যেমনই ভাবা, সঙ্গে সঙ্গে সে তাই করল। মেঝেয় শুয়ে সে ঘাড় থেকে গোড়ালি পর্যন্ত কঠিন শীতল স্পর্শটা সইয়ে নিয়ে দুই মুঠি বুকে জড়ো করে রাখল। এবার নেগেটিভ ইমোশনগুলো বার করে দিতে হবে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরের আসবাব আবছা দেখাচ্ছে। হাতে লেখার কাজ রয়েছে, সেজন্য কিছু ভাবা, কয়েকটা মহারানির সংখ্যা দেখা আর দু—তিনজন লোকের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু কিছুতেই এখন সে এসবে মন বসাতে পারবে না। একটা টেলিফোন কলের জন্য তাকে এই অন্ধকার ঘরে চুপচাপ অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
শোভনেশ কেন তার সঙ্গে কথা বলতে চায়? রোহিণী চেষ্টা করল কারণটা খুঁজে বার করতে। তাদের দু—জনের মধ্যে সম্পর্কটা শেষদিকে এমনই বিষিয়ে উঠেছিল যে, শোভনেশ পুলিশ হাজতেও তার সঙ্গে দেখা করেনি। কাগজে কাগজে ফলাও করে তখন এই খুন নিয়ে সত্যি—মিথ্যে গল্প ছাপা হচ্ছিল। তাই পড়ে মরমে মরে যাচ্ছিল রোহিণী আর নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিচ্ছিল। যাই হোক, একসময় সেসবও ধুলোচাপা পড়ে গেল। ফিসফাস, কানাকানি বন্ধ হল, তারপর সেও বোম্বাই চলে গেল। সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে এসে ভালোই দিন কাটছিল, কিন্তু হঠাৎ আবার শোভনেশ রাহুর মতো তার জীবনে ফিরে এল কেন?
ভাবনার জাল বুনতে বুনতে রোহিণী অন্ধকার ঘরে কতক্ষণ সময় যে অতিবাহিত করল তা সে জানে না। দরজার বেল বেজে উঠতে তার জালবোনা থেমে গেল। ধুত্তোর ছাই! এইসব চিন্তা করে কি নেগেটিভ ইমোশন মন থেকে বার করা যায়? ধড়মড়িয়ে উঠে ম্যাক্সিটা মাথা দিয়ে গলাতে গলাতে সে ভাবল, কে এল এখন? হৃদয়রঞ্জন? সুজাতা? কুন্তী? শোভনেশ যে নয়, এটা সে ধরে নিতে পারে। আলো জ্বেলে সে দরজার আই হোল দিয়ে দেখল, তুষার দত্তর ছোটোছেলে।
‘আন্টি, আপনার ফোন।’
ধড়াস করে উঠল রোহিণীর বুক, শোভনেশের ফোন? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি গঙ্গাদা ওকে খবর দিলেন কী করে? মাত্র তো আজ দুপুরেই সে বলেছে শোভনেশের সঙ্গে দেখা করতে চায়। ইতিমধ্যেই কি আবার গঙ্গাদাকে ফোন করে তার ফোন নাম্বারটা পেয়ে এখন তাকে ফোন করছে?
‘কে ফোন করছে? নাম বলল কি?’
‘না। শুধু বলল নীচের তলায় রোহিণী সেনগুপ্তকে দয়া করে একবার ডেকে দেবেন? খুব জরুরি দরকার।’
‘পুরুষ না মেয়ে?’
‘পুরুষ।’
‘আচ্ছা যাচ্ছি। কে কে আছে তোমাদের ঘরে?’
‘বাবা ছাড়া সবাই আছি।’
ছেলেটি ছুটে উপরে উঠে গেল। দরজার চাবিটা হাতে নিয়ে একপা একপা করে রোহিণী সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে বলল, ‘স্টেডি রোহিণী, স্টেডি…বী কাম, ভয় পেয়ো না। লোকটা অনেক দূরে, তোমায় সে দেখতে পাচ্ছে না, হাত বাড়িয়ে তোমার গলাও ধরতে পারবে না।… ঠান্ডা মাথায় কথা বলবে, আগে বুঝতে চেষ্টা করো ও কী করতে চায়, তারপর সেইমতো জবাব দেবে। দরকার হলে কঠিন হবে, কর্কশ গলায় নিজেকে প্রকাশ করবে, ভয়ও দেখাবে।
‘হ্যালো।’ রোহিণীর স্বর কেঁপে গেল এইটুকু শব্দ বার করতেই। ওধারে ঘরঘর শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন লং ডিস্টান্স কল। আবার সে বলল, ‘হ্যালো।’
হঠাৎ ঘরঘরানিটা থেমে গেল। ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ পরিষ্কারভাবে ভেসে এল, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আমি রোহিণী, আমি রোহিণী।’ রোহিণী ফোনটা কানে চেপে ঝুঁকে পড়ল। স্বরটা তার খুব চেনা।
‘আমি রাজেন।’ একটা ইঙ্গিতময় নীরবতা রিসিভারে বিরাজ করল। বক্তা যেন আশা করছে বিস্মিত অভিব্যক্তির ও উচ্ছ্বাসের একটা প্রকাশ।
‘গলা শুনেই আমি বুঝতে পেরেছি তুমি। ওহহ—কী ভীষণভাবে যে আমি চাইছিলাম একটা ফোন কল!’
‘কার কাছ থেকে?’ চিমটি কাটা প্রশ্ন এল।
‘তোমার কাছ থেকে। না না, অন্য কারোর কাছ থেকে।’ রোহিণী চিমটির জবাব দিল আর সঙ্গে সঙ্গে শোভনেশের মুখটা তার মনে পড়ল।
‘কে সেই পাপিষ্ঠ নরাধম ভাগ্যবান, যার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আকুল অপেক্ষায় ছিলে?’
‘রাজেন কালীঘাট কী দর্জিপাড়া থেকে নয়, জয়পুর থেকে বোধহয় ফোন করছ, তাই নয়?’
‘অবশ্যই। তোমার কী ধারণা, জয়পুর যাবার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি জয়নগরে গিয়ে বসে বসে মোয়া খাচ্ছি?’
‘না, তা খাচ্ছ না। জয়পুরেই সম্ভবত গেছ। কিন্তু টেলিফোন চার্জ কত পড়বে, সেটা জেনে নিয়েছ কি? টাকাটা কি সিএবি দেবে, না নিজের পকেট থেকে দিতে হবে?’
‘এ প্রশ্ন কেন? টাকা তো আমিই দেব?’
‘তাহলে চটপট কাজের কথাট বলে নাও। আমাদের দেশে টেলিফোন ব্যবস্থাটা এমনই, যেকোনো সময় লাইন কেটে যেতে পারে। সুতরাং দরকারি কথাটা আগে সেরে নাও।’
‘রোহিণী…’। নীরবতা।
‘বলো।’
ওধার থেকে কোনো সাড়া এল না। রোহিণী রিসিভার কানে চেপে ব্যগ্র স্বরে বলল, ‘রাজেন, কী হল? বলো?’
‘তোমায় ভালোবাসি।’
রোহিণীর সারা দেহ অবশ হয়ে এল। বুকের মাঝখান থেকে তুবড়ির রঙিন ঝাড়ের মতো একটা আলোর উচ্ছ্বাস তার দেহের প্রতিটি কোষে আনন্দের খবর পৌঁছে দিচ্ছে। এখন সে কথা বলবে কী করে?
‘রোহিণী, কী হল? কথা বলো?’ উৎকণ্ঠিত স্বর ভেসে এল।
‘রাজেন, আবার বলো।’ আবেশ জড়ানো বিহ্বল গলায় উত্তর দিল।
‘তোমায় ভালোবাসি।’
‘বলার জন্যই তো সোজা মাঠ থেকে ছুটে এসেছি টেলিফোন অফিসে। আধ ঘণ্টার চেষ্টায় লাইন পেলাম। আজ প্রথম দিনে আমরা চার উইকেটে দুশো একাত্তর। তার মধ্যে আমার…’।
‘আহ থামলে কেন?’
টেলিফোন অপারেটর মেয়েটি গড়গড় করে কী যেন হিন্দুস্থানি ইংরিজিতে বলে উঠল। রাজেন তাকে ‘প্লিজ কন্টিনিউ’ বলল।
