‘পাঁচিল আছে। পাঁচিলে উঠে টিভি—র অ্যান্টেনা ঠিক করছিল, তখন পড়ে যায়।’
‘আহা রে! দ্যাকো তো, কার মরণ যে কখন কীভাবে হয়, কেউ তা জানে না। আমাদের বস্তির একটা বউ নারকেলডাঙার কাছে রেল লাইনে কাটা পড়ে মরল রাত্তির বেলায়। সবাই বলল অ্যাকসিডেন্ট। তার স্বামী এক মাসের মধ্যে আবার বিয়ে করল। এই বউটাও রেলে কাটা পড়ল ওই একই জায়গায়। একই রকম অ্যাকসিডেন্ট কি দুবার হয়?’
‘স্বামীটা কেমন?’
‘স্বামী নয়, স্বামী নয় গো, ননদ আছে একটা, খাণ্ডারনী। ভাইয়ের বউদের সে সহ্য করতে পারে না। তুমি যা ভাবছ, আমরাও তাই ভেবেছিলুম। বোধ হয় স্বামীটাই এসব করেছে। একদিন ভাই—বোনে তুমুল ঝগড়া। আর ঝগড়ার মুখে ভাইটা চেঁচিয়ে বলে ফেলল, ‘তুই তো বউ—দুটোকে মেরেছিস ট্রেনের সামনে ঠেলে দিয়ে, আমি নিজের চক্ষে দেখেছি। পুলিশকে বললে তোর ফাঁসি হয়ে যাবে বলে আমি বলিনি।’ বোঝো কাণ্ড দিদি, বোনকে বাঁচাতে দাদা দু—দুটো বউয়ের খুনের কথা চেপে গেছে।’
‘থার্ড বিয়েটা কবে করল?’
‘জানি না বাপু। ওরা তারপরই বস্তি ছেড়ে কোথায় যে চলে গেল, সে আজ দু—বছর তো হয়ে গেছে।’
গৌরীর মা চলে যাবার পর রোহিণীর চিন্তা অন্য পথে চলতে শুরু করে। খুনের উদ্দেশ্য এবং কারণ যে কত বিচিত্র আর অদ্ভুত রকমের হতে পারে, মানুষের মন যে কত জটিল, তার খেই পাওয়া শক্ত। এই যে ওপরের সুজাতা গুপ্ত আর হৃদয়রঞ্জন, এরাও একটা জটিল ব্যাপার। গঙ্গাদাও একটা জট পাকানো কাণ্ড হয়ে রয়েছেন। মীনা চ্যাটার্জি তো রীতিমতো…রোহিণীর চিন্তা এইখানে এসেই থমকে দাঁড়াল।
সুভাষ গায়েন পড়েছে মীনা চ্যাটার্জির ফ্লাটের ছাদ থেকে। এর মধ্যে সন্দেহ করার কিছু কি থাকতে পারে? রোহিণী ভেবে দেখল, গঙ্গাদার পাঠানো লোক তাদের ছাদে অ্যান্টেনা লাগাতে এসে যদি নীচে পড়ে যায়, তাহলে কি সে তার জন্য দায়ী হবে? কেউ কি বলবে সে লোকটাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে? লাখখানেক গোয়েন্দা—কাহিনি পড়ে মাথা নষ্ট করা লোকও তা বলবে না। সুভাষ গায়েনের পড়াটা তো একটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনাই।
এইরকম ভেবেও কিন্তু গৌরীর মা—র বলা একটা কথা তার মনে মাঝে মাঝেই ট্রেনের হুইশলের মতো বেজে উঠছিল: ‘ঝগড়ার মুখে ভাইটা বলে ফেলল, তুই তো বউ—দুটোকে মেরেছিস ট্রেনের সামনে ঠেলে দিয়ে।’ রোহিণীর চিন্তা একের পর এক লাইন বদল করে করে এমন একটা জংশনে এসে দাঁড়াল, যেখানে তাকে অপেক্ষা করতেই হবে। শোভনেশের টেলিফোন না পাওয়া পর্যন্ত সে লাইন—ক্লিয়ার সিগন্যাল পেয়ে এগোতে পারবে না। কিন্তু সেই টেলিফোন কি সত্যি সত্যিই বেজে উঠবে? অপেক্ষা করে করে টেনশান বাড়িয়ে তোলার থেকে বরং একটু ঘুরে আসা যাক—এই ভেবেই সন্ধ্যার মুখোমুখি সে ফ্ল্যাট থেকে বেরোয়।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কুন্তীদের দরজার সামনে সে দাঁড়াল। ইতস্তত করে বেল বাজাল।
দরজা খুলে দাঁড়ালেন প্রৌঢ়া এক বিধবা। কুন্তীর মাসশাশুড়ি, এই ফ্ল্যাটের মালিক।
‘মাসিমা, কুন্তী আছে নাকি?’
‘নেই। তিন—চারদিন ধরে সে সকাল নেই, দুপুর নেই বাড়ির বাইরে হুটহুট করে বেরোচ্ছে, যখন খুশি ফিরছে। পল্টু অফিসে কাজে গৌহাটি গেছে আর বউও এদিকে পল্টুর ক্যামেরা নিয়ে, টেপ রেকর্ডার নিয়ে… কী যে তার কাজ জানি না বাপু। কাঁধে একটা ঝোলা ঝুলিয়ে, এই তোমার মতো, হ্যাঁ গো এটা কী এখন ফ্যাশান হয়েছে নাকি?’
‘না না মাসিমা, এতে কাজের জিনিসপত্রই থাকে। কিন্তু হাতে নিয়ে এই ভিড় বাসে চলাফেরার এত অসুবিধে হয়, তাই এটা…।’
‘তুমি কি এখন বেরোচ্ছ, এই সন্ধেবেলায়?’ মাসিমার চোখেমুখে অনুমোদনের অভাবটা খুবই প্রকট। রোহিণীর মনে হল, তাকে বোধ হয় খুব একটা পছন্দ করছেন না।
‘আমার পিসিমা কাল কাশী থেকে ফিরেছেন। খবর পাঠিয়েছেন বিশ্বনাথের প্রসাদী ফুল এনেছেন, তাই মাথায় ঠেকাতে যাচ্ছি।’
প্রৌঢ়া ভ্রূ কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড রোহিণীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার বুকের মধ্যে গুরগুর করে উঠল। মিথ্যে কথাগুলো ছাপা অক্ষর হয়ে মুখে ভেসে ওঠে না তো। তারপরই সে হাঁফ ছাড়ল ওঁর স্মিত প্রসন্ন মুখ দেখে।
‘ঠাকুরদেবতায় ভক্তি থাকা ভালো। বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে…।’
‘না না মাসিমা, দেরি হয়ে যাবে। সেই পার্কসার্কাসে যেতে হবে।’
হঠাৎই মুখ থেকে পার্কসার্কাস শব্দটা তখন বেরিয়ে এসেছিল, আর সেই মুহূর্তেই রোহিণী স্থির করে, সে মীনার সঙ্গে একবার দেখা করে সমবেদনা জানিয়ে আসবে।
মিনিবাস থেকে নেমে কয়েক গজ এগিয়ে সে রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়াল। এখান থেকে মীনাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটার সদর দেখা যায়। বাড়িটা থেকে এই সময় একটা সাদা অ্যামবাসাডার বেরোতে দেখে সে দৃষ্টি তীক্ষ্ন করল। গাড়িটা বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে বাঁদিকে ঘুরল। সে যেখানে দাঁড়িয়ে, তার সামনে দিয়েই যাবে উত্তরে কিংবা চক্করটা ঘুরে আমির আলি অ্যাভিন্যু দিয়ে যাবে দক্ষিণে, কিংবা সোজা পুবেও যেতে পারে ইস্টার্ন বাইপাস ধরার জন্য।
দু—পা পিছিয়ে গিয়ে সারা শরীর শক্ত করে রোহিণী দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার ধারের গাছটায় নিজেকে আড়াল করে। সাদা অ্যামবাসাডারটা দক্ষিণেই যাচ্ছে। চোখের নজরে যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করে প্রথমে সে গাড়ির নম্বরটা পড়ে নিয়েই পিছনের সিটে বসা লোকটিকে রাস্তার আলোয় যতটা বোঝা যায়, বোঝার চেষ্টা করে অস্ফুটে বলল, ‘আশ্চর্য। গঙ্গাদা ওই বাড়িতে?’
