‘আপনি কাকে সন্দেহ করছেন?’
‘কাকে যে করব।’ মীনা অসহায়ভাবে দু—হাত মুঠো করে কাঠ হয়ে বসে রইল।
‘নিশ্চয় কিছু কিছু লোকের মুখ মনে ভেসে উঠেছে। ধরুন, আমি যদি আজ এইরকম চিঠি পেতাম—’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ যদি পেতেন?’
‘প্রথমেই মনে হত ‘শোভনেশ’, আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে নাকচও করে দিতাম। কেননা এইভাবে চিটিফিটি লিখে ও মানুষ মারবে না।’
‘কে বলল, মারবে না? দিদিকে চিঠি লিখে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করেছিল। চিঠিটা আগের দিন দিদি আমাকে দেখিয়েছিল।’
‘খুন করবে বলেই চিঠি দিয়ে বাড়িতে ডেকে আনার কথাটা মামলার সময় কোর্টে উঠেছিল। এটা আমি জানি। কিন্তু এখন এই দুটো চিঠিতে আপনাকে ডাকা হয়নি।’
মীনা তর্কের দিকে আর গেল না। ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, ‘প্রথমেই আপনার মনে হত শোভনেশ? তারপর কার মুখ?’
‘সুজাতা গুপ্তের। এঁকে আপনি দেখেছেন কিনা জানি না। বিবাহিত, একসময় শোভনেশের বাড়িতে নীচের তলায় ভাড়া থাকতেন আর ইনিই ওর প্রথম মডেল। পেশাদার নন, আর্টিস্টকে ভালোবেসে ন্যুড হয়ে পোজ দিয়েছিলেন। এখন বয়স ষাটের মতো, আমার উপর তলায় থাকেন, শোভনেশের স্মৃতি ভুলতে পারেননি, এখনও বিশ্বাস করেন, সে নির্দোষ, আর তার বউকে তিনি এখন ঘৃণা করেন। সুজাতা গুপ্ত আমাকে মুহুর্মুহু খুন করে যাচ্ছেন, যেজন্য চিঠি লেখার সময় করে ওঠা ওঁর পক্ষে খুবই শক্ত।’
‘এরপর কার মুখ মনে আসবে?’ মীনার প্রশ্নটায় এবার কৌতূহলীর সারল্য নেই। তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে যেন রোহিণীর মগজের কাজকর্ম দেখতে চাইছে। তাহলে দেখুক, মনে মনে রোহিণী এই সিদ্ধান্তটা নিল শুধু এটাই বোঝাতে, তার মগজে কিছু দুষ্টু বুদ্ধিও আছে।
‘তারপর তিন নম্বরে মনে ভেসে উঠবে আপনার মুখ।’
মুখটা সারল্যে ভরিয়ে রোহিণী কথাটা বলল। প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য চোখে আগ্রহ ফোটাল না। আসলে মনে মনে সে বিরক্ত হয়ে উঠছিল। মাত্র দু—দিন আগেই একটা লোক বিশ্রীভাবে মারা গেল, যে লোক বছরের পর বছর পাশাপাশি থেকেছে, যে লোক সম্পর্কে বলেছে, ‘আমার ভালোর জন্য সব করতে পারে। বিশ্বস্ত।’ সেই লোকটি তার আত্মীয় এবং অভিভাবকও বটে, অথচ সেই লোকের মৃত্যুতে চোখে জল নেই, কোনো শোক নেই, দুঃখও নেই। ভয় দেখানো চিঠি পেলে রোহিণীর মনে কী হতে পারে, তাই জানার জন্যই এখন ব্যস্ত। মীনা চ্যাটার্জি সম্পর্কে সে রূঢ় হয়ে পড়ছে অনেকটা নিজের অজান্তেই।
‘ভেসে ওঠার কারণটা জানতে পারি কি?’ অনুত্তেজিত স্বরে মীনা জানতে চাইল। মীনার এই শীতল সংযত ভাবটাই নিমেষে রোহিণীর মাথা গরম করে দিল।
‘এর কোনো কারণ নেই, এটা নিছকই ইনস্টিংক্ট। যেমন সুভাষবাবুর ছাদ থেকে পড়ে যাওয়াটাকেও আমার ইনস্টিংক্ট বলছে মোটেই দুর্ঘটনা নয়।’ কথাটা বলে সে চ্যালেঞ্জের চাহনি পাঠাল মীনার দিকে। দপ করে একবার শুধু জ্বলে উঠল মীনার চোখ। তারপরই শব্দ করে হেসে উঠল মীনা।
‘আপনাকে যতটা কাঠখোট্টা মনে হয়, ততটা কিন্তু নন, দেখছি সেন্স অফ হিউমার যথেষ্টই আছে। তিন নম্বরে কিনা আমাকেই বেছে নিলেন?’ মীনা আবার হেসে উঠল।
বিলো দ্য বেল্ট হিট করেছে। কাঠখোট্টা শব্দটা যখন অপমান করার জন্য বেছে নিয়েছে, তাহলে তাই হওয়া যাক। রোহিণী রাগটা চাপতে চাপতে বলল, ‘শোভনেশ কিন্তু যেচে বাড়ি বয়ে এসে এই কাঠখোট্টাকেই প্রেম নিবেদন করেছিল মিস চ্যাটার্জি। তার রুচির বা সৌন্দর্যবোধের অভাব ছিল, আপনি কি তাই মনে করেন?’
রাগে থমথমে হয়ে উঠল মীনার মুখ। রোহিণী শ্লথ ভঙ্গিতে বসে, হাতের নখের গড়ন পরীক্ষায় মগ্ন। দুনিয়ায় এখন যেন এইটেই তার কাছে সবথেকে বড়ো কাজ।
‘আপনি চার বা পাঁচ নম্বরের খোঁজ নেবেন না?’
‘তার দরকার নেই। আমার যা জানার, তা জেনে গেছি।’
‘কী জানলেন?’
‘আপনি এবার আসতে পারেন মিসেস সেনগুপ্ত।’
কিন্তু গাত্রোত্থানের কোনো লক্ষণ রোহিণীর মধ্যে ফুটল না। হাতের নখ দেখার কাজ সেরে সে ঘড়ির ব্যান্ডে নজর দিল।
‘আপনার কাছে একটু আগে কেউ এসেছিল?’
কথাটা শুনে মীনা চমকাল কিনা রোহিণী বুঝতে পারল না। চমকালেই সে আশ্বস্ত হত। তাহলে বুঝতে পারত মীনার মানসিক গড়ন দুর্বল।
‘এসেছিল, আর কে যে এসেছিল, মনে হয় সেটা জানেন। কেন এসেছিল, সেটা কিন্তু জানেন না।’
মাথা নেড়ে রোহিণী জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল। ভাবখানা, যদি ইচ্ছে হয় তো বলতে পারো, তবে জানার জন্যে আমার কোনো আগ্রহ নেই।
‘খোঁজ নিতে এসেছিলেন গঙ্গাপ্রসাদবাবু।’
‘শোভনেশের? সে এখানে এসে লুকিয়ে আছে কিনা জানতে? সুভাষবাবুর ছাদ থেকে পড়ার পিছনে তাঁর কোনো হাত আছে কিনা, সেটা বুঝে নিতে?’
‘হ্যাঁ। আপনার অনুমানশক্তি তো দেখছি খুবই প্রখর।’
‘এতে শক্তি—টক্তির কোনো দরকার হয় না। ব্যাপারটা প্রথম থেকে যেভাবে চলে আসছে তাতে এই অনুমানে যে কেউই চলে আসবে, এমনকী আপনার কাজের মেয়েটিও এইরকম কনক্লুশনে পৌঁছবে যদি তার ঘটে এক ছটাকও বুদ্ধি থাকে।’
‘হঠাৎ ওকে কেন এর মধ্যে টানলেন?’
‘ওর বাড়ি চলে যাওয়ার টাইমিংটা একটু অদ্ভুত কিনা। ঠিক তারপরই ওই দুর্ঘটনাটা ঘটল, শোভনেশও টেলিফোন করেছে গঙ্গাদাকে। সে যে কোথা থেকে ফোন করছে, গঙ্গাদাকে তা বলেনি। আবার আপনি এইরকম দুটো চিঠিও পেলেন এরই মধ্যে সবই ঘটেছে মেয়েটি বাড়ি যাবার পর ফ্ল্যাটে যখন আপনি একা রয়েছেন।’
