এখন বিকেল। এই সময় ঘরে থাকা রোহিণীর জীবনে খুব কমই ঘটেছে। কিন্তু সে যাবেই বা কোথায়, করবেই বা কী? মন এলোমেলো হয়ে গেছে, একটা ব্যাপারেও স্থিরভাবে নিবদ্ধ হতে পারছে না। তার ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তাবোধ ছায়ার মতো তার সঙ্গী হয়ে রয়েছে। অস্বস্তি আর অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছে। সবার আগে এই ছায়াটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া দরকার। ছড়িয়ে যাওয়া, অগোছাল, মনটাকে সংহত করে আনতে হবে একটা বিন্দুতে।
কী আশ্চর্য, রাজেন তো এই কথাগুলোই একদিন তাকে বলেছিল! একটা সিজন সে রানই পেল না। ক্লাব ক্রিকেটে একটার পর একটা ইনিংস ফেইল করেছে। তারপর রঞ্জি ট্রফির প্রথম খেলা অসমের সঙ্গে। অফ ফর্মে থাকা প্লেয়ারদের ফর্ম ফিরিয়ে দেওয়ার টিম হল অসম। কিন্তু রাজেনকে ব্যাটিং ফর্ম ফিরিয়ে দিতে পারল না। দু—ইনিংসে তার রান হল, তিন আর এগারো। এই সময় কে যেন রাজেনকে প্রোগ্রেসিভ রিল্যাকসেসন পদ্ধতির কথা বলেছিল।
‘সেটা আবার কী জিনিস?’ রোহিণী জিজ্ঞাসা করেছিল রাজেনকে। সন্ধ্যাবেলায় ওরা তখন বুড়ো হিলম্যানে চেপে বাবুঘাট থেকে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল গঙ্গার ধার দিয়ে। ‘বলছি, আগে গাড়িটা পার্ক করার একটা জায়গা বার করি।’
গাড়ি রেখে দু—জনে, খোঁজাখুঁজি করে একটা বেঞ্চ পায়, যার কাছাকাছি লম্বা গাছ থাকায় জায়গাটা আলো—আঁধারি মধ্যে পড়ে গেছে। বেঞ্চে অল্পবয়সি দুটি ছেলেমেয়ে বসেছিল। রোহিণী বসল বেঞ্চের মাঝখানে, ছেলেটিকে ডাইনে আর রাজেনকে বাঁদিকে রেখে। ছেলেটি তখন অস্বস্তি ভরে আর একটু সরে গেল মেয়েটির দিকে। সরে গিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে কথা বলা চালিয়ে যেতে থাকে। রাজেন কানের কাছে মুখে এনে বলে, ‘খবরদার কানটা যেন ওদিকে না যায়।’
‘কেন, অন্যের কথা শোনাই কি আমার অভ্যাস?’
‘তা নয়। ওদের দ্বারা প্রভাবিত হলে নিজের ওরিজিন্যালিটি নষ্ট হবে। আমি তো ওইজন্য ভয়ে বাংলা গল্প—উপন্যাস পড়িই না। প্রেমের ডায়লগগুলো এত ডাল, একঘেয়ে!’
‘আর সেইজন্যই বাংলা গল্প—উপন্যাসের এই দুর্দশা। ভালো করে প্রেম করবার মতো নায়কই আর খুঁজে পাচ্ছে না বাঙালি লেখকরা।’
‘তার জন্য কি আমি দায়ী নাকি?’
‘তোমার মতো রসকষহীন ওরিজিন্যাল লোকের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে, সুন্দর সুন্দর মিথ্যে কথাও আর এখন ছেলেরা বলতে পারে না। আমার পাশে এখন কী কথা চলছে, জান? রোহিণী ঝুঁকে রাজেনের কাঁধে মুখ ঠেকিয়ে বলেছিল।
‘আস্তে বলো, আস্তে, মুখটা আর একটু তোল, হ্যাঁ… কী কথা বলছে?’
‘এত কম স্যালারিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাচ্চচাকে পড়ানোর প্রেশার নিতে পারবে না। …রাজেন এটা পাবলিক প্লেস, মুখ সরাও…হ্যাঁ, তাহলে বোঝো কাণ্ড। বিয়েই হল না এখনও, আর কিনা তর্ক জুড়ে দিয়েছে। আরে বাবা, এখন গঙ্গার ধারে বসে বলবি তো—নিশ্চয় পড়াব, পুরো মাইনেটাই স্কুলে দেব। সাখাওয়াতে পড়াব, সাউথ পয়েন্টে পড়াব, প্র্যাট মেমোরিয়াল, ক্যালকাটা গার্লস, বয়েজ, শ্রী শিক্ষা, হিন্দি হাই, লা মার্ট, সেন্ট জেভিয়ার্স, দার্জিলিং যেখানে তোমার ইচ্ছে—বাচ্চচাকে সেখানেই পড়াব, বাচ্চচা গড়গড়িয়ে ইংরিজি না বলা পর্যন্ত আমাদের এই ভালোবাসা পূর্ণতাই পাবে না। এইসব এখন বলে যাবে। তা নয়, বলছে কিনা প্রেশার নিতে পারব না!’
‘প্রেশার! প্রেশারের কথা বলল?’ রাজেন নড়েচড়ে বসে। ‘আমার দশায় পড়েছে তাহলে। জানো, আমার এক সাইকোলজিস্ট বন্ধুর কাছে গত বছর গেছিলাম। একদমই তখন রান পাচ্ছিলাম না। লিগ ম্যাচে, একটা মাত্র ফিফটি, বাকি সব দশ, পনেরো, তিরিশ। ভয়, উদবেগ, অনিশ্চয়তা, কনফিডেন্সের অভাব, এইসব থেকে শরীরে আর মনে যে স্ট্রেস তৈরি হয়, তার খানিকটা দূর করার জন্য বন্ধুটি আমাকে প্রোগ্রেসিভ রিল্যাকসেসনের কথা বলল। ব্যাপারটা হল, প্রথমে একটা নির্জন শান্ত জায়গা বেছে নাও, যেখানে অন্তত পনেরো কুড়ি মিনিট কেউ আসবে না। ভালো হয় নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে খিল দিয়ে দাও। হাত, পা, ঘাড় একটু ছড়িয়ে নাও ব্যায়াম করে। তারপর বাবু হয়ে বসো কী চিৎ হয়ে শোও। চোখ বন্ধ করো। গভীরভাবে আস্তে আস্তে শ্বাস টানো আর ছাড়ো। রিল্যাকস। শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ভেবে যাও শরীর থেকে সব টেনশন, উদবেগ, দুশ্চিন্তা তুমি বার করে দিচ্ছ। এই সময় বিশেষ কোনো কিছু নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। যা মনে আসছে আসুক আবার চলেও যাক, ভাবনাচিন্তা আঁকড়ে থাকবে না। এভাবে দশ—পনেরো মিনিট শরীরটা আগলা করে ছেড়ে দিয়ে, শরীর শক্ত করো, পাঁচ সেকেন্ড, টানটান করো। ব্যস। দিনে দু—বার, পারলে তিনবার এটা করা দরকার। এতে শরীর রিল্যাকসড হয়, টেনশন কমায়।’
‘এই করেই তুমি ফর্ম ফিরে পেলে? রোহিণীর কাছে ব্যাপারটা হেঁয়ালি মনে হয়। এক সহজেই কী স্ট্রেস কাটিয়ে রাজেন রানে ফিরে এল?
‘আরে না না, শুধু কী এই? নিজের সঙ্গে অনবরত কথা বলতে হয়েছে, অনবরত বলতে হয়েছে আমি রান পাব, পাবই; জিতব, জিতবই। এটা হল, পজিটিভ অ্যাফারমেশন। সজ্ঞানে ক্রমাগত অবচেতনে ইতিমূলক এইরকম ধারণা ঢুকিয়ে দিলে, আচরণে এর প্রভাব পড়বেই। সেজন্য অবচেতনকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে মোটিভেশনের আর কনসেনট্রেশনের জন্য হারার ভয়, নার্ভাসনেস, উদবেগ, ইনজুরির ভয়, নিজের উপর রেগে যাওয়া এইসব নেগেটিভ ব্যাপার দূর করতে এই পজিটিভ অ্যাফারমেশনকে দরকারের সময় কাজে লাগানো যায়। প্রোগ্রেসিভ রিল্যাকসেসনের সময় সাহস আর কনফিডেন্স তৈরি করার মতন কিছু কথা বার বার মন্ত্রের মতো আউড়ে অবচেতনে গেঁথে দিতে হয়।’
