গত এক মাসে সে বন্ধুদের বা পাড়ার লোকের সঙ্গে কথা বলেনি। পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হলে ব্যস্ততার ভান করে হনহনিয়ে এড়িয়ে গেছে। স্কুলের অশোকবাবুর সঙ্গে একদিন রাস্তায় দেখা। এড়িয়ে যেতে গিয়েও পারেনি। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘পড়া ছেড়ে দিলি? করছিস কী এখন?’
ইতস্তত করে সে বলেছিল, ‘অ্যাপ্রেন্টিস, কাজ শিখছি কারখানায়।’
‘কীসের কারখানা?’
অনন্ত তৈরি ছিল না প্রশ্নটার জন্য। সামনে নারায়ণ মেডিক্যাল হল—এর সাইনবোর্ডে চোখ পড়তেই বলেছিল, ‘ওষুধের কারখানা।’
‘কত দিচ্ছে?’
‘একশো চল্লিশ টাকা।’
‘অমরকে ভালো করে পড়াশুনো করতে বলিস, একটু খাটলেই ন্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়ে যাবে।’
‘আমি তো সারাক্ষণই বাইরে থাকি স্যার। আপনারা যদি ওকে বলেন…বাড়িতে তো বিশেষ পড়তে দেখি না।’
‘মাথা আছে ওর, একটু খাটলেই পেয়ে যাবে, আমার কোচিং—এ ওকে আসতে বলিস…না না টাকা লাগবে না।’
অমর ক—দিন ধরে সকালে স্যারের কোচিং—এ যাচ্ছে। অমর বোধহয় জানে না সে কত টাকা পায় কমলা বাইন্ডার্স থেকে। কিন্তু সে ওষুধের কারখানায় যে অ্যাপ্রেন্টিস নয় এটা অমর জানে। কথায় কথায় যদি অশোকবাবুকে বলে ফেলে দাদা কোথায় কাজ করে! খুঁটিয়ে বাড়ির খবর নেওয়ার অভ্যাস স্যারের আছে।
ঘুমের মধ্যে সে ছটফট করেছে। ঘুম ভেঙে যাবার পর বিশ্রী একটা অস্বস্তি নিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে রইল। অনু স্কুলে যাবে। মা বাসি রুটি আর তরকারি ওকে খেতে দিয়েছে। অমর এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উঠোনে বাসন রাখার শব্দ হল। কাল কচুরি আর সন্দেশ কেনার পর যে—টাকা ক—টা ছিল সে মাকে দিয়েছে। মা—র কাছ থেকে দুটো টাকা নিয়ে এবার সে বাজার যাবে। খুব সহজে এবং দ্রুত তার বাজার করা হয়ে যায়। আলু, ডাল আর একটা আনাজ। মাছের বাজারের দিকেই সে যায় না। মাছ তারা শেষ কবে খেয়েছে? মাসতিনেক আগে। হঠাৎ খুব ইলিশ ওঠে, পাঁচ টাকা কেজি পর্যন্ত দাম নেমেছিল। রাত্রে একটা আধ কেজি ইলিশ এনেছিলেন অবিনাশকাকা। পরদিনের জন্য গোনাগুনতি তুলে রাখা হয়েছিল। সকালে রাঁধতে গিয়ে মা একটা মাছ কম পায়। কেউই স্বীকার করেনি তবে সবাই সন্দেহ করেছিল এটা অমরেরই কাজ।
‘আর ঘুমোয় না, ওঠ এবার, বেলা হয়ে গেল।’ অনন্ত চোখ খুলে জানলা দিয়ে তাকাল। সামনের বাড়ির দোতলার বারান্দায় উৎপলের দাদু চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছে। ওদের সদরের পাশেই আস্তাকুঁড় ছিল। দিন—সাতেক হল দাদু ঝিয়েদের সঙ্গে ঝগড়া করে জঞ্জাল ফেলা বন্ধ করেছে। রোজ সকালে দাদু বারান্দায় বসে লক্ষ রাখে কেউ ওখানে কিছু ফেলছে কি না। আরও তিনটে বাড়ি পেরিয়ে জঞ্জাল ফেলতে হওয়ায় ঝিয়েরা প্রথমে গজগজ করে এখন মেনে নিয়েছে। সকালে অনন্তদের জঞ্জাল ফেলে অনু। ওর স্কুল সাড়ে দশটা থেকে। ভাঙা—কলাইয়ের থালা হাতে দূরে গিয়ে ফেলতে অনু লজ্জা পায়। তাই ও ঘরের জানলা থেকে প্রথমে দেখে নেয় দাদু বারান্দায় আছে কি না। না থাকলে ছুটে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসে। পাতের এঁটো—কাঁটা কিছুই প্রায় থাকে না, আনাজ খোসাসমেতই রান্না হয়, শুধু উনুনের কিছু ছাই ছাড়া তাদের সংসারে প্রতিদিনের কোনো জঞ্জাল হয় না।
অনন্ত বাজারে বেরোবার আগেই অমর কোচিং—এ চলে গেছে। খোকার মা উঠোনে নীচু গলায় শীলার সঙ্গে কথা বলছিল। তাকে দেখে ওরা কাজ বন্ধ করল। অনন্ত না—দেখার ভান করে পেরেক থেকে থলিটা তুলে নিয়ে, চেঁচিয়ে বলল, ‘টাকা দাও।’
দুটো টাকা শীলার আঁচলে বাঁধা ছিল। খুলে দেবার সময় বলল, ‘খোকার মা—কে না বলে দিলুম। চাল শুধু এ—বেলার মতোই আছে।’
অনন্ত অসহায়ভাবে তাকাল। বাবা মারা যাবার পর এক বছর কেটে গেছে। যে—ক—টা টাকা ছিল তা—ও ফুরিয়েছে। এখন তার চল্লিশটা টাকাই সম্বল। সে ভেবে পাচ্ছে না তাদের পাঁচটা পেট কীভাবে ভরবে।
‘এবার থেকে দু—বেলা রুটি খেতে হবে।’
‘আটা কিনতেও তো পয়সা লাগবে। মেয়েদের জামা না কিনলেই নয়, সেলাই করে করে কত আর পরবে, অমরের জুতোটাও ফেলে দেওয়ার মতো হয়ে গেছে…’
‘তা আমি কী করব, শুধু আমায় বলছ কেন?’ অনন্ত হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল। শীলা অবাকচোখে তাকিয়ে। এভাবে কখনো ওকে চেঁচিয়ে উঠতে দেখেনি। দু—জনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। দু—জনেই জানে উত্তর দেবার কিছু নেই, উত্তর হয় না। অনন্ত চোখ নামিয়ে মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল।
বাজার থেকে ফেরার সময় সে অমরকে দেখল বইখাতা হাতে তিনটি ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ওর পায়ের কাবলি জুতোটার গোড়ালির চামড়ার পটিটা উলটোনো, বকলেস নেই। জুতোর কালো রং ধুলো—কাদায় ফ্যাকাশে। ডান পাটির একধারের সেলাই ছিঁড়ে আঙুল বেরিয়ে গেছে। অমরের বুশ—শার্টটা ময়লা। ফুলপ্যান্টটা ঢলঢলে। দেখেই বোঝা যায় বহুদিন সাবানে কাচা হয়নি।
অনন্ত এবং অমর যে ফুলপ্যান্ট পরে আছে সে—দুটি তাদের বাবার। দুই ভাইয়ের মাপ একই। চার মাস আগে বাবার দু—জোড়া জামা—প্যান্ট দর্জিকে দিয়ে ছোটো করিয়ে নিয়েছিল। এখনও একটা প্যান্ট রয়েছে। সেটা ছোটো করিয়ে অমরকে দেবে। বাবার একজোড়া ধুতি আর একটা পাঞ্জাবি আলমারিতে পড়ে আছে। অনেকদিনই সে ভেবেছে প্যান্টগুলো অমরকে দিয়ে সে ধুতি পরবে। পাঞ্জাবি তার দরকার নেই। ওটা দিয়ে মায়ের ব্লাউজ হয়তো হতে পারে।
