ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে সে ঝরঝরে তাজা বোধ করল। চা তৈরি করে খেয়ে উপরে গেল সুজাতার সঙ্গে দেখা করতে। দরজা খুললেন হৃদয়রঞ্জন।
‘কেমন আছেন মাসিমা?’
‘একটু ভালো।’ হৃদয়রঞ্জন সরে দাঁড়ালেন রোহিণীকে ভিতরে আসতে দেবার জন্য। খাটে শুয়ে সুজাতা। বাঁ চোখে তুলো আর স্টিকিং প্লাস্টার। হাত দিয়ে খাটের খালি জায়গাটা চাপড়ে বললেন, ‘বোসো।’
‘কী করে পড়লেন?’
‘মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেছিল।’ সুজাতা ধীর স্বরে বললেন। তাঁর ডান চোখটা স্থিরভাবে রোহিণীর মুখভাব লক্ষ করছে। যা দেখতে চেয়েছিলেন, সেটা দেখতে পেলেন বোধ হয়। তাই কোনোরকম ভনিতা না করেই বললেন, ‘তুমি মনে মনে যা ভেবেছ তাই।’
রোহিণী তাড়াতাড়ি তার অপ্রতিভতা কাটাতে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারল না। সুজাতা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
‘তোমাকে কাল বাসে কয়েকটা কথা বলেছি।’ সুজাতা এই বলে দাঁড়িয়ে থাকা হৃদয়রঞ্জনের দিকে তাকালেন। ‘রোহিণীকে একটু চা করে দাও। তুমি তো এখন অফিস থেকেই আসছ?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু মাসিমা—’ সে থেমে গেল সুজাতার হাতের বারণ দেখে। চা করতে বলাটা আসলে তাঁর স্বামীকে ঘর থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই, এটা বুঝতে রোহিণীর অসুবিধে হল না। হৃদয়রঞ্জন ব্যগ্র হয়ে বেরিয়ে গেলেন।
‘আমি দিগম্বর বর্ধন লেনে গেছলাম। অনেক স্মৃতি রয়ে গেছে ওই বাড়িটাকে নিয়ে।’ শান্ত অচঞ্চল, কোমল স্বরে সুজাতা বললেন চোখে হাসির ঝিলিক নিয়ে। ‘একাই গেছলাম। চুপিচুপি, কেউ জানে না। এত বছর পর, খুব অবাক লাগছিল। শোভনেশের অংশটা বিক্রি হয়ে গেছে। নতুন মালিক মেরামত করে খালিই রেখেছে তালা দিয়ে। পাশে পরমেশদের অংশটা ভেঙেচুরে পড়ছে। বাড়ি সারাবার সামর্থ্য নেই। আর সারাবেই বা কে, পরমেশ তো পাগলের মতো অবস্থায়।’
‘অ্যাঁ!’ রোহিণীর মুখ থেকে বিস্ময়টা নির্গত হল স্বতঃস্ফূর্ত।
‘হ্যাঁ, কঙ্কালের মতো চেহারা হয়ে গেছে। মাথায় চুল নেই। ছেঁড়া ময়লা জামাকাপড়, গায়ে দুর্গন্ধ আর চুলকুনি। মনে হল, ভালো দেখতেও পায় না। আমার সঙ্গে ও কথা বলল, খুবই এলোমেলোভাবে। আমাকে চিনতে পারেনি, পারা অবশ্য শক্তই। কিছু কিছু পুরোনো কথা বললাম স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য, হুঁ হাঁ করল। ওকে দেখাশোনা করছে পুরোনো এক চাকর আর তার বউ।’
‘বিশ্বনাথ আর গীতা?’
‘হ্যাঁ, এই নামই বলল। পরমেশের একতলায় ওরা নাকি পনেরো বছর ধরে একটা ঘরে রয়েছে। আমাকে আর চিনবে কি! বিশ্বনাথ তখন ছিল না, গীতার সঙ্গেই কথা বললাম।’
সুজাতা থেমে রইলেন। মনের মধ্যে কী একটা দ্বন্দ্ব যেন শুরু হয়েছে, সেটা সামলাবার চেষ্টা করছেন। রোহিণী ব্যগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
‘জানো, গীতা একটা অদ্ভুত কথা বলল। এটা ওটা বলতে বলতে বীণার খুন হওয়ার কথাটা উঠেছিল। আমি বললাম, শোভনেশ যে এখন কাজ করবে, তা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। গীতা হঠাৎ বলল, ‘উনি কেন খুন করতে যাবেন? দোতলা থেকে নেমে বড়দা উঠোন পেরিয়ে যখন গেটের কাছে, তখনই তো মেয়ে মানুষটা জানলা দিয়ে নীচে পড়ল। আওয়াজ পেয়ে বড়দা ছুটে গেল। আমি তো তখন উঠোনের একধারে কাপড় শুকোতে দিচ্ছিলুম।’ রোহিণী, ওর এই কথাটা শুনে আমি তো অবাক! বললাম গীতাকে, তুমি তাহলে এ কথাটা পুলিশকে তখন বললে না কেন? দ্যাখো তো, একটা লোক মিছিমিছি এখনও জেল খাটছে। ও বলল, ‘আমি তো ভয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে তখন কাঁপছি। অমন জিনিস দেখলে ভয় পাব না? কিছু পরে নারানের বাবা এল, তখুনি ওকে সব বললুম। ও শুনেই বলল, চুপ চুপ, মুখে চাবি দিয়ে রাখ। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে আঠারো বছর কোর্টঘর থানা করিয়ে ছাড়বে। তুই বরং এখুনি বাপের বাড়ি চলে যা ছেলেকে নিয়ে, কাউকে মুখ ফসকে একটা কথা বলিসনি। ও বাড়ির ব্যাপারে আমাদের থাকার দরকার নেই। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নারানকে নিয়ে আমি তালতলায় বাপের বাড়ি চলে যাই। সাত দিন পরে ফিরে এসে শুনলাম, বড়দাকে পুলিশ ধরেছে। মনটা যে কী খারাপ হয়ে গেল সেই থেকে। বিশ্বাস করবে না রোহিণী, এই বলে সেই গরিব বউটা কাঁদতে শুরু করল।’
একটা ট্রে—তে দু—কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন হৃদয়রঞ্জন। ওরা দু—জন কাপ তুলে নিল।
‘তুমি একবার দারোয়ানকে বলে এসো, কারেন্ট এলেই যেন আমাদের ট্যাঙ্কটায় আগে জল ভরে দেয়।’ সুজাতা নম্রস্বরে স্বামীকে বললেন, ঘরে তার উপস্থিতিটাকে সরিয়ে দেবার জন্য।’
‘একবার বলে এসেছি।’
‘আর একবার বলে এসো।’ সুজাতার কঠিন দৃঢ় স্বর দ্রুত ঘর থেকে বার করে দিল হৃদয়রঞ্জনকে। যেন এইভাবে আদেশ দেওয়াটা নিয়মিত ব্যাপার, এমনভাবে সুজাতা হাসলেন। রোহিণীর মনে হল, চোখের কালশিরাটা বোধ হয় স্বামীকে হুকুম দিয়েই উনি তৈরি করতে বাধ্য করিয়েছেন। নয়তো এমন মিনমিনে লোকের পক্ষে এত সাহস হয় কী করে? সঙ্গে সঙ্গেই আবার তার মনে হল, মাথা গরম হয়ে কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়ে মানুষ অনেক কিছু করে ফেলে।
‘কী বলছিলাম যেন?…হ্যাঁ, গীতা তো কাঁদতে শুরু করল। আমি ওকে বললাম, তুমি বড়দার নতুন বউকে গিয়ে চুপিচুপি বলে দিতে পারতে। গীতা বলল, ‘নারানের বাপ চোখেচোখে রাখত আমায়, খালি শাসাত, খবরদার ওবাড়ির দিকে এক পা বাড়িয়েছিস কি এ বাড়িতে আবার একটা খুন হয়ে যাবে। বড়ো ঘরের ব্যাপারস্যাপারে নাক গলিয়ে লাভ কী? তা ছাড়া নতুন বউও তো বাড়ি ছেলে চলে গেল, আমি আর বলব কাকে? বড়দার এক বন্ধু আসত, মোটা, বেঁটে মতন। সে এসে নারানের বাপের সঙ্গে কথা বলত, আর গাড়িতে করে ছবি নিয়ে চলে যেত।’
