রোহিণী চেয়ার থেকে উঠল। মীনাকে এখন পাওয়া যাবে কিনা কে জানে। আর গঙ্গাদা এই বাড়ি থেকে গাড়িতে বেরোলেন, ব্যাপারটা যেন কেমন কেমন! কার কাছে এসেছিলেন? মীনার কাছে কী?
‘অনেকক্ষণ আপনাকে বকালাম। এইবার তা হলে আসি।’
রোহিণী নমস্কার করে বেরিয়ে আসার সময়ই ভিতর থেকে একটি তার বয়সি বউ বেরিয়ে এল। বোধ হয় বৃদ্ধের পুত্রবধূ। অবাক হয়ে সে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্ধকার সিঁড়িতে পা টিপে টিপে নামার সময় রোহিণীর মনে হল, বউটিকে কোথায় যেন সে দেখেছে। মহারানির অফিসে? নাকি ইডেন গার্ডেনসের ক্লাব হাউসে? ভাবতে ভাবতে তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছল। আলো জ্বলছে।
সে মীনার ফ্ল্যাটের কলিং বেলের বোতাম টিপল।
দরজা খুলতে একটু দেরিই হচ্ছে। হবারই কথা, কেননা, রোহিণী ধরেই নিল, প্রথমে আই হোল দিয়ে দেখে নিয়ে কাজের মেয়েটি ভিতরের ঘরে গিয়ে মীনাকে সেটা জানাবে। মীনা ভেবে দেখেবে, এখন তার সঙ্গে সে দেখা করবে, না দরজা থেকেই বিদায় হতে বলবে। তারপর তো মেয়েটি এসে দরজা খুলবে।
দরজা খুলল এবং মীনা দাঁড়িয়ে।
রোহিণীকে অবাক হবার অবকাশ না দিয়েই মীনা হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়েই দরজা বন্ধ করে দিল।
‘কী ব্যাপার!’
‘কিছু না, এমনিই।’ মীনা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘কোনো লোককে দেখলেন?’
‘কোথায়?’
‘লিফটে, সিঁড়িতে, দরজার কাছাকাছি?’
‘না তো! কীরকম লোক?’
‘তাহলে দেখেননি।’ এক লহমা কী ভেবে নিয়ে মীনা হালকা স্বরে বলল, ‘যাকগে, এসব কথা, বসুন।’
রোহিণী সোফায় বসল। সে ভেবেছিল, মীনাকে মুহ্যমান, বিষণ্ণ বা ওইরকম ধরনের মুখ নিয়ে উদাস চোখে দেওয়াল বা মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখবে। অর্থাৎ শোকার্তের ভূমিকায় অভিনয়ের রিহার্সালে মগ্ন থাকবে। সুভাষ গায়েন আর প্রাইভেট সেক্রেটারিই তো শুধু নয়, দিদির স্বামীও। কিন্তু তার বদলে এইরকম ভীত, অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে কেন?
‘খবরটা কাগজে দেখেই মনটা বড়ো খারাপ হয়ে গেল।’ রোহিণী ধীর, বিষাদমাখা স্বরে শুরু করল। ‘কয়েক দিন আগে অনিমন্ত্রিত হয়েই অদ্ভুতভাবে এক বিয়েবাড়িতে গিয়ে পড়ি। দেখি, সেখানে উনি রয়েছেন। বললেন তার ভাগনির বিয়ে হচ্ছে। জোর করে আমার হাতে খাবার ধরিয়ে দিলেন, বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাবার জন্য। মানুষটার মধ্যে ভালোবাসা পাবার ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি হয়তো, কিন্তু স্নেহ দেবার জন্য ব্যগ্রতাটা ছিল। সেদিন ওঁকে খুব তৃপ্ত মনে হল, যখন আমি খাবারগুলো অ্যাকসেপ্ট করলাম।’
মীনা ভাবলেশহীন মুখে কথাগুলো শুনছিল। এইবার বলল, ‘আপনি বোধ হয় সমবেদনা বা ওইরকম কিছু জানাতে এসেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তা শোনার মতো মানসিক অবস্থায় আমি নেই। আই অ্যাম ইন ডেঞ্জার…মাই লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার…কে একজন আমায় থ্রেট করছে। মারবে, খুন করবে বলছে।’
‘কে?’ রোহিণী টানটান হয়ে ঝুঁকে পড়ল।
‘জানি না।’
‘কেন? কীজন্য?’
‘তাও জানি না।’
‘কীভাবে থ্রেট করছে, ফোনে? পারভারটেড, ডার্টি মাইন্ডেড লোকের তো অভাব নেই। ফোনে তারা অনেক কিছুই এভাবে বলে।’
‘ফোনে নয়, চিঠি দিয়েছি। কাল আর আজ দু—দুটো চিঠি দিয়েছে, দেখবেন?’
‘দেখি।’
মীনা উঠে শোবার ঘরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এল দুটো সাদা কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে। রোহিণী হাত বাড়াল নেবার জন্য। তার হাতে দেবার আগে মীনা বলল, ‘দরজায় সেলোটেপ দিয়ে আটকে বেল বাজিয়েই পালিয়েছে। আমি দরজা খুলে পেয়েছি।’
‘আপনার কাজের মেয়েটিই তো দরজা খোলে।’
‘চারদিন আগে বাড়িতে একবেলার জন্য যাবে বলে সেই যে গেছে আজও আসেনি।’
মীনার কথাগুলো ভালোভাবে রোহিণীর কানে ঢুকল না কাগজের লেখার উপর মগ্ন থাকায়। একটা কাগজে লেখা : ‘সুভাষ গায়েনের যে দশা হল, তোমারও তাই হবে। সাবধান। অনেক পাপ জমে উঠেছে।’
অন্য কাগজে লেখা : ‘এই তো সবে শুরু। একে একে সবাই যাবে। তুমি আছ তালিকার তিন নম্বরে। অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো। আমি আসছি।’
হতভম্ব চোখ তুলে মীনার দিকে তাকানো ছাড়া রোহিণীর এখন আর কিছু করার নেই। সে আর একবার লেখার উপর চোখ রাখল। কাগজ দুটোই রুল—টানা। এক্সারসাইজ খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া, বল পয়েন্ট রিফিল কলমের কালি। অক্ষরের ধাঁচ থেকে বোঝা যায়, খুব অশিক্ষিত নয় এবং মেয়েলি হাতের লেখা। শুরুতে কোনো সম্বোধন নেই, তলায় লেখকের নামও নেই।
‘কী বুঝছেন?’ মীনা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইল।
মাথা নাড়ল রোহিণী। ‘আপনার উপর কেউ ভয়ঙ্কর রেগে আছে, যে মনে করে; অনেক পাপ জমার একটা কারণ আপনি।’
‘কী পাপ?’
‘বলা মুশকিল। পৃথিবীতে কোন কাজটা যে পাপমুক্ত, সেটা এখনও ভালোভাবে জানি না। এক্ষেত্রে আপনি নিজেই খুঁজে বার করুন জীবনে কখন, কোথায় কী কাজ করছেন, যেটা পাপ বলে গণ্য হতে পারে। তবে একটাই সান্ত্বনা, আপনি একা নন, আপনার আগে একজন আছে দু—নম্বর। আর এক—নম্বরটা ছিলেন বোধ হয় সুভাষবাবু। দু—নম্বর যাবে, তারপর তো তিন নম্বর! হাতে কিছু সময় পাচ্ছেনই। আপনি পুলিশের কাছে যাননি?’
‘না’।
‘সে কী? প্রথমেই তো সেখানে যাওয়া উচিত। এইরকম থ্রেটনিং লেটার পেয়ে—।’
‘গিয়ে কী লাভ!’ মীনার হালছাড়া, ভাঙা গলা অকূল হতাশায় ভেসে গেল। ‘এই তো সেদিন একটা বাচ্চচা মেয়েকে কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়ে চিঠি দিল বাবাকে। বাবা লালবাজারে গিয়ে চিঠিটা দিল। ফাঁদটাদ পেতে কিডন্যাপারদের দু—জনকে ধরল বটে, কিন্তু মেয়েটাকে কী পুলিশ বাঁচাতে পারল। অন্যরা খবর পেয়েই মেয়েটাকে গলা টিপে মেরে ফেলে দিল। না, না, পুলিশে গেলে বিপদ আরও তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসবে।’ চিঠি দুটো ভাঁজ করে সে সোফার একধারে রাখল।
