‘হ্যালো রাজেন…তোমার রান কত? এই এক বদ অভ্যেস তোমার, আসল কথাটা না বলে যত্ত সব আগডুম বাগডুম শুরু করবে।’
‘তোমাকে কি বলে এসেছিলাম?’
‘কী আবার বলেছ!…ওহ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কৈলাস মাট্টুর প্রথম ওভারে প্রথম বলেই ব্যাট নামাবার আগেই…তারপর বোকা মতো মুখ করে ফিরে আসছ…তা ফিরে এসেছ তো? জানি আমি প্রথম বলেই তুমি… ফিরে আসার সময়কার মুখটা দেখতে পেলাম না এই আফশোসটা সারা জীবনের জন্য রয়ে গেল। সারাক্ষণ শুধু অসভ্যতা করার চিন্তা যারা করে, এক মুহূর্তের জন্য যারা সিরিয়াস হতে পারে না, তারা কনসেনট্রেট করবে কী করে? প্রোগ্রেসিভ রিল্যাকসেসন, পজিটিভ অ্যাফারমেশন—শুধু বড়ো বড়ো কথা। সাব কনসাসে ঢুকে আছে তো একটা জিনিসই, রোহিণীর সঙ্গে বাঁদরামো কী করে করব, তারই প্ল্যান।’
‘টেলিফোন চার্জ কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে।’
‘বাড়ুক আমি দিয়ে দেব। তা প্রথম বলেই না দ্বিতীয় বলে?’
‘শেষ বলে।’
‘ওহ, প্রথম পাঁচটা বল তাহলে মাট্টুকে করতে হয়েছে। একটা দুটো রান করেছ তো, নাকি গোল্লা?’
‘গোল্লা, দুটো গোল্লা।’
‘দুটো কেন? একটা তোমার আর একটা আমার জন্য?’
‘ঠিক একশো করলে, একের পর দুটো গোল্লাই তো বসে!’
‘তার মানে!’
‘মানে দিনের শেষ বলে মাট্টুকে স্কোয়ার লেগে ফ্লিক করে, ঠিক গাওস্কারের মতো, একটা রান নিয়ে নিরানব্বুই থেকে একশোয় পৌঁছে ড্রেসিং রুমে ফিরে এসে প্যাড খুলে, স্টেডিয়ামের অফিস থেকে ফোন করার চেষ্টা করে, লাইন না পেয়ে, এখানকার একজনকে সঙ্গে নিয়ে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে চলে এসেছি শুধু একটা কথাই কলকাতার একজনকে বোঝাতে: রুনি, আমি তোমায় ভালোবাসি।
‘ইউ গট আ সেঞ্চুরি! তুমি, তুমি…রাজেন, রাজেন!’
‘অ্যান্ড ইটস ফর ইউ। আমি বলছিলাম পারব, দ্যাখো পারলাম। ক্লিন অ্যান্ড অনেস্ট, আনব্লেমিশ, স্পটলেস… আমার ভালবাসার মতো। দুশো ছত্রিশ বল খেলে মাত্র তিনটে চার, বুঝতে পারছ কীভাবে নিজেকে অ্যাপ্লাই করেছি। বলেছিলাম, বাজি ধরো, আমি করবই। তুমি ভয় পেয়ে রাজি হলে না বাজি ধরতে, আমাকে তো বিশ্বাসই কর না… এ কি রুনি কাঁদছ, রুনি তুমি কাঁদছ!’
‘না কাঁদিনি। আমি ভীষ শক্ত মেয়ে রাজেন।’ চোখ থেকে নেমে আসা জলের ধারা বাঁ হাতে মুছে নিয়ে রোহিণী বলল। ‘সামান্য তো একটা সেঞ্চুরি, এতেই আমি কাঁদব নাকি? কত কঠিন পরিস্থিতি আমি ফেস করেছি, আমার জীবনে অনেক ঝড় বয়ে গেছে, যাচ্ছেও, এক ফোঁটা চোখের জলও আমার পড়েনি। আজই বা পড়বে কেন?’
‘তুমি কি সুখী হয়েছ? রুনি, শুধু এইটুকুই জানতে চাই। …কথা বলো, উত্তর দাও।’
গলা থেকে চিবুক হয়ে টপটপ ঝরে পড়ছে চোখের জল। কথা বলার মতো অবস্থা রোহিণীর আর নেই। দুটি কাঁধ আবেগ চাপার চেষ্টায় থরথর কাঁপছে।
‘সারা দিনে প্রথম কখন তোমাকে মনে পড়ল জান? শেষ রানটা কমপ্লিট করে স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়েই দেখি ওখানে তোমার মুখ। তার আগে পর্যন্ত ডেলিবারেটলি তোমাকে মন থেকে মুছে ফেলে দিয়েছিলাম। শুধু একলব্যর মতো আমি কনসেনট্রেট করে গেছি আমার গোলের দিকে। ভাগ্যিস ওটা ছিল দিনের শেষ বল। আর একটা বল খেলতে হলেই আমি অবধারিত বোল্ড হতাম।’
‘কেন?’
‘তখন আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারতাম না। পাগল হয়ে যাব মনে হচ্ছিল, কমপ্লিট পাগল।’
‘না না।’ হঠাৎ রোহিণীর কান্না বন্ধ হয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে এল আতঙ্কমাখা দুটো শব্দ।
‘একদম এসব কথা এখন আর ভাববে না। একদম আর ফোন করবে না। কথা দাও।’
‘সে কী! এখনই তো বেশি করে ফোন করব।’
‘না রাজেন, না। আমি আর পাগল নিয়ে ঘর করতে চাই না। ওই শব্দটা তুমি আমার কাছে আর উচ্চচারণ করবে না। ম্যাচ শেষ হলেই প্রথম যে ফ্লাইট পাবে, তাইতে চলে আসবে।’
‘কোথায় আসব?’
‘আমার কাছে।’
‘অসম্ভব, এখানে প্রচুর সুন্দরী মেয়ে খেলা দেখছে। গলিতে রাবারের বলের ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি করলেই মেয়েরা অটোগ্রাফ চায়, আর আমি তো ফুল সেঞ্চুরি করেছি, অটোগ্রাফ দেবার জন্য ভাবছি দুটো দিন থেকে যাব।’
‘এখানে এসে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের রেজিস্ট্রি বুকে আগে অটোগ্রাফ দিয়ে তারপর পৃথিবীর যাবৎ সুন্দরীদের প্রাণভরে অটোগ্রাফ দিয়ো…কন্টিনিউ প্লিজ অপারেটর, কন্টিনিউ…দমদমে নেমেই সোজা আমার কাছে চলে আসবে। এখন ফ্ল্যাটেই সারাক্ষণ আছি, কেননা চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কয়েক দিনের মধ্যে ফ্ল্যাটটাও ছাড়ব। তুমি এসো তখন সব বলব।’
‘চাকরি ছেড়েছ? মনে হচ্ছে গুরুতর কিছু ঘটেছে?’
রাজেনের কণ্ঠে উদবেগ ফুটে উঠেছে। রোহিণীর মনে হল, চাকরি ছাড়ার খবরটা রাজেনকে দিয়ে সে ভুল করল। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের মাঝখানে এটা শুনে, ওর পক্ষে মন লাগিয়ে খেলা আর সম্ভব হবে না। নিশ্চয় নানান রকম আজেবাজে অনুমান শুরু করে সেঞ্চুরি পাওয়ার আনন্দটা নষ্ট করবে। যা সিরিয়াস ছেলে!
‘রাজেন, এখনও চাকরিটা ঠিক ছাড়িনি, কিন্তু ছাড়ব ছাড়ব অবস্থায় এসেছি। ঠিক করেছি আর চাকরি নয়, বিজনেস করব। আমি আর কুন্তী…ওহহ কুন্তী হল নীচের সেই ইয়ুপ্পির বউ, খুব ভালো মেয়ে। প্রস্তাবটা কাল ওই দিল, সল্ট লেকে মেয়েদের জন্য একটা হেলথ ক্লাব খোলার।’
‘আমি কি সেখানে ইনস্ট্রাকটারের কাজটা পাব?’
‘না। মেয়েদের জন্য ক্লাব, সেখানে দারোয়ানের চাকরিও তুমি পাবে না।’
‘তাহলে নট ইন্টারেস্টেড ইন ইওর বিজনেস ভেঞ্চার।’
