‘রাজেন, তোমার কথাগুলো খুবই উপকারী। কিন্তু এখন এইখানে বসে এগুলো মাথায় ঢোকানোর মতো অবস্থা আমার অবচেতনে নেই। তার কারণ কোনোরকম ভয়, উদবেগ, কনফিডেন্সের অভাব আমি আপাতত পাচ্ছি না।’
‘এত নিশ্চিতভাবে বলছ কী করে? ভয়টয় তো একদিন পেতেও পার। এই যে আমি ফর্ম হারিয়ে ছিলাম, সেটা এখন এক ভয় থেকেই যা আমি কল্পনাও করিনি কখনো।’
‘কি ভয় থেকে?’
‘রোহিণী নামে এক ভদ্রমহিলার হৃদয় জয় করতে পারব কী পারব না! ভাবতে ভাবতে ব্যাটিং কনসেনট্রেশন নষ্ট হল, টেনশন শুরু হল, ভয় ধরতে লাগল, ক্যাচ ফেলতে লাগলাম, রান আউট হলাম, রান আউট করালামও…’
‘হুমম। আর কী কী হল?’
‘সে বিরাট লিস্টি, সব এখন অবচেতন থেকে তুলে আনতে হবে, আমার অত সময় নেই।’
‘হাত ছাড়ো। পাশে লোক অসভ্যতা কোরো না।’
‘সাইকোলজিস্ট বলল, পজিটিভ অ্যাফারমেশন চাই। দিনরাত শুধু বলে যাও, রোহিণী, রোহিণী, আই মাস্ট উইন হার হার্ট, আই মাস্ট… আই মাস্ট…’
‘তা উইন হয়েছে কি?’
‘না। কারণ, হার হার্ট ইজ মাচ মাচ টাফার দ্যান গাওসকরস ডিফেন্সিভ ব্যাট, মাচ মাচ ক্রুয়েলার দ্যান ভিভ রিচার্ডসেস অ্যাগ্রেসিভ ব্যাট, মাচ মাচ…কী বলব…সোনিয়া গান্ধীর মুখেও হাসি দেখেছি কল্পনা করতে পারি, শাবানা আজমি পেটে বাচ্চচা নিয়ে শাড়ি পরে শুয়োর তাড়াতে তাড়াতে সাঁতরে গঙ্গা পার হচ্ছে দেখেও হাসি চাপতে পারি, কিন্তু এই ভদ্রমহিলার হৃদয় যে কী বস্তুতে গড়া, তা আজও বুঝতে পারলাম না।’
‘তার মানে পজিটিভ অ্যাফারমেশন তোমার ওপর কাজ করল না, তার মানে ফর্মও ফিরে পেলে না… তাহলে বেঙ্গল টিমে চান্স পাও কী করে?’
‘রান করে।’
‘রান পাচ্ছ তাহলে?’
‘পাচ্ছি, কিন্তু ওগুলো কি রান? ওকে কি রান বলা উচিত? একটা রানের পিছনে হৃদয় নেই, একটাও অন্তর দিয়ে পাওয়া নয়।’
‘রিল্যাক্স, রিল্যাক্স রাজেন…উত্তেজিত হয়ে পড়েছ, আর এক মিলিমিটার এগিয়েছ কী আমার পাশের দু—জন প্রতিবাদ জানাতে উঠে পড়বে, তখন কিন্তু বিপদ আসবে।’
‘কীভাবে আসবে।’
‘ওই জায়গায় দুটো খিটখিটে বুড়োবুড়ি এসে যদি বসে!’
রোহিণী হাসতে শুরু করল। রাজেনের কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলে গেছিল তার চারপাশের জগৎকে। ঘটে যাওয়া এতরকম ঘটনা, তাই থেকে বেরিয়ে আসা নানারকম উদবেগ, উৎকণ্ঠা, ভয়, সবগুলো জড়ো হয়ে মনের উপর একটা চাপ, যেটা ছায়ার মতো অনবরত তার সঙ্গী হয়ে ঘুরছে—সব সে ভুলে গেছিল কিছুক্ষণের জন্য রাজেনের পাশে বসে।
একথা ঠিক, রাজেন একবার সাইকোলজিস্টের কাছে গেছিল, যখন হঠাৎই ফর্ম হারিয়ে রান পাচ্ছিল না। রোহিণী ভেবে দেখল, এখন তার মানসিক অবস্থাটা ঠিক তখনকার রাজেনের মতো হয়ে উঠেছে, ভয় ধরছে, প্রত্যয় নেই নিজের উপর, কী হয় কী হয় একটা উদবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। মনের মধ্যে একটা আলোড়ন, রাজেন বলেছিল, একে নেগেটিভ ইমোশন বলে, এটা মন থেকে বার করে দিতে হয়। সেজন্য কারোর কাছে ভয়ের কথা, উদবেগের কথা স্বীকার করতে পারলে খুবই ভালো হয়। কিন্তু এখন সে কার কাছে মন খুলে কথা বলবে? তার একান্ত হিতার্থী, শুভার্থী, বন্ধু বলতে তো একজনও নেই, রাজেন ছাড়া!
নেগেটিভ ইমোশনের খর্পরটা আলগা করার জন্য রাজেন অবচেতনাকে তৈরি করত ইতিবাচক কথা অবিরত আউড়ে,আর তার নিজের সফল ব্যাটিংয়ের দৃশ্য চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলে। রোহিণীকে সে বলেছিল, ‘চোখ বুজে দেখতাম, ইডেনে খেলা হচ্ছে ভারত বনাম বিশ্ব একাদশ। গাওস্কর আর আমি ভারতের হয়ে ওপেন করতে নেমেছি। বল করবে লিলি আর অ্যান্ডি রবার্টস। গাওস্কর রবার্টসের বল ফস্কাচ্ছে, প্যাডে লাগাচ্ছে, ক্যাচ তুলে বেঁচে যাচ্ছে। আঁকুপাকু করে কোনোরকমে টিকে রইল। আর আমি লিলিকে পরপর দুটো স্ট্রেট ড্রাইভ করে একটা হুক, একটা কাট করলাম। প্রথম ওভারেই ষোলো রান নিলাম। এইভাবে কল্পনায় হ্যাডলি, ইমরানকেও খেলতাম। সবাই তুচ্ছ আমার কাছে। তারপর মনে মনে বলতাম, সব বোলার আমার চাকর, পিটিয়ে সব বোলারের চামড়া তুলব। আমি ধীরে, স্থির শান্ত মনে ক্রিজে থাকব। কনসেনট্রেশনের আমার কোনো খুঁত নেই—।’
রোহিণী ঘরের মেঝেয় চিৎ হয়ে শুয়ে, সায়ার দড়ি খুলে দিয়ে চোখ বুজল। শরীর আলগা, শ্বাস—প্রশ্বাস গভীরভাবে ধীরে ধীরে। এই পর্যন্ত তার ঠিকই হয়েছে, এবার পজিটিভ করা অবচেতনে নামিয়ে গেঁথে দিতে হবে। কী বলবে সে? একটু নাভার্স হয়েই সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য ফিসফিস করে বলল: শোভনেশকে ভয় করি না। কে শোভনেশ?
গঙ্গাদাকে ভয় করি না। কে গঙ্গাদা?
সুভাষ গায়েন ফের মিথ্যা কথা বললে ধরে ফেলব। বোকা ভেবেছে নাকি?
শোভনেশ ফোন করলে কড়া জবাব দেব। বলব, আমার দুটো অ্যালসেশিয়ান, একটা ডোবারম্যান আছে, কামড়ে দিলে আমি কিন্তু দায়ী হব না।
কিন্তু অবচেতনে মিথ্যে কথা জমানোটা কি উচিত হবে? রোহিণী মনে মনে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে কুকুর বাতিল করল। রিভলভার আছে, ছোরা আছে, এসবও বলবে না ঠিক করল। তাহলে পজিটিভ স্টেটমেন্ট আর কী হতে পারে?
সে চোখ খুলল। অনুভব করল, মোটেই নিজেকে রিল্যাকসড মনে হচ্ছে না, মনের মধ্যে সাহস, ভরসা কিছুমাত্র জমেছে বলেও মনে হচ্ছে না। হঠাৎই এইভাবে নিজেকে বদলে নেওয়া যে যায় না, দিনের পর দিন অভ্যাসের মধ্যে থেকে অবচেতনকে গড়ে তুলতে হয়, রোহিণী তা বুঝতে পারল। এখন পুরো নগ্ন হয়ে আধ ঘণ্টা মেঝেয় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে হয়তো হালকা স্বচ্ছন্দ হতে পারবে।
