অবশেষে বাসটা ছাড়ল। লালদিঘি চক্কর দিয়ে লালবাজার পর্যন্ত পৌঁছতে এটা এবার যে সময় নেবে, তার মধ্যে একটা ট্র্যাফিক জ্যাম বা একটা লোডশেডিং ভরে দেওয়া যাবে! রোহিণীর কাঁধে রোদ লাগছে। আজ একটা সিরসিরে শুকনো বাতাস বইছে। রোদটা তাই জ্বালাচ্ছে না। শূন্য দৃষ্টিতে সে জি.পি.ও., রাইটার্স বিল্ডিংস, চার্চ, কলকাতা পুলিশের সদর ইত্যাদিতে চোখই শুধু রাখল, দেখল না কিছুই। ইতোমধ্যে সে আবার নিজের ভাবনায় ডুবে গেছে।
এইটুকু শুধু বলে দিলাম, মারাত্মক বিপদে পড়বে—কথাটা বলে গঙ্গাদা কী মিন করতে চাইলেন? দৈহিক বিপদ ছাড়া আর কি বিপদ ঘটা সম্ভব! দৈহিক মানে, খুন। মার্ডার! মৃত্যু! কীভাবে তাকে খুন করতে পারে? তার থেকেও বড়ো কথা—খুন কে করবে, এবং কেন করবে?
গঙ্গাদা? শোভনেশ? কিংবা ধরা যাক, সুভাষ গায়েন? এ ছাড়া আর কোনো নাম তো তার মনে আসছে না। ‘আমি চাই না, শোভু আর একটা মার্ডারের আসামি হোক’ অর্থাৎ গঙ্গাদার ধারণায় শোভনেশই কাজটা করবে। উনি তা আগাম জানলেন কী করে? সুভাষ গায়েনকে বিষ খাইয়ে বা গাড়ি চাপা দিয়ে খুনের চেষ্টা তো অন্য কেউ করেছিল, শোভনেশ নয়।
রোহিণী একটু ফাঁপরেই পড়ল। এইভাবে খুন একা করা সম্ভব নয়, লোক লাগিয়ে করতে হয়। সেজন্য টাকাকড়ির দরকার, পেশাদার খুনিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা দরকার। শোভনেশের পক্ষে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। সে হুট করে রাগের মাথায় কিছু একটা করে ফেলতে পারে কিন্তু ঠান্ডা মাথায় প্লট ভেঁজে কিছু করা অসম্ভব। তাহলে গঙ্গাদাই কি—!
‘রাম মন্দির, গিরিশ পার্ক, মানিকতলা, কাঁকুড়গাছি…’ কন্ডাক্টরের হেল্পার এমন চিৎকার করে উঠল যে, রোহিণীর ভাবনাটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। সে দেখল, বউবাজার—চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনুর মোড়ে বাস থেমে রয়েছে। রাস্তার ওপরে পাতাল রেলের কাজ চলছে। বিরাট একটা ডাম্পার আঁজলা ভরে রাবিশ তুলে লরিতে ফেলছে, আর তাই দেখতে ছোটোখাটো ভিড় জমে গেছে। রোহিণীও দেখতে লাগল। এই সময়ই চোখে পড়ল কুন্তীকে। হেঁটে চলেছে পুবদিকে ট্রাম রাস্তা ধরে।
কুন্তী এখানে! এখন! কোথায় চলেছে? ওদিকে তো বউবাজার—কলেজ স্ট্রিট মোড়, তারপরই দু—ধারে গহনার দোকান। টাকা জমিয়ে টুকটাক গহনা কেনার অভ্যাস হয়তো আছে। নেমে গিয়ে ওর সঙ্গী হবে কি না ভাবতে ভাবতেই বাস ছেড়ে দিল।
যাক গে, রোহিণী ভাবল, সিদ্ধার্থর লেখাটা পড়ে মিস্ট্রি বার করার মতো ধৈর্য ওর নেই, মাথাও নেই। কিছুটা প্যাঁচালো বুদ্ধি না থাকলে ক্রাইম ডিটেক্ট করা সম্ভব নয়। মেয়েটা খুবই সরল, তাই—ই থাকুক বরং। স্বামী অফিসে গেলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে টো টো কোম্পানি করে আবার বিকেলের মধ্যে ঘরে ফিরে যদি জীবনে একটু বৈচিত্র্য আনতে পারে তো আনুক।
রোহিণী তার চিন্তা সরিয়ে নিল কুন্তীর থেকে নিজের উপর। তাহলে গঙ্গাদাই কি টাকাকড়ি খরচ করে সুভাষ গায়েনকে মারার চেষ্টা করেছেন? সন্দেহটা প্রকাশ করে সে কি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনল? তাই নয়, ছবি জাল করার কথাও কি তোলা উচিত হয়েছে? এতেও গঙ্গাদাকে খুব বিচলিত দেখাল, তার মানে জড়িত। খুনের থেকেও এটা তো কম অপরাধের কাজ নয়। শোভনেশের ছবি বাজারে আসছে কার কাছ থেকে? নিশ্চয় গঙ্গাদার কাছে প্রচুর ছবি লুকোনো আছে। সে নিজেও তো দিগম্বর বর্ধন লেনের বাড়িতে প্রায় চল্লিশ—পঞ্চাশটা ছবি স্তূপ করে রাখা দেখেছিল। গঙ্গাদা বলেছেন, ওগুলো পোকায় কেটে, বৃষ্টির জলে নষ্ট হয়ে গেছে! সব বাজে কথা। বাসদেবপুরে শোভনেশকে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন, তখনকার আঁকা ছবিগুলোর কী হল? খুন, রক্তপাত যাই আঁকুন না, ছবি তো বটে! দাম তো আছে। গঙ্গাদা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, এইবার প্রশ্ন উঠবে : জাল নয়, আসল ছবিগুলো কোথায় কার কাছে? প্রশ্নটা যে তুলতে পারে, তাকে ধরাধাম থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কি হবে না?
রোহিণী ধীরে ধীরে অবশ হয়ে ঝুঁকে পড়ল। মৃত্যুর কথা মনে আনতে সে চায় না, তবুও মনে এসে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে শক্ত একটা কী যেন ক্রমশ ঢুকছে। একে বোধ হয় ভয় বলা হয়। অবস্থাটা কাটিয়ে ওঠার জন্য সে মনে মনে বলল, ‘আমি একটা ভোঁদা, আমার মাথায় গোবর, আমি মাথামোটা। কপালে হাত রেখে সে ভাবল, আমারই এখন কোথাও পালিয়ে যাওয়া উচিত, খুনিদের নাগাল এড়িয়ে। গঙ্গাদাকে মিথ্যাবাদী বলাটাও ঠিক কাজ হয়নি। সেনগুপ্তদের পাগলের বংশ নয়, এটা মেনে নিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? তা নয়, শোভনেশ গলা টিপে ধরেছিল, তখন ওকে দেখাচ্ছিল পাগলের মতো, প্রত্যেক জেনারেশনে একজন পাগল হয় আর এই জেনারেশনে সেটা হয়েছে শোভনেশ—এইসব কথা বলে গঙ্গাদাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেওয়ার কী এমন দরকার ছিল? মাথা গরম হয়ে গেলে যাদের বুদ্ধিশুদ্ধি কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়, তারা বিপদে পড়বে না তো আর কে পড়বে? এইভাবেই তো—হ্যাঁ, এই কাণ্ডজ্ঞান লোপের জন্যই আজ শোভনেশের এই দশা!
বাস থেকে নেমে ফ্ল্যাটে ঢোকা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই রোহিণী এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল, কেউ যদি মারাত্মক বিপদে তাকে ফেলতে চেষ্টা করে, তাহলে যথাসাধ্য বাধা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাতে মৃত্যু হয় যদি, হবে। কিন্তু এখন থেকে তাকে চোখ কান খুলে সাবধানে থাকতে হবে। কেন জানি তার মনে হচ্ছে, অশুভ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রাজেন তাড়াতাড়ি ফিরে এলে সে মনে জোর পাবে। এখন এইটেই তার দরকার।
