মীনা শেষ দিকে ফুঁপিয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে অবশ হয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ছিল, রোহিণী দু—হাতে তাকে জড়িয়ে টেনে সোফায় এনে বসাল।
‘তারপর?’
‘গঙ্গাপ্রসাদবাবু বললেন, শোভনকাকা আমার এখানে কিছুতেই আসবেন না, এলেই তো সুভাষদা তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন। আমি বললাম সে ব্যবস্থা আমি করছি, আপনি শোভনকাকাকে আমার কাছে আসতে বলুন।’
‘সুভাষবাবুর সঙ্গে তারপর আপনি কথা বললেন?’
‘হ্যাঁ। নকল ছবির কথা তুললাম। সুভাষদা বললেন তাঁর কাছে একটাও নেই। দিদি মারা যাবার পরই তিনি এই ব্যবসা তুলে দেন। কিন্তু আমার মনে হল, কথাটা পুরো সত্যি নয়। ব্যবসাটা তুলে দেন ঠিকই, কিন্তু কিছু ছবি রয়েও যায় তাঁর হাতে, সেগুলো কোথায়? ওঁর সঙ্গে তর্কাতর্কি শেষে ঝগড়াও হল। আমি সুভাষদাকে ফ্ল্যাট ছেড়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চলে যেতে বললাম। উনি জেদ ধরলেন, যাবেন না। তারপর…’
‘তারপর?’ রোহিণী দমচাপা স্বরে বলল। এতক্ষণে তার যাবতীয় আন্দাজ আর অন্ধকার হাতড়ানো বোধ হয় শেষ হতে চলেছে। ‘তারপর ওঁকে অ্যান্টেনার তার ঠিক করতে পাঠালেন?’
মীনা একদৃষ্টে বুদ্ধের মাথাটার দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে বসে রইল। চোখের পাতা পড়ছে না, শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। যেন অন্য কোনো জগতে তার মন। রোহিণী অপেক্ষা করতে লাগল পারিপার্শ্বিকের প্রতি ওর সচেতনতা ফিরে আসার জন্য।
‘কিন্তু আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন, আমিই ওঁকে ঠেলে দিয়েছি? এটা তো দুর্ঘটনাই। পুলিশও ইনভেস্টিগেট করে তাই বলেছে। সুভাষদা এখন পঞ্চভূতে বিলীন, তাঁর পক্ষেও আর বলা সম্ভব নয় এটা দুর্ঘটনা না অন্য কিছু।’
পৃথিবীতে বহু খুন কাগজে কলমে আনসলভড থেকে গেছে। এটাই তাই হবে। খুনি কে জেনেও, রোহিণী কিছু করতে পারবে না। করার জন্য কোনোরকম উৎসাহ, ইচ্ছা বা তাগিদও আর তার মধ্যে নেই। সে নিজেকে আর এর মধ্যে জড়াতে রাজি নয়।
মীনা আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আবেগের একটি ফোঁটাও আর কণ্ঠস্বর থেকে ঝরে পড়ল না। ধীরে ধীরে কুটিল ভাঁজ কপালের চামড়ায় জেগে উঠেছে। চাহনিতে আবার পুনর্বাসন পেয়েছে সতর্কতা। মেঝেয় পড়ে গেছিল চিঠি দুটো, মীনা নীচু হয়ে কুড়িয়ে নিল।
‘এই দুটো কার লেখা?’
‘আমার নয়।’
‘ঠিক বলছেন?’
মীনা ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। ‘মিথ্যে কথা বলার কোনো দরকার আর আছে বলে মনে করি না।’
রোহিণী দরজার দিকে এগোল। এই ফ্ল্যাটে এক মিনিটও আর সে থাকতে চায় না। তার মনে হচ্ছে, আজকালের মধ্যেই সে একটা ফোন পাবে। না, রাজেন নয়। অন্য কেউ। কিন্তু কার কাছ থেকে।
ফ্ল্যাটের দরজাটা টেনে বন্ধ করার সময় রোহিণী ভিতরে একবার চোখ রাখল। মীনা বসে রয়েছে তার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে। চিঠি হাতের মুঠোয় দলা পাকাচ্ছে। দরজাটা আবার খুলে রোহিণী ভিতরে একপা ঢুকে বলল, ‘শোভনেশ আমায় টেলিফোন করতে পারে। ওকে কি এখানে আপনার কাছে আসতে বলব?…না না, আমি পুলিশ—টুলিসে খবর দেব না।’
রোহিণী কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল উত্তর পাবার জন্য। আড়চোখে দেখল, চারতলা থেকে লিফটটা নীচে নেমে যাচ্ছে। যাক, সে সিঁড়ি ভেঙেই একতলায় নামবে। পায়ের ব্যায়ামটা তাতেই যতটুকু হবার হয়ে যাবে।
মীনা একইভাবে নির্নিমেষে তাকিয়ে।
‘বলুন? ওকে কি তা হলে—’
‘না। বলবেন না। …ওনাকে আসতে বলবেন না, তাহলে হয়তো উনি মাডারর্ড হতে পারেন।’
‘সে কী!’ রোহিণী দরজা বন্ধ করে পায়ে পায়ে মীনার সামনে এসে আবার বলল, ‘এ তো বড়ো অদ্ভুত কথা। শোভনেশ কেন খুন হতে যাবে? কে ওকে খুন করতে পারে? কী উদ্দেশ্য, কোন কারণে?’
মীনা মাথা নাড়ল, সে বলবে না।
‘আরে, কথা বলুন।’ রোহিণী অধৈর্য, বিরক্ত হয়ে উঠল। ‘আমার তো ধারণা, ও—ই খুন করতে চায়—আমাকে।’
‘উনি আপনার গায়ে আঁচড়টিও দেবেন না।’
‘আপনি জানলেন কী করে?’
মীনা চুপ রইল, অর্থাৎ উত্তর দেবে না।
‘ঠিক আছে, নয় নাই বললেন। কিন্তু আমি নিরাপদ নই কেন, সেটা তো বলতে পারেন?’
‘আপনি শুধু শরীরের দিক থেকেই নয়, মেজাজেও আমার দিদির মতো। তবে অনেক বেশি স্টার্ডি, স্ট্রং।’
‘এইটেই কারণ? একটা চড় মেরেই বুঝে গেলেন আমি স্ট্রং? ভালো। আমি যাচ্ছি।’
‘শুনুন।’
রোহিণী ফিরে দাঁড়াল। মীনা ইতস্তত করছে, যেন কথাটা বলা উচিত হবে কিনা ঠিক করতে পারছে না।
‘আপনি এবার নিঃশব্দে লোকের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যান। বিয়ে করুন, ঘর—সংসার করুন। ভুলে যান আপনার একটা বিয়ে হয়েছিল, কিছু ঘটনা ঘটেছিল। একটা ফ্রেশ জীবন শুরু করে দিন, এখনও তো তার বয়স আছে!’
শুনতে শুনতে রোহিণীর মনে হল, যেন গঙ্গাদার কণ্ঠই শুনছে।
দু—জনের কথার মধ্যে আশ্চর্য একটা মিল, যেন দু—জনে আলোচনা করে ঠিক করে নিয়েছে, রোহিণীকে সরে যেতে বলবে শোভনেশ সংক্রান্ত সব ব্যাপার থেকে। তাকে যেন এরা উটকো, অবাঞ্ছিত একটা উৎপাত বা পথের কাঁটা হিসাবে ভাবছে।
‘মিস চ্যাটার্জি, আপনার এই উপদেশটা খুবই উপকারী। শুধু আমার নয়, প্রত্যেক মেয়েকেই এটা প্রেসক্রাইব করা উচিত। আমি আপনার উপদেশ অনুযায়ীই চলব, চলতে চাইও। বিয়ে, ঘরসংসার, ছেলেপুলে—এসবে আমার লোভও খুব। তাই আপনাকে অনুরোধ, আমার হবু মার্ডারারকে একবার যদি বলে দেন, আমার একটুও ইচ্ছে নেই মরার।’
