গঙ্গাপ্রসাদের মৃদু শান্ত গলা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে এল। টেবিলের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। চিবুকের নীচে চর্বির ভাঁজ ফেলে মুখটা নীচু করা।
‘কিন্তু আমার তো মনে হয়, ছবি জাল করা নিয়েই এই খুন ঘটেছে। সিদ্ধার্থকে আপনি যা বলেছেন তাতে মনে হচ্ছে, বীণার স্বামী ব্ল্যাকমেইল করে ছবি আঁকিয়ে নিত।’
‘কারেক্ট। শোভু নিজে আমায় বলেছে।’
‘তখন মাঝে মাঝে ওর পাগলামি দেখা দিত।’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু আমাকে সেদিনই আপনি বলেছেন, ওদের বংশে কেউ কখনো পাগল হয়নি। সুজাতা গুপ্ত সম্পর্কে বললেন, শী ইজ এ লায়ার, বললেন সুজাতার থেকেই এই মার্ডারের সূত্রপাত। আবার সিদ্ধার্থকে বলেছেন আমিই মার্ডারের জন্য দায়ী, এখন আবার বলছেন, আপনি নিজেও অনেকটা দায়ী। গঙ্গাদা, আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা বুঝতে। এত লোক দায়ী করলে তো শোভনেশকে আর মার্ডারার ভাবাই যায় না।’
‘একদিক থেকে দেখলে তাই। সব কাজের পিছনেই কিছু কারণ থাকে। সুজাতা, তুমি, আমি—আরও কেউ কেউ হয়তো এইসব কারণ জুগিয়ে গেছি।’
‘আরও কেউ কেউ মানে? ছবি জাল করার ব্যাপারে যারা জড়িত, তাদের কথা বলছেন কি?’
‘হ্যাঁ। সিদ্ধার্থ সিংহি নিশ্চয় নামটা তোমায় বলেছে।’
‘বলেছে। আমি তার সঙ্গে কথাও বলেছি।’
রোহিণীর চোখ ছুরির ফলার মতো ধারালো হল। গঙ্গাপ্রসাদ অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন। বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন, রোহিণী এবার কী বলবে।
‘কী বলল সুভাষ গায়েন? আমি তার কাছে গেছিলাম ছবি জাল করার ব্যবসা খুলব বলে?’
রোহিণীর হঠাৎ নিজেকে নিরস্ত্র, অসহায় মনে হল। তার মুখের কথা গঙ্গাদার মুখ থেকেই বেরিয়ে আসবে, এটা সে ভাবতে পারছে না। সবই উনি জানেন তাহলে।
‘কি ঠিক বলেছি?’ গঙ্গাপ্রসাদ চোখ পিট পিট করলেন।
‘হ্যাঁ’। অস্ফুটে রোহিণী বলল।
‘গায়েনও ঠিক বলেছে। হ্যাঁ, আমি গেছিলাম ওর কাছে। এর পিছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল, আর সেটা হল শোভুকে ভয় দেখিয়ে ও যেসব ছবি আঁকিয়ে নিচ্ছিল, তা বন্ধ করা। গায়েনের অভিধানে শুধু একটাই শব্দ আছে—টাকা। ওকে যদি টাকা কামাবার অন্য একটা রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারি, তা হলে হয়তো শোভুকে রেহাই দেবে। এই ভেবেই জাল করার পথটা ওকে চিনিয়ে দিয়ে আসি।’
‘তার আগেই আপনি শোভনেশকে কলকাতা থেকে সরিয়ে বাসুদেবপুরে নিয়ে গেছিলেন। সেখানে সে মোটেই গ্রামজীবন আর প্রকৃতি নিয়ে ছবি আঁকেনি। সেখানে উন্মাদের মতো শুধু লাল আর কালো রং দিয়ে একটা মেয়েকে খুনের বীভৎস ছবি আঁকত। খুন করত সে বীণাকে। সুভাষ গায়েন সেখানে গেছিল, তাকেও শোভনেশ খুন করবে বলেছিল। গঙ্গাদা, আপনি আমাকে বলেছিলেন, ওদের নাকি পাগলের বংশ নয়। মিথ্যা কথা বলেছিলেন। ওদের প্রত্যেক জেনারেশনে একজন করে পাগল হয়েছে। এই জেনারেশনে সেটা শোভনেশ। ন্যুড সিটিং দিতে চাইনি বলে ও আমার গলা টিপে ধরেছিল, যা কোনো প্রকৃতিস্থ লোক করবে না। আমার মনে হয়েছিল, আই রিয়্যালি ফেল্ট যে, আমাকে ও সেদিন মেরেই ফেলত যদি না—যদি না তখন পরমেশ এসে পড়ত।’
এক নিশ্বাসেই প্রায় জেট বিমানের টেক—অফের মতো রোহিণী তার ফুসফুসে চাপ দিয়ে মুখ থেকে কথা বার করাল। মুখে রক্ত ছুটে এসেছে। বুক ওঠানামা করছে।
‘পরমেশ? ওখানে?’ গঙ্গাপ্রসাদকে ঝুঁকিয়ে দিল তার বিস্ময়। ‘সে তো পাশের বাড়িতে থাকে। অবশ্য ছাদ দিয়ে আসতে পারে, যদি সিঁড়ির দরজা খোলা থাকে।’
‘হ্যাঁ, তাই এসেছিল। পরমেশের একটা বদ অভ্যাস ছিল। শোভনেশ যখন বীণাকে ন্যুড করিয়ে পোজ দেওয়াত, তখন পরমেশ চুপি চুপি এসে জানলার পাখি তুলে দেখত। আমার সম্পর্কেও এইরকম পারভারশন ওর ছিল। সেদিনও সে নিজেদের বাড়ির জানালা দিয়ে আমাকে স্টুডিয়োর ডিভানে বসে থাকতে দেখে ভেবে নেয় এবার বোধ হয় আমি ন্যুড হব, তাই সে তাড়াতাড়ি ছাদ দিয়ে চলে আসে। কিন্তু ততক্ষণে অন্য ব্যাপার ঘটে গেছে। আমি ছুটে তিন তলার ঘরে চলে এসেছি। পিছু পিছু শোভনেশও তাড়া করে আসছিল। কিন্তু সিঁড়িতেই তার সঙ্গে পরমেশের দেখা হয়ে যায়। সেটা পরে আমি ঝিয়ের মুখ থেকে শুনি।’
‘কী শোন?’ গঙ্গাপ্রসাদ কৌতূহল চাপতে পারলেন না। তাঁর মুখ ঈষৎ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। জল খাওয়া খালি গ্লাসটার দিকে একবার তাকালেন।
‘পরমেশ বলল, ‘কী রে, পেটে বাচ্চচা এসেছে নাকি? প্রথমটাকে তো নির্ঝঞ্ঝাটে পার করা গেছে, এটাকে কী অত সহজে পারবি?’ এই বলেই সে ছাদে উঠে যায়। শোভনেশ চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নীচে নেমে আসে। …গঙ্গাদা আমাকে আপনি বলেছেন, শোভনেশের প্রথম বউ প্রেগনান্ট কমলা বাথরুমে পিছলে পড়ে মারা যায়। কিন্তু তা নয়। পরমেশের ওই ‘পার করা গেছে’—র সাপোর্ট আমি সুজাতা গুপ্তর কাছেও পেয়েছি। সেও মার্ডারড হয়েছে। আর একটা মিথ্যে কথা।’
রোহিণীর জ্বলজ্বলে উত্তেজিত চোখ থেকে গঙ্গাপ্রসাদ নিজের চোখ সরিয়ে নিলেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেনও। রোহিণীর মনে হল, সে বোধ হয় ঠিক জায়গাতেই ঘা দিয়েছে। এটা আর একটু দেওয়া দরকার।
‘সুভাষ গায়েনকে মার্ডার করার চেষ্টা হয়েছিল? আর সেটা হয় আপনার জালিয়াতি ব্যবসার প্রোপোজাল রিফিউজ করার পরই।’
‘হোয়াট ডু ইউ মীন?’ গঙ্গাপ্রসাদ উঠে দাঁড়ালেন তাঁর ওজনের পক্ষে অবিশ্বাস্য গতিতে। কী ইঙ্গিত করছ তুমি? আমি খুন করার চেষ্টা করেছি? তোমার সাহস সীমা ছাড়িয়ে গেছে দেখছি। আমাকে তুমি খুনি বানাতে চাও?’
