‘আমি একাই রয়েছি।’ মীনাকে এই প্রথম বিচলিত দেখাল। ‘আমি সত্যিই একা।’
‘সুভাষবাবু ছাদে যাওয়ার সময় চার তলার ল্যান্ডিংয়ে আলো জ্বলছিল। কিন্তু তারপরই কেউ বালবটা ভেঙে দেয়, আর অন্ধকারের মধ্যে কেউ ছাদ থেকে দ্রুত নেমে এসেছিল।’
‘এসবের কিছুই তো আমি জানি না। আপনি এত কথা জানলেন কী করে?’
‘ইচ্ছে থাকলে, চেষ্টা করলে অনেক কিছুই জানা যায় মিস চ্যাটার্জি। আবার কিছুটা ভাগ্যের সহায়তাও পাওয়া চাই। আপনি সেদিন খোঁজ করলেন না কেন সুভাষবাবুর ছাদ থেকে নামতে দেরি হচ্ছে দেখে?’
‘আপনি তো দেখছি পুলিশের মতো জেরা করতে শুরু করেছেন। আপনাকে কিন্তু আমি চলে যেতে বলেছিলাম। আমার আর একটুও ভালো লাগছে না আপনার সঙ্গে কথা বলতে।’
‘চিঠি দুটো সম্পর্কে কী করবেন? গঙ্গাদাকে এই বিষয়ে কিছু বলেছেন?’
‘হ্যা ওঁকে দেখিয়েছি। উনি বললেন, এটা শোভনেশের কাজ।’
‘শোভনেশ, যার বয়স এখন ষাট, সে চুপি চুপি তিনতলায় এসে আপনার দরজায় চিঠিটা এঁটে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল বেল বাজিয়েই?’
‘অন্য কাউকে দিয়ে করাতে পারে।’
‘একজন ফেরারি আসামি, যার হাতে পয়সা নেই, বন্ধুদের কাছে যাবার উপায় নেই, যে লুকিয়ে থাকছে পুলিশের ভয়ে, সে লোক পাবে কোথায় এই কাজ করাবার জন্য?’
‘তাহলে কি শোভনকাকা নয়?’
‘গঙ্গাদাকে আপনি কতটা চেনেন?’
মীনা ইতস্তত করে বলল, ‘সামান্যই, তাই দিয়ে একটা লোকের চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। ওঁর আসাটা আমার কাছে অপ্রত্যাশিতই।’
‘সিঁড়ির বালবটা কি আপনিই ভেঙেছিলেন?’
‘এসব কী বলছেন?’
দু—জনে একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠল। মুখোমুখি হয়ে পরস্পরের চোখে চোখ রেখে তারা কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল, কে আগে চোখ সরায়।
‘এই চিঠি দুটো কাকে দিয়ে আপনি লিখিয়েছেন?’
জবাব দেবার বদলে মীনা সজোরে রোহিণীর বাম গালে একটা চড় কষাল। থরথর করে তার শরীর কাঁপছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত । রোহিণীর মাথাটা ডানদিকে সামান্য ঘুরে গেছিল চড়ের ধাক্কায়, তবে দেহ একচুলও নড়েনি, গালে বুলোবার জন্য হাতও সে তোলেনি। বারকয়েক শুধু গালের পেশি কুঞ্চিত হল। শান্ত চোখে তাকিয়ে সে বলল, ‘এতটা কিন্তু আশা করিনি।’
‘গেট আউট। দু—হাত তুলে দরজা দেখিয়ে মীনা হিসহিসে গলায় আরও দু—বার বলল কথাটা।
‘কে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল সুভাষবাবুকে? মিস চ্যাটার্জি গায়ের জোর আর দেখাবেন না, প্লিজ…আমার এই সহজ, সরল প্রশ্নটায় আবার যদি রাগ দেখান, তাহলে কিন্তু কাঠখোট্টা শরীর তাতে ঘোরতর আপত্তি জানাবে। বলুন, কে সুভাষবাবুকে…’
মীনা ছুটে পর্দা সরিয়ে ভিতরে গিয়ে দু—তিন সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরে এল ফুট—চারেক লম্বা একটি ছড়ি নিয়ে।
‘মেরে বার করব…বেরোবে কিনা বলো, নইলে…।’ মীনা ছড়িটা দু—হাতে ধরে মাথার উপর তুলল। রোহিণী এক পা পিছিয়ে এধার—ওধার তাকাল। চোখে পড়ল হাতের কাছেই দেওয়ালে কাঠের ব্রাকেটে রাখা পিতলের একটা বুদ্ধের মাথা। হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিয়ে সে ছোড়ার জন্য তৈরি হল।
‘যদি আমার গায়ে ছড়ির একটু আঁচড়ও লাগে, তাহলে কিন্তু আপনার মুখ এই বুদ্ধের আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হবে। ফিল্ম কেরিয়ারও নির্বাণ লাভ করবে। জেনে রাখুন, আশীর্বাদের ওজন প্রায় এক কিলো হবে।’
মীনা ফ্যালফ্যাল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে ছড়িটা নামাল। মুখটা ফ্যাকাসে। দ্রুত শ্বাস পড়ছে। চোখে ভয়।
‘আপনার হাতটা নামান। এই দেখুন আমারটা ফেলে দিলাম।’ ‘মীনা সোফার উপর ছুড়ে দিল ছড়িটা। হাসি পাচ্ছে রোহিণীর। মুখ থেঁতলে গেলে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার জন্য কেউ আর কনট্র্যাক্ট নিয়ে সই করাতে আসবে না। মুখসর্বস্ব অভিনেত্রীদের এটাই বোধ হয় জীবনের একমাত্র প্রধান সমস্যা—মুখ রক্ষা করা।
রোহিণী বুদ্ধের মাথাটা সেন্টার টেবলে নামিয়ে রাখল। এগিয়ে এসে মীনার দুই কাঁধ দুই হাতে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিল। লটপট করে উঠল মীনার দেহ। অস্ফুটে তার মুখ থেকে যন্ত্রণায় ‘আহহ’—এর মতো একটা শব্দ বেরোল।
‘কাজের মেয়েটা মোটেই ছুটি নেয়নি, তাকে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছেন, যাতে এই ফ্ল্যাটে আপনি ছাড়া আর কেউ না থাকে। কেন?’
‘বলব না।’
রোহিণীর দশ আঙুল বাঁকা হয়ে মীনার দুই কাঁধে কুঁকড়ে চেপে বসল। মীনা কাতরে উঠল।
কাঁধের হাড় দুটো আমি ভেঙে দেব যদি প্রশ্নের জবাব না পাই। কেন একা থাকতে চাইছেন?’
‘গঙ্গাপ্রসাদবাবু গত বুধবার টেলিফোন করে বললেন, শোভনকাকা এখন কলকাতায়। কোথা থেকে যেন তাঁকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন সুভাষদা এখন কোথায় আছেন? তখন গঙ্গাপ্রসাদবাবু আমার নাম করে বলেন, মীনার কাছে তার গার্জেনের মতো থাকেন। শুনে শোভনকাকা নাকি ওঁকে বলেন, সুভাষদার কাছে ওঁর অনেক নকল ছবি রয়ে গেছে। ওগুলো ডেস্ট্রয় করতে হবে, না করলে তাঁর আঁকা আসল ছবিগুলোকেও লোকে সন্দেহ করবে। ভবিষ্যৎ তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা তাহলে দেবে না। আমি গঙ্গাপ্রসাদবাবুকে বললাম, শোভনকাকাকে আমার কাছে আসতে বলুন। আমি ওঁকে লুকিয়ে রাখব, আমি ওঁর নকল ছবিগুলো যেভাবেই হোক উদ্ধার করে ওঁর সামনেই পোড়াব। আমি ওঁকে দিয়ে আবার ছবি আঁকাব, যেভাবে উনি আঁকতে চান…নতুন করে যেভাবে আবার শুরু করতে চান….চার বছর আগে বহরমপুর জেলে আমাকে যা বলেছিলেন, স্বাধীনতা চাই, মুক্তি চাই, প্রকৃতির ছবি আঁকতে চাই…।’
