‘আমি নয়, সুভাষ গায়েনই এইরকম মনে করে। আর মীনা চ্যাটার্জি মনে করে, শোভনেশের অরিজিন্যাল বহু ছবি কোথাও লুকোনো আছে, এখন একটা—দুটো করে বিক্রির জন্য বাজারে আসছে, দশ—পনেরো হাজার দাম ছিল তিন বছর আগে, এখন আরও বেশি। কেউ একজন মনে হয়, ছবি বিক্রি করে লাভ করছে।’
রোহিণী দেখল গঙ্গাপ্রসাদ রাগে থরথর করে কাঁপছেন। কথা বলার চেষ্টা করেও কিছু আওয়াজ ছাড়া বোধগম্য কোনো শব্দ মুখ থেকে বার করতে পারছেন না। রোহিণী অপেক্ষায় রইল ওঁর ব্লাডপ্রেশার নেমে আসার জন্য।
‘আর কী তুমি বলবে আমার সম্পর্কে?’ গঙ্গাপ্রসাদ অবশেষে আস্ত একটা বাক্য বলার মতো অবস্থায় ফিরে এলেন। ধীরে ধীরে আবার চেয়ারে বসলেন।
‘দিগম্বর বর্ধন লেনের বাড়িটা বিক্রি হয় মামলা চলার সময়ই… না, টাকার কথা তুলব না। বাড়িটা কে কিনল শুধু সেটাই জানতে চাই, আর কত দামে অমন পজিশনের বাড়িটা বিক্রি হল?’
‘তুমি তো অনেক খবরই জোগাড় করেছ, এটাও করে নিয়ো। শোভনেশ জানে কে কিনেছে, কত দামে কিনেছে।’
‘আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘কীভাবে করবে?’
‘আপনাকে ফোন করবে আবার। ওকে আমার ঠিকানা দিয়ে বলুন দেখা করতে।’
‘ও তোমাকে বিশ্বাস করে না। তুমি পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারো।’
‘না, দেব না। আর যদি তাই মনে করে, তাহলে ফোনেই যোগাযোগ করুক। আমার উপর তলায় ফোন আছে, নম্বরটাও আপনি জানেন। থ্রি সেভেন টু ফাইভ…আচ্ছা, নয় আবার লিখেই দিচ্ছি।’
‘থাক, নম্বর আমার কাছে আছে। কিন্তু এটা তোমার পক্ষে খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। আমি চাই না, শোভু আবার একটা মার্ডারের আসামি হোক।’
‘হবে না। বীণা আর আমি এক জিনিস নই।’ বলার সঙ্গে রোহিণীর হাত আর মুঠি আপনা থেকেই শক্ত হয়ে গেল।
‘ব্রাভাডো দেখবার চেষ্টা করো না রোহিণী, যেমন জীবন চলছে তেমনিভাবেই চালাও। চাকরি করছ, প্রেম করছ, হয়তো বিয়েও করবে। এইসবই করো, কেন একটা বাসি জিনিস ঘেঁটে ঝামেলায় জড়াবে! তুমি বুদ্ধিমতী, সুতরাং বুঝতেই পারছ শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ তোমার হবে না, ক্ষতি ছাড়া।’
‘লাভ—লোকসান না খতিয়েই তো জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এলাম। আমি মনে করি না, তাতে ঠকেছি। লোকসানকেও আমি কাজে লাগিয়ে লাভে পরিণত করে নিয়েছি।’
বলতে বলতে রোহিণী উঠে দাঁড়াল। ঝোলাটা কাঁধে গুছিয়ে, হাঁটু দিয়ে চেয়ারটা পিছনে ঠেলে সে আবার বলল, ‘বুঝতে পারছেন নিশ্চয়, আমার পক্ষে আপনার কাছে কাজ করা আর সম্ভব নয়, উচিতও নয়। দুটো লেখার কাজ হাতে রয়েছে, ও দুটো শেষ করে আর আমি এখানে আসব না, আপনার ফ্ল্যাটও ছেড়ে দেব, কিন্তু যতক্ষণ না শোভনেশের সঙ্গে কথা বলছি, ফ্ল্যাট থেকে ততক্ষণ নড়ব না।’
রোহিণী দরজার কাছে পৌঁছেছে, তখন গঙ্গাপ্রসাদ ডাকলেন।
‘কাজ তুমি ছেড়ো না, আমারও তো কাজের লোক দরকার। তবে তুমি বিপদে পড়বে, এইটুকু শুধু বলে দিলাম, মারাত্মক বিপদে পড়বে।’
রোহিণী জবাব দিল না। একটা অদ্ভুত হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়ল। গঙ্গাপ্রসাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার মনে হল, এখন তাকে অপেক্ষা করতে হবে দু—জনের জন্য। শোভনেশের আর রাজেনের জন্য।
অফিসে কারোর সঙ্গে কথা না বলে রোহিণী তিন তলা থেকে নেমে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। এখন সে কী করবে? ঘড়ি দেখল। বিবাদী বাগের দিকে মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে সময় কাটাবার উপায় খুঁজতে লাগল। সিনেমায় যেতে পারে, কিন্তু ম্যাটিনি শোয়ে ছবি দেখার বয়স আর নেই। কারোর বাড়ি? দুপুরে ছোটোলোকরাই গল্প করতে লোকের বাড়ি যায়, তা ছাড়া কার বাড়িতেই বা সে যাবে? এখন জাদুঘরে কি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কি চিড়িয়াখানাই হচ্ছে সময় কাটানোর ভালো জায়গা। কিন্তু তার যাবার ইচ্ছে হল না।
মিনিবাস স্ট্যান্ডে দুটো সল্টলেকের বাস দাঁড়িয়ে। সে ফ্ল্যাটে ফিরে যাবার কথা ভাবল। অনেক দিন দুপুরে ঘুমোয়নি, আজ বরং ঘুমোবে। এই স্থির করে সে প্রথম বাসটায় উঠে একমাত্র খালি সিটটায় বসল, যেটায় জানালা পাওয়া যায়। খালি থাকার কারণ, পিছনের চাকার ঢাকাটা একটা চৌকো বাক্সর মতো উঁচু হয়ে আছে পা রাখার জায়গাটায়। বসলে হাঁটু দুটি প্রায় বুকের কাছে এসে যায়। এইরকম বাসও কলকাতা মেনে নিয়েছে, পয়সা দিয়েও মুখ বুজে অস্বাচ্ছন্দ্য সংগ্রহ করে। কী সহ্যশক্তি এই শহরটার! রোহিণী ভাবল, নাকি সিদ্ধার্থ যা বলেছিল সেটাই ঠিক, গোটা কলকাতাটাই ঝিমোচ্ছে! ভালো কথা, সিদ্ধার্থের সঙ্গে এখন একবার তো দেখা করা যায়!
কিন্তু কীজন্য? রোহিণী ভাবতে শুরু করল। দেখা করে কী—ই বা আর সে জানবে? সেই তো একঘেয়ে কয়েকটা কথা। আর তার ভালো লাগছে না এই শোভনেশ আর শোভনেশ। বরং ও সশরীরে আসুক বা ফোনেই কথা বলুক। ওকে সে বলবে, খুন একটা করে ফেলেছ, ভালোই করেছ, বেশ করেছ। প্রতিদিন কাগজ খুললেই গন্ডা গন্ডা খুন আর আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। এসব এখন জলভাত হয়ে গেছে। সুতরাং শোভনেশকে সে বলেই দেবে, তোমাকে নিয়ে কেউ মাথাব্যথা করছে না, পুলিশও বোধ হয় করছে না। যে যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। জেল ভেঙে পালিয়েছ, ভালো কাজই করেছ। এখন নিজেই নিজেকে সামলাও, আমি কোনো সাহায্য টাহায্য করতে পারব না। মীনার ঠিকানা দিচ্ছি, সেখানে চলে যাও। সে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওখানে তোমার চেনা আর একটা লোককেও পাবে। যদি ইচ্ছে হয়, তাহলে সুভাষ গায়েনের চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকি দিয়ে বরং বলতে পারো—তুই ব্যাটা আমাকে দিয়ে আজেবাজে ছবি আঁকাতিস, সেজন্য আমি নষ্ট হয়ে গেছি। অবশ্য পয়সা পেতাম ঠিকই, কিন্তু তোর বউকে সিটিং দেবার জন্য আর তুই পাঠাতে রাজি হলি না কেন রে? জানিস না, ওকে আমি ভালোবাসতাম?
