‘বিপদ নিয়ে রসিকতা করবেন না মিসেস সেনগুপ্ত।’
‘আবার মূল্যবান উপদেশ!’
‘ঠিক আছে, আপনি আসুন।’
রোহিণী দরজা খুলে ল্যান্ডিংয়ে বেরিয়েই দেখল লিফটটা আবার চারতলায় উঠে যাচ্ছে। এখুনি নেমে আসবে। তাহলে দাঁড়ানোই যাক। পায়ের ব্যায়াম নয় হেঁটেই করে নেবে। সে লিফটের বোতাম টিপল।
বিপদ আসছে। রোহিণী ভাবতে শুরু করল, কীভাবে কোথা দিয়ে আসতে পারে। সুভাষ গায়েন তো খারিজ হয়ে গেছে, তা হলে বাকি থাকল—গঙ্গাদা আর মীনা। এই দু—জন একই ধরনের কথা তাকে বলল, এটাই অবাক লাগছে।
মীনার পক্ষে কি সম্ভব সুভাষ গায়েনকে ঠেলে ফেলে দেওয়া? অত গায়ের জোর কি ওর আছে? কিন্তু পাঁচিলে দাঁড়ানো ভারী লোককেও হাঁটুর কাছে সামান্য ঠেলা দিলেই ব্যালান্স হারাবে আর সুভাষ গায়েন তো রোগাই ছিল। কেন জানি, এই মেয়েটিকে অবিশ্বাস করতে রোহিণীর মন সায় দিচ্ছে না। কোথায় যেন ওর একটা চারিত্রিক সত্যতা, গভীরতা আছে। নইলে এখনও পর্যন্ত শোভনেশের জন্য—। তার চিন্তার গতি বন্ধ হল নেমে আসা লিফট থেমে যাওয়ায়।
লিফটের ভিতরে সেই চারতলার বউটি, যাকে দেখে রোহিণীর মনে হয়েছিল, কোথায় যেন দেখেছি একে। আর এ—ও অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। হয়তো ওরও ঠিক একইরকম মনে হচ্ছিল, কোথায় যেন দেখেছি।
লিফটের কোলাপসিবল দরজাটা বন্ধ করে রোহিণী বলল, ‘গ্রাউন্ড ফ্লোর?’
‘হ্যাঁ’।
দু—জনে পাশাপাশি চুপচাপ। দোতলা পার হল।
‘আপনাকে মনে হচ্ছে যেন চেনা চেনা!’
‘আমারও তাই লাগছে।’ রোহিণী মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল। লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে থেমেছে। দু—জনে বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল।
‘আমার নাম রোহিণী সেনগুপ্ত, আমি—।’
‘আ—আ—আ, এইবার মনে পড়েছে। আপনাদের বাড়িতে গেছিলাম একটা ছবি কেনার ব্যাপারে। সে প্রায় ছয় কী সাত বছর আগের কথা। দোতলার বড়ো ঘরটায় আমি, আমার স্বামী আর শোভনেশবাবু কথা বলছিলাম, তখন তিনতলা থেকে নেমে এসে আপনি কী একটা কথা জিজ্ঞাসা করে চেলে গেলেন।’
মনে পড়েছে রোহিণীর। স্বামী—স্ত্রী এসেছিল বটে ছবি দেখতে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে তাকিয়ে ওদের দেখেছিল। ছবি কিনেছিল কিনা সে জানে না। শোভনেশ তাকে কিছু বলেনি, সেও আর জিজ্ঞাসা করেনি।
‘ছবি কিনেছিলেন?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়। ফটকের দিকে এগোতে এগোতে বউটি বলল, ‘আমাদের প্রথম ম্যারেজ অ্যানিভারসারি ছিল। উনি বললেন, তোমাকে ছবি প্রেজেন্ট করব। চলো, পছন্দ করবে। কম দামে বড়ো আর্টিস্টের ছবি কেনার একটা সুযোগ এসে গেছে, ছাড়া উচিত নয়। শোভনেশ সেনগুপ্ত থ্রো অ্যাওয়ে প্রাইসে ওঁর পেইন্টিংস বিক্রি করছেন খবর পেয়েছি।’
‘কোথা থেকে খবর পেয়েছেন?’
‘আমার ঠিক মনে নেই, উনি হয়তো বলতে পারবেন।’
‘আপনার স্বামীকে কোথায় পাওয়া যাবে?’
‘বাড়িতে। গড়িয়াহাট রোডে আমরা থাকি। এখানে আমার জ্যাঠামশাইরা থাকেন। আমার ছেলের অন্নপ্রাশন, তাই বলতে এসেছিলাম। এটি দ্বিতীয় পুত্র। ওহো, এখনও আমি আমার নামটাই বলিনি, আমার নাম পূর্বা ঘোষাল, স্বামীর ছোটোখাটো একটা লোহালক্কড়ের ব্যবসা আছে,ওঁর নাম চণ্ডীদাস। আপনি ওঁর সঙ্গে কথা বলবেন? তা হলে চলুন না, গাড়ি রয়েছে।’
‘আমি থাকি সল্টলেকে। এত রাতে গড়িয়াহাট থেকে ফেরার ট্রান্সপোর্ট পাওয়া শক্ত। সল্টলেক যাব বললেই ট্যাক্সিওয়ালারা মাথা নেড়ে দেয়।’
‘ওসব আপনাকে ভাবতে হবে না, পৌঁছে দেবার ভার আমার।’
‘ছবিটা এখন কোথায়?’ রোহিণী জানতে চাই, চোখেমুখে কৌতূহল মাখিয়ে।
‘আমাদের বসার ঘরে। উনি তো বলেন, শোভনেশবাবুর মাস্টারপিসগুলোর মধ্যে এটা পড়ে।’
‘ন্যুড?’
‘হ্যাঁ।’
রোহিণী হঠাৎই স্মৃতিভারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। ২৫ দিগম্বর বর্ধন লেনের বাড়িটা চোখের সামনে পলকের জন্য ভেসে উঠল। তুলি হাতে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ানো, শোভনেশের চেহারাটাও মনে পড়ল। সেই ডিভানটা, চৌকো সাদা—কালো মার্বেল টালির মেঝে, গরাদহীন বিরাট বিরাট জানালা, নিমগাছ, ঘরের উঁচু সিলিং, কাঠের কড়িবরগা, পরপর সার বেঁধে চলে গেল চোখের সামনে দিয়ে।
‘ছবিটা দেখতে ইচ্ছে করছে।’
‘দেখে আসবেন চলুন।’ পূর্বা ঘোষাল হাত ধরে রোহিণীকে টানল।
পেভমেন্টের ধারে, একটা জলপাই রঙের মারুতি অপেক্ষা করছে। ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়াল।
দশ মিনিটের মধ্যে গড়িয়াহাট রোড ছেড়ে বাঁদিকের একটা রাস্তায় ঢুকে, দু—তিনটে বাঁক নিয়ে ছোটো একটা দোতলা বাড়ির সামনে মারুতি থামল। একতলায় বসার ঘরে দু—জন লোক কথা বলছিল। তাদের একজনকে পূর্বা বলল, ‘দ্যাখো, কাকে ধরে এনেছি। মনে করতে পারবে কি? অবশ্য খুব অল্পক্ষণের জন্য, আধ মিনিট বড়ো জোর, দেখেছিলে।’
লোকটি অবাক মুখে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভ্রুদুটি একবারই শুধু ওঠানামা করল।
‘এনাকে তুমি পেলে কোথায়! মনে করতে পারব না মানে?’
লোকটির চোখ, রোহিণীর মুখ থেকে নীচের দিকে নামতে গিয়ে শালীনতার বেড়ায় আটকে গেল। রোহিণীর মনে হল, লোকটি বুদ্ধিমানই, বউয়ের সামনে কী কী কাজ করতে নেই, সেটা জানে। পরিচয় করিয়ে না দিলেও সে বুঝে গেছে ইনিই গৃহস্বামী চণ্ডীদাস, ছবিটার বর্তমান মালিক। বছর চল্লিশ বয়স, শ্যামবর্ণ, সুশ্রী, খাটিয়ে স্বাস্থ্য।
‘উনি ছবিটা দেখতে এসেছেন। জ্যাঠামশায়ের ওখানে, লিফটে আলাপ হল। আমরা ছবিটা কিনেছি শুনে বললেন, একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
