চাইবে। সে তো আর জানে না, গত ছ—বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। ছবিগুলোর বদলে এখন সেখানে বসবাস করছে কে, সে কথাটা ওকে গঙ্গাদা বলেছেন কি?
‘আপনি বসুন, চা না সফট ড্রিংকস?’
‘শুধু এক গ্লাস ঠান্ডা জল। মাথাটা কেমন যেন টিপটিপ করছে। শরীরটা ভালো লাগছে না। আমি কিন্তু এখনি যাব।’
রোহিণী এমন কাতর স্বরে বহু বছর কথা বলেনি। বহু বছর তার নিজের শরীরকে এত অপটু কখনো মনে হয়নি।
এই সরল, যথেষ্ট সচ্ছল, শিল্পপ্রেমী দম্পতিকে রোহিণীর বলতে ইচ্ছে করল না, যে—ছবিটা অত যত্নে, শ্রদ্ধায় শোভনেশের একটা মাস্টারপিস ভেবে ঘরে রেখেছেন, আসলে সেটা জাল। মূল ছবিটা রয়েছে মীনা চ্যাটার্জির ঘরে, যেটা সে রোজ রাতে চোখের সামনে রেখে ঘুমের দেশে পা বাড়ায়।
