রোহিণী মাথা থেকে একটা বালিশ টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে কাত হয়ে শুলো। এখন এসব ভাবনা তোলা থাক। রাজেন তার জন্য সেঞ্চুরি করেছে, এটা মিথ্যে নয়। কাল সকালেই খবরের কাগজে ছাপা অক্ষরে প্রমাণটা সে পেয়ে যাবে। নিশ্চয় প্রথম পাতার খবর হবে না, তবে খেলার পাতায় কলকাতার কাগজগুলো নিশ্চয় ফার্স্ট লিড করবে। চব্বিশ পয়েন্ট টাইপটা রঞ্জি কোয়ার্টার ফাইনালের পক্ষে খুব ছোটোই হবে, অন্তত ছত্রিশ পয়েন্টে ডাবল কলাম…ডাবল কেন তিন কলামেই হওয়া উচিত! জিতলে তো বাংলা সেমিফাইনালে যাবে। ওখানে কি বছর বছর বাংলা উঠতে পারে? বাংলা কি বোম্বাই? রাজেনের ছবি তো নিশ্চয়ই থাকবে। বোকার মতো হাসা মুখওয়ালা ছবিটা হয়তো আবার ছাপবে। রোহিণী ভগবানকে ডাকল, রাজেনের অন্যরকম ছবি কালকের কাগজে দেখার আশায়। তার কাছে রাজেনের ভালো কোনো ছবি নেই। লাল নিউজপ্রিন্টে ছাপা হলে যাচ্ছেতাই দেখাবে রাজেনকে। কুন্তীরা ইংরিজি কাগজ রাখে, হোয়াইট প্রিন্টে ছাপা। কাগজটা চেয়ে আনতে হবে ওদের কাছ থেকে। ছবিটা কেটে নিলে ওরা বোধহয় কিছু মনে করবে না। কুন্তীর ক্রাইম ডিটেকশন কতদূর এগোল, সেটা ও জানায়নি এখনও। চটপটে, বুদ্ধিমতী আর উদ্যোগী মেয়ে। নিশ্চয় ভেবে ভেবে একটা কিছু সলভ করবে।
সকালে কাগজ পেয়েই রোহিণী খেলার পাতা খুলে খুশি হল। লাল নিউজপ্রিন্ট নয়, বোকার মতো হাসা ছবিটাও নয়, ছত্রিশ পয়েন্টের টাইপে তিন কলাম হেডিংয়েই খবরটা রয়েছে। রাজেনের ধৈর্যশীল ব্যাটিং বাংলার ইনিংসকে একদিক থেকে ধরে রেখে যে কী অসাধারণ উপকার করেছে, তারই ব্যাখ্যানে ভরা রয়েছে লেখাটা। রোহিণী চারবার সেটা পড়ে অন্য পাতায় নজর দিল।
প্রথম পাতায় রাজনীতির কোস্তাকুস্তি, নেতাদের ভাঁড়ামোর আর মিথ্যে কথার জঞ্জাল টপকে ভিতরের পাতায় চোখ বুলোতে বুলোতে হঠাৎ রোহিণী ‘একি!’ বলে সিধে হয়ে বসল। ডাবল কলাম হেডিংয়ে দুর্ঘটনার খবর : বাড়িওলা—ভাড়াটে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু। খবরের তলায় ছোটো ছোটো সাব হেডিংয়ে তিন—চার লাইনে আরও চারটি দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর খবর। তারই একটা—অ্যান্টেনা সারাতে গিয়ে মৃত্যু: পার্কসার্কাস অঞ্চলে বহুতল এক বাড়ির ছাদে টিভি অ্যান্টেনা ঠিক করার সময় সুভাষ গায়েন নামে (৪৯) এক ব্যক্তি পাঁচতলার ছাদ থেকে বাড়ির উঠোনে পড়ে যান। নীলরতন হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
.
আট
খবরের কাগজে সুভাষ গায়েনের মৃত্যুসংবাদ চোখে পড়ার দু—দিন পর রোহিণী মিনিবাস থেকে পার্কসার্কাসে যখন নামল, তখন আকাশ থেকে সূর্যালোকের অবশিষ্ট দাগটুকু মুখে নিয়েছে সন্ধ্যা।
এই দু—দিন সে ফ্ল্যাট থেকে বেরোয়নি। অপেক্ষা করেছে শোভনেশের কাছ থেকে টেলিফোনের জন্য। আসেনি। ভেবেছে, সুভাষ গায়েনের অপঘাত মৃত্যুটা নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি আর কিছু? সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। তবে লোকটিকে যতদূর সে বুঝেছে, তাতে মনে হচ্ছে খুবই হুঁশিয়ার। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে কোনো কাজে হাত দেয় না। নিজেকে ও বাঁচিয়ে চলার কথাটা সবার আগে ভাবে। টিভি অ্যান্টেনা নিয়ে কাজ করতে হলে নিরাপদে দাঁড়িয়ে কাজটা করা যাবে কি না নিশ্চয় সেটা দেখে নিয়েছিল। অবশ্য হুঁশিয়ার লোকেরাও দুর্ঘটনায় পড়ে। কিন্তু এটা যদি দুর্ঘটনা না হয়, তাহলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হল আত্মহত্যা।
রোহিণীর হাসি পেয়ে গেছিল সুভাষের আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথাটা ভেবেই। যে লোক টাকার জন্য বউকে ঠেলে পাঠাত শোভনেশের কাছে নগ্ন হবার জন্য, ছবি জালিয়াতি করত, সে অন্যকে ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে, কিন্তু নিজেকে নয়। এরা নিজের জীবন সম্পর্কে খুব ভীরু হয়, নিজেকে নিরাপদ করার জন্য টাকা সংগ্রহের কাজে নির্মম হয়। আত্মহত্যা করার মতো কোনো কারণ এরা জীবনেও খুঁজে পায় না, যুক্তি দিয়ে আত্মহত্যাকে অনিবার্য করে তোলার মতো মানসিক কাজেও এরা অপটু। সুতরাং দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেও রোহিণী বাতিল করেছে।
তাহলে যেটা বাকি থাকে, তাই নিয়েই সে দু—দিন খাপছাড়াভাবে ভেবেছে। খবরের কাগজে জয়পুরের খবর তাকে বিষণ্ণ করেছে কেননা বাংলার ক্রিকেটাররা তাদের চরিত্র বজায় রেখে প্রথম দিনের চার উইকেটে ২৭১—কে দ্বিতীয় দিন সকালে এক ঘণ্টার মধ্যেই দশ উইকেটে ৩২৩ করে ফেলে। রাজেন প্রথম ওভারেই বোল্ড হয় মাট্টুর বলে। রাজস্থান তারপর সাড়ে নয় ঘণ্টা খেলে তৃতীয় দিন চা—এর আধ ঘণ্টা পর নয় উইকেটে ৫৪০ রান তুলে প্রথম ইনিংস ছেড়ে দেয়। ২১৭ সানে পিছিয়ে পড়লে সেই ম্যাচ শেষ দিনে যে জেতা দুঃসাধ্য প্রায়, অন্তত বাংলার পক্ষে, সেটা রোহিণীর মতো ক্রিকেট—আনাড়িও বোঝে। খবরের কাগজটা তালগোল পাকিয়ে মেঝেয় ছুড়ে দিয়ে সে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল।
গৌরীর মা কাজ সেরে যাবার সময় ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘শরীর খারাপ?’
‘না।’
‘তবে শুয়ে আছ যে?’
‘মন খারাপ।’
রোহিণী উঠে বসল। আড়মোড়া ভেঙে চুলের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে চুল খামচে ধরে বলল, ‘খুব চেনা একজন লোক ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে।’
‘সে কি গো! ছাতে পাঁচিল ছিল না?’
রোহিণী জানে না পাঁচিল আছে কি না। মনে হয় আছে। এতবড়ো বাড়িতে কি লোকেরা ছাদে ওঠে না? ছাদে ওঠার ব্যবস্থা থাকলে পাঁচিলও নিশ্চয় থাকবে।
