লিফটের দরজা বন্ধ। দরজার মাথায় লাল অক্ষরে ‘তিন’ সংখ্যাটা জ্বলছে। রোহিণী অপেক্ষা করতে লাগল। পুরু লেন্সের চশমা পরা এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়াল লিফটে ওঠার জন্য। চোখে প্রায় দেখতেই পায় না, হাতে একটা লাঠি। মুখ তুলে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে পরিচিত কেউ কিনা, সেটাই বোধ হয় চেনার চেষ্টা করল। দেখে রোহিণীর মায়া হল। সে হাসল বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে।
‘আমাকে একটু পৌঁছে দেবে, মা। সিঁড়িতে বালবটা ভেঙে গেছে, বড্ড অন্ধকার।’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়, ক—তলায় যাবেন?’
‘চারতলায়, থার্ড ফ্লোর। তুমি কোন ফ্লোরে?’
‘সেকেন্ড, তিনতলায়।’
‘অহহ, সেদিন যিনি মারা গেলেন, সেই ফ্লোর?’
‘হ্যাঁ। আমি ওঁরই ফ্ল্যাটে যাব।’
‘ওহহ। বড়ো দুঃখের ব্যাপার, স্যাড, ভেরি স্যাড।’ বৃদ্ধ মাথা নাড়ল। ‘বেশ ভালো লোক ছিলেন। কেন যে রাত্রে ছাদে গিয়ে অ্যান্টেনার লুজ তার ঠিক করতে গেলেন। আমি বললুম একটা রাত নয় একটু খারাপ পিকচারই দেখলেন, কাল সকালে বরং ঠিক করবেন। তা উনি শুনবেন না। বললেন, অসুবিধে হবে না, পারব, আগেও করেছি। তারপর খবরটা শুনে এত খারাপ লাগছে। যদি জোর করে আটকাতে পারতাম ওঁকে….’
রোহিণী সন্ত্রস্ত এবং গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। তার হাতের রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠেছে।
‘আপনার সঙ্গে ঘটনার আগে ওঁর দেখা হয়েছিল?’
লিফট নেমে এসেছে। দরজা খুলে গেল। বাচ্চচা কোলে একটা লোক বেরিয়ে এল। বৃদ্ধ লাঠি ঠুকঠুক করে লিফটে ঢুকল। রোহিণী ভিতরে ঢুকেই তিন নম্বর বোতামটা টিপল।
‘আপনি ওঁকে বারণ করেছিলেন?’
‘করবই তো। ওঁদের অ্যান্টেনার রড পাঁচিলের সঙ্গে লাগানো, আমাদেরটার পাশেই। তারটা যেখানে লাগানো, সেখানে হাত পৌঁছতে হলে একটা টুলের ওপর দাঁড়াতে হবে। উনি তো আর টুলফুল কিছু সঙ্গে নেননি, শুধুই যাচ্ছিলেন। তা হলে তার ঠিক করতে ওঁকে পাঁচিলে উঠতেই হবে। আর পাঁচিলেই উনি…’
লিফট চারতলায় থেমেছে। দরজা খুলল। বাইরে ল্যান্ডিংটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। রোহিণী হাত ধরে বৃদ্ধকে বাইরে আনল। দরজা বন্ধ করে লিফট নীচে নেমে গেল। এত অন্ধকার যে, চোখ সইয়ে নেবার জন্য রোহিণীকে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হল।
‘ডানদিকের ফ্ল্যাট। দরজায় ডানদিকে কলিং বেলের বাটন।’
বৃদ্ধের কথামতো রোহিণী হাতড়ে হাতড়ে কলিং বেলের বোতামটা পেয়ে টিপল।
‘তা হলে উনি পাঁচিলে উঠে তার আঁটছিলেন?’
‘বোধ হয়। আমি তো আর দেখিনি উনি উঠেছিলেন কিনা। এই ঠিক এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। কথা বলে আমি ভিতরে চলে যাই।’
‘তখন আলো ছিল এখানে?’
‘হ্যাঁ।’
ফ্ল্যাটের দরজা খুলল ফুটফুটে একটি পাঁচ—ছ বছর বয়সি মেয়ে। ভিতরের আলো এসে ল্যান্ডিংয়ে একটা চৌকো সাদা কাগজ পেতে দিয়েছে।
‘খুব তেষ্টা পেয়েছে, এক গ্লাস জল দেবেন?’ একটু শুকনো স্বরে রোহিণী বলল।
‘নিশ্চয়। ভেতরে আসুন।’
বলামাত্র রোহিণী ভিতরে ঢুকে এল। বৃদ্ধের কাছ থেকে আরও কিছু তথ্য সে জেনে নিতে চায়।
‘ঠান্ডা না গরম জল?’
‘গরম।’
‘মিঠু এক গ্লাস জল ফিলটার থেকে এনে দাও, তোমার ঠাকুমা কোথায়? টিভি দেখছে? আচ্ছা তুমি জল এনে দাও….পড়তে বসেছিলে তো? আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।’
রোহিণী ঘরের আসবাব দেখে বুঝল, বৃদ্ধের প্রথম জীবনে যা কেনা হয়েছে, তারপর আর বিশেষ কিছু সংযোজিত হয়নি। এই বাড়ির পুরোনো বাসিন্দা। বোধ হয় বড়ো সরকারি চাকুরে ছিল।
‘বাইরের বালবটা কখন কেটে গেছে?’
‘কাল, তখনই প্রায়।’
‘তখনই মানে?’
‘সুভাষবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমি ভিতরে চলে এলাম, আর উনিও উপরে গেলেন। তারপর বোধ হয় দু—মিনিট হবে, আমার এই নাতনির প্রাইভেট টিউটর ওকে পড়িয়ে চলে গেলেন। ঠিক সাড়ে সাতটায় উনি ওঠেন। আমি দরজা বন্ধ করতে এসে দেখি ল্যান্ডিং অন্ধকার। রাতে ঝাপসাই দেখি, তার ওপর আলো নেই। দরজা বন্ধ করার সময় মনে হল, ছাদ থেকে কেউ খুব তাড়াতাড়ি নেমে চলে গেল নীচে। আমি ভাবলাম, বোধ হয় সুভাষবাবুই নেমে গেলেন।’
মিঠু জল এনে দিল। এক চুমুকে শেষ করে রোহিণী প্রমাণ দিল, সে সত্যিই তৃষ্ণার্ত ছিল।
‘ওঁর নীচে পড়ার আওয়াজ পাননি?’
‘না। পড়েছেন তো বাড়ির পিছন দিকের একটা খোলা জায়গায়। দারোয়ানদের কয়লা—টয়লা থাকে। ওদিকটা এমনিতেই অন্ধকার, কেউ যায়টায়ও না বিশেষ। অন্তত আধঘণ্টা পরে ওঁকে দেখতে পায় আমাদের দারোয়ানের বউ।’
‘তখন সুভাষবাবুর ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না?’
‘মিস চ্যাটার্জি ছিলেন। কেননা দারোয়ান প্রথমে ওঁর ফ্ল্যাটেই ছুটে আসে, আর শোনামাত্র উনি চেঁচিয়ে উঠে নীচে নেমে যান।’
‘আধঘণ্টা একটা লোক ফিরছে না ছাদ থেকে, ততক্ষণ তো অ্যান্টেনার তার ঠিক করতে লাগে না।’
‘হ্যাঁ, তা লাগে না।’
‘তা হলে তো একবার খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। তাই তো কী হল লোকটার?’
বৃদ্ধ বোধ হয় এতসব আগে ভাবেনি। রোহিণীর কথা শুনে যেন ধাঁধায় পড়ল।
‘বালবটার কী ফিলামেন্ট কেটে গেছে?’
‘না, না, একেবারে চুরমার হয়ে গেছে। আজও রিপ্লেস করেনি। আমরা পুরোনো ভাড়ায় আছি তো, তাই গ্রাহ্যই করে না বাড়িওয়ালা।’
‘পুলিশ তো এসেছিল, তা আপনাকে কী জিজ্ঞাসা করল?’
‘আমাকে?’ বৃদ্ধ আকাশ থেকে যেন পড়ল। ‘শুনেছি এসেছিল। ছাদে গেল, নীচে যেখানে পড়েছিল, সেখানে গেল। যাকে সামনে পেল জিজ্ঞাসা করল। মিস চ্যাটার্জির সঙ্গে বহুক্ষণ নাকি কথা বলল, তারপর চলে গেল। আমার সঙ্গে তাদের দেখাই হয়নি বা তারা কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখায়নি।’
