‘তা হবে কেন, তোমার ইন্টারেস্ট তো শুধু—’ কথার মাঝে থমকে কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে গলা নামিয়ে রোহিণী বলল, ‘রাজেন, আমি গভীর সুখে এখন আচ্ছন্ন, আজ আর ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না। তুমি আমাকে আর উসকানি দিয়ো না।’
‘তুমি যে সত্যিই সুখী হয়েছ, এইবার সেটা বুঝতে পারলাম, আমাকে ধাতাবার এমন সুযোগ হাতে পেয়েও ছেড়ে দিচ্ছ দেখে।’
‘দিচ্ছি, তার কারণ তোমার মতো মনের উপর এমন কমান্ড, এত ভয়ংকর ইচ্ছাশক্তি আমার নেই। ঝগড়া করে এমন মানুষের সঙ্গে পারা যায় না।’
‘রুনি, আজ প্রত্যেকটা রান আমি হৃদয় দিয়ে কালেক্ট করেছি, প্রতিটি স্ট্রোক আমার অন্তর সুখে ভরিয়ে দিয়েছে, এসবই তোমাকে দেব বলে।’
‘ওই রানগুলো এনে আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দাও, আমি শরীরে মাখব।’
‘বেচারা শোভনেশ সেনগুপ্ত! তার ব্রাশ যা পেল না, আমার ব্যাট তা পাবে!’
গলাখাঁকারির শব্দে সচকিতে রোহিণী পিছনে তাকাল। তুষার দত্তের পুরো পরিবার তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অপ্রতিভ হয়ে সে দ্রুত রিসিভারে বলল, ‘রাজেন আর নয়, ফোনটা অনেকক্ষণ আটকে রেখেছি, এরপর কথা বলব কলকাতায় তুমি ফিরে এলে। রাখছি, অ্যাঁ, কী বললে?’
‘লোক রয়েছে তোমার পাশে?’
‘হ্যাঁ’।
‘কত দূরে? চুমুর আওয়াজ পৌঁছবে?’
‘হ্যাঁ… মানে, না পৌঁছবে না।’
আলতো বুজে এল রোহিণীর চোখের পাতা। সারা মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল উষ্ণ আবেশ। এক মিনিট পর ‘হয়েছে, আজ এই পর্যন্ত থাক।’ বলে রিসিভারটা ক্রেডলে রেখে দিয়ে সে লাজুক মুখে বোকার মতো হাসল।
‘আপনাদের অনেক অসুবিধে হচ্ছিল, কিন্তু কলটা জয়পুর থেকে এসেছে খুব দরকারি একটা ব্যাপারে, তাই একটু সময় লাগল।’
‘আমাদের কোনো অসুবিধে হয়নি তো।’ নন্দা কথাটা বলেই তার মায়ের দিকে তাকাল। আরতি মাথা নাড়ল। ‘বুবুল বলল, আন্টি ফোনে কথা বলতে বলতে কাঁদছেন। তাই ভাবলাম, কোনো খারাপ খবর হয়তো পেয়েছেন।’
‘উলটো, খুব ভালো খবরই পেয়েছি।’ রোহিণী আরও কৌতূহল মেটাবার দায় থেকে রেহাই পেতে দরজার দিকে এগোল। নন্দা তার সঙ্গ নিয়ে দরজার কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল, ‘আঙ্কলকে বলেছেন সেইটে আনতে?’
‘ম্যাক্সি?…ঠিক আনবে, ও কথা দিলে কথা রাখবেই।’
‘আপনাদের হেলথ ক্লাবে আমি কিন্তু ভরতি হব।’
‘হয়ো।’
‘আঙ্কল কি পাগল হয়ে গেছলেন?’
‘হয়নি, তবে ফিরে এসে হবে।’
রোহিণী মিষ্টি করে হেসে নন্দার চুল আঙুল দিয়ে এলোমেলো করে, সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে গেল। নন্দা দরজা বন্ধ করার আগে কান খাড়া করে রইল। ‘ধপাস’ একটা লাফ দেবার শব্দ পেয়েই, তার মুখে হাসি খেলে গেল।
রাজেনের জয়পুর রওনা হবার আগে তার সঙ্গে যেসব কথা হয়েছিল, রোহিণী তার রোমন্থন করছিল ঘুমের আগে। কথার পর কথা সার দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ সারিটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। কী আশ্চর্য, এটা তো আগেই তার মনে পড়ার কথা। রাজেন বলল ‘সেঞ্চুরি করতে পারব, বাজি! তাইতে বললাম, বাজি—টাজি নয়, তবে এটা হবে আমার জন্য লটারি। যদি সেঞ্চুরি করো, তাহলে নিশ্চিত হয়ে যাব, হাসপাতাল থেকে শোভনেশ পালায়নি, ওটা অন্য কেউ।’
লটারির ফল কী দাঁড়াল? রাজেন সেঞ্চুরি করেছে, তাহলে তো শোভনেশ পালায়নি। ওটা অন্য কেউ। এরকম কি হতে পারে? বহু সময় তো অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। ভাগ্য সে মানে না, কোনোদিন লটারির টিকিট কেনেনি, জ্যোতিষীকে হাত দেখায়নি, কিন্তু আজব জিনিস তো ঘটতেই পারে। কিছু না ভেবেই সে কথাটা বলেছিল, কারণ অবচেতনে তার এটাই ধারণা ছিল: রাজেন সেঞ্চুরি করতে পারবে না আর হাসপাতাল থেকে পালানো লোকটা শোভনেশই।
অবিশ্বাসের বীজ রোহিণীর মনে পুঁতে দিয়েছে গত কয়েক দিনের ঘটনা। এখন অন্ধকার ঘরে ঘুম—না—আসা রাতে একমনে ভাবতে ভাবতে সেই বীজ থেকে অঙ্কুর বেরিয়ে এল। সেটা ক্রমশ বেড়ে উঠে চারায় পরিণত হল। যতই রাত গভীর হচ্ছে, ততই সে সন্দেহের সার, যুক্তির জল ঢেলে চারাটাকে বাড়িয়ে তুলল। তার মনে হতে লাগল, খবরের কাগজের ওই কয়েক লাইনের খবরটায় তার ভয় পাওয়া দেখেই গঙ্গাদা সেটাকে কাজে লাগাবার জন্য, ‘শোভনেশ আসবে’, ‘শোভনেশ আসছে, শোভনেশ এসে পড়ল’ আর এখন, ‘শোভনেশ এসে গেছে’ যেন বাচ্চচাদের কাছে জুজুর ভয় দেখাবার মতোই, মিথ্যেমিথ্যেই এইসব বলে তাকে আতঙ্কের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছেন? ভয়ের চাপে কোণঠাসা করে সম্পূর্ণতই তাকে গঙ্গাদা—নির্ভর করে তোলার একটা চেষ্টা যেন হয়ে আসছে।
কিন্তু যেই ওঁকে বললাম, শোভনেশ এখন কলকাতায়, কাল দুপুরে আমায় খুঁজতে ফ্লাটে গেছিল, অমনি গঙ্গাদা কেমন করে যেন চমকে উঠলেন। গঙ্গাদা প্রতিটি কথায় অদ্ভুতভাবে রিয়্যাক্ট করেছিলেন। মনে হয়েছিল, রোহিণীকে যেন তিনি টাইম বোমার মতো বিপজ্জনক জিনিস বলে ধরে নিয়েছেন। কখন কোথায় কীভাবে ফাটবে, সেটা বুঝে উঠতে পারছেন না।
শোভনেশ কলকাতায় এসে গেছে শোনার পরই গঙ্গাদাকে খুব চিন্তিত দেখিয়েছিল। বলেছিলেন, ‘এখন তোমার সেফটির কথা ভাবতে হবে।’ কেন বললেন? রোহিণী, তুমি একা থাকো, তুমি বিপন্ন, আনসেফ, অতএব আমার কবজার মধ্যে এসো? কোনো প্রশ্ন কোরো না শোভনেশের আঁকা ছবি, বাড়ি ইত্যাদি সম্পর্কে। টাকাকড়ি সংক্রান্ত ব্যাপারে খুব সেনসিটিভ মনে হয়েছিল। মাথায় যেন এই চিন্তাই ওঁর ঘুরছিল। চাকরি দিয়েছি করো, থাকার জায়গা দিয়েছি থাকো, বিয়ে করতে চাও করো, কিন্তু অন্যরকম কিছু ভাবতে বা করতে চাও যদি তাহলেই ওই শোভনেশ জুজুকে ধরিয়ে দেব। প্রাণের ভয় করে না, এমন মানুষ অবশ্যই আছে, গঙ্গাদা আমাকে তাদের মধ্যে রাখার যোগ্য মনে করেনি। রোহিণী মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়েও হেসে ফেলল। গঙ্গাদার ভুলটা ভেঙে দেওয়া দরকার। কিন্তু কীভাবে?
