‘গঙ্গাদা!’ রোহিণী অস্ফুটে বলল।
‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়েছে। এই ক—বছর গীতা কথাটা গোপন করে রাখার কষ্ট আর সহ্য করতে না পেরে আমার মতো এক বাইরের লোককে পেয়ে বলে ফেলে বুক হালকা করে। তারপর আমি চলে আসি।’
সুজাতা মুখ ফিরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। রোহিণীও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল এলোমেলো ভাবনায়।
‘আমি বিশ্বাস করিনি। শোভনেশের পক্ষে একাজ কখনোই সম্ভব নয়। এখন দেখছি আমার বিশ্বাসে ভুল হয়নি।’
সুজাতা জানালার বাইরে চোখ রেখেই কথাগুলো বললেন। রোহিণী ফিসফিস স্বরে বলল, ‘এখন আর জেনে কোনো লাভ হবে না। ও তো পালিয়ে রয়েছে।’
‘থাকুক, কিন্তু ওর এই খুনি অপবাদটা মুছে দেওয়ার দরকার।’
‘তাহলে বীণা জানলা দিয়ে নীচে পড়ল কী করে?’
‘আত্মহত্যা করতে পারে! অন্য কেউ ওকে ঠেলে ফেলে দিতে পারে।’
‘অন্য কেউ!’ রোহিণী ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে, ‘অন্য আর কে আছে ওই বাড়িতে, যে ঠেলে ফেলে দেবে? একটা তো ঝি, তাও সেদিন সে সকালে ছুটি নিয়েছিল। সবথেকে বড়ো কথা, কোর্টে শোভনেশ নিজে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছে, সে খুন করেছে। বলেছিল, যা শাস্তি দেবার, দিয়ে দিন।’
‘যা খুশি ও বলুক, খুন করেছি বললেই সে খুনি হয়ে যায় না। চাক্ষুষ প্রমাণ দেবার মতো লোক পাওয়া গেছে।’
সুজাতা উঠে বসে হঠাৎই রোহিণীর হাত দু—হাতে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলে উঠলেন, ‘রোহিণী একবার চেষ্টা করে দ্যাখো না, পুলিশ আবার তদন্ত করে, নতুন করে মামলাটা তুলুক। যা খরচ হয়, আমি সাধ্যমতো দেব। তুমি ভালো একজন উকিল ঠিক করে তাকে সব কথা বলো। হাজার হোক, তোমার স্বামী তো! তুমি কি চাও না, ও ফিরে আসুক?’
রোহিণী প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল অভাবনীয় অপ্রত্যাশিত এই প্রস্তাবে। ফ্যালফ্যালে ভাবটা তার চোখ থেকে সরে যাবার পর কঠিন চাহনি ফুটে উঠল। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল।
‘শোভনেশের সম্পর্কে তার প্রেমিকা মোহাচ্ছন্ন থাকতে পারে, কিন্তু স্ত্রীর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তাকে ফিরিয়ে আনার। মাফ করবেন, আমার জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে লোকটিকে আপনি কখনো দেখেননি। বহুদূর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যোদয় অপরূপ দেখায়, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করুন, দেখবেন কী কর্কশ বিশ্রী পাথর দিয়ে সেটা তৈরি। আমি চললাম।’
রোহিণী ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার কাছে পৌঁছবার আগেই শুনতে পেল সুজাতার চিৎকার।
‘আমি যাব? উকিলের কাছে, পুলিশের কাছে। আমার দুটো চোখও যদি নষ্ট হয়, তবু কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না, পারবে না…।’
সুজাতার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে রোহিণী সিঁড়িতেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বিশ্রী লাগছে তার নিজেকে। আজ দু—দুটো ঝগড়া সে করে ফেলল অল্প সময়ের মধ্যে। গঙ্গাদার সঙ্গে যা হল, সেটা অবশ্য ঠিক ঝগড়ার পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু কীসের পর্যায়ে যে পড়ে, সেটাও সে ঠিক করতে পারছে না। চরিত্র হনন করার মতো কয়েকটা অভিযোগ সে করেছে, তাকে ঝগড়া বলা যায় না। গঙ্গাদা কিছু কিছু উত্তর দিয়েছেন আর প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়েছেন, ‘মারাত্মক বিপদে পড়বে।’ তাইতে সে হেসেছে। হাসিটা গঙ্গাদা দেখেছেন কী না, তা সে লক্ষ করেনি। চ্যালেঞ্জ নিলাম, এইরকম একটা ঔদ্ধত্য তখন রক্তে টগবগিয়ে উঠেছিল।
এই টগবগানি সবসময়, সর্বত্র দেখানোটা ভালো নয়। একটু ট্যাকটিকাল হওয়া ভালো। জীবন নিয়ে টানাটানির মতো ব্যাপারে খুব ঠান্ডা মাথায়, অগ্রপশ্চাৎ ভেবে পা ফেলতে হয়, কথা বলতে হয়। সিঁড়ি দিয়ে এক পা, এক পা করে নামতে নামতে রোহিণী ভাবল, গঙ্গাদাকে খোঁচানোটা উচিত হয়নি, অন্তত এই মুহূর্তে। শোভনেশ ওঁকে ফোন করেছিল শোনামাত্রই বীরত্ব দেখিয়ে, ‘রোহিণী তার সঙ্গে দেখা করতে চায়’ বলাটাও তার হাঁদামো হয়েছে।
চাবি দিয়ে দরজা খুলতে খুলতে পায়ের আওয়াজ পেল রোহিণী। তুষার দত্তর ছোটো ছেলে উঠে আসছে লাফাতে লাফাতে।
‘অ্যাই শোনো, আমার একটা ফোন আসার কথা আছে, এলেই ডেকে দিয়ো, কেমন?’
‘কখন আসবে?’
কী মুশকিল! এটা তো সে শোভনেশকে জানাবার জন্য গঙ্গাদাকে বলে দেয়নি! করে যদি, তাহলে নিশ্চয় লুকিয়ে—চুকিয়ে রাত্রিবেলাতেই করবে। গঙ্গাদা হয়তো তাই বলে দেবেন।
‘রাতের দিকে আসবে। এলেই কিন্তু—।’
ছেলেটি মাথা নেড়ে ব্যস্ত হয়ে উপরে উঠে গেল। সিঁড়িতে ধাপে ধাপে হৃদয়রঞ্জনের মাথাটা জেগে উঠছে। রোহিণী দাঁড়িয়ে থাকল।
‘আপনি একটু পরে যাবেন, মাসিমা এখন—’
‘কী হয়েছে?’ উদবিগ্ন হয়ে তাকালেন হৃদয়রঞ্জন।’ চোখে কী আবার কিছু হল নাকি?’
‘চোখে নয়।’ রোহিণী গলার স্বর খাদে নামিয়ে এনে বলল, ‘আমার সঙ্গে একটু মতান্তর ঘটেছে, তাইতে আপসেট হয়ে গেছেন।’
‘কেন?’
পলকের জন্য রোহিণীর চাহনি কঠিন হয়েই আবার মৃদু হল। ‘উনি যা চাইছেন, আমার পক্ষে তা করা সম্ভব নয়। বোধ হয় কেউই তা করতে চাইবেন না। উনি চাইছেন—’
‘আমি জানি।’
হৃদয়রঞ্জন চশমার পুরু কাচের আড়ালেও তাঁর চোখের জ্বলে ওঠা ঝলকানি গোপন করতে পালেন না। দু—জনে দু—জনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারই মধ্যে রোহিণীর জানা হয়ে গেল পুরুষ ও নারীর মধ্যে লক্ষ বছরের টানাপোড়েনের বার্তা। হৃদয়রঞ্জন নিঃশব্দে নীচে নেমে গেলেন।
