রোহিণী মাথা নাড়ল।
‘তোমাকে একটা সেট কিনে দেব বলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই ওটা পৌঁছে দিয়ে আসবে, অ্যান্টেনাও লাগিয়ে দেবে। কখন লোকে গেলে তোমার সুবিধে হবে, সেটা প্রশান্তবাবুকে বলে দিয়ো।’
চেয়ারে হেলান দিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ ড্রয়ার খুলে রুমাল বার করে মুখ ঘাড় গলা মুছলেন। কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কী যেন খুঁজলেন। একটা লবঙ্গ বেরোল। সেটা মুখে পুরে গলাখাঁকারি দিয়ে অবশেষে রোহিণীর মুখের দিকে তাকালেন।
‘টিভি—র কথা বলার জন্য তোমাকে ডাকিনি।’
রোহিণী সেটা অনেকক্ষণ আগেই অনুমান করে নিয়েছে। গুরুতর কিছু বলার আগে গঙ্গাপ্রসাদ নিজেকে স্টেডি করার জন্য অযথা ব্যতিব্যস্ত হন।
‘শোভু ফোন করেছিল কাল রাতে। আমি তখন খেতে বসেছি। বুঝতে পারলাম না কোথা থেকে করছে, মনে হল কাছাকাছি রয়েছে। কয়েকটা কথা বলল, যা তোমাকে জানানো দরকার।’
রোহিণীর পিঠ শক্ত হয়ে উঠল। বগলের কাছে সিরসির করছে। ঘাড়ে রোঁয়া উঠল। তাহলে শেষ পর্যন্ত—। নাহ, সে ভয় পাচ্ছে না, পাবার মতো কিছুই তো বাকি নেই। এই ক—টা দিন ভয় পেতে পেতে সে ভয় পাওয়াটাতেই বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছে। সে তো এখন চাইছেই, জট পাকানো সত্যি—মিথ্যেগুলো ছড়িয়ে দেবার জন্য শোভনেশ ফিরে আসুক।
গঙ্গাপ্রসাদ স্থির চোখে তাকিয়ে রোহিণীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছেন। কিন্তু রোহিণীরও স্থির সিদ্ধান্ত, কোনোরকম ভাব যেন মুখে ফুটে না ওঠে। মিনিটখানেকের একটা সংঘর্ষ নীরবে ঘটে গেল টেবিলের দু—ধার থেকে। রোহিণী আগ্রহ দেখাল না শোভনেশের বলা কথাগুলো শোনার জন্য। ভ্রূ কুঁচকে উঠল গঙ্গাপ্রসাদের।
‘প্রথমে ভাবলাম কেউ রসিকতা করছে, যখন ‘হ্যালো’ বলতেই শুনলাম, ‘কে গঙ্গা নাকি, আমি শোভু বলছি।’ শুনেই তো পাথর হয়ে গেলাম। গলা দিয়ে স্বর আর বেরোয় না। কোনোক্রমে বললাম, ‘হ্যাঁ’। কিন্তু শোভু কে?’ ‘বলল’, এর মধ্যে ভুলে গেলি? ছ—টা বছর তো মাত্র! আমি জেল থেকে পালিয়েছি গঙ্গা, কাগজে কি সে খবর বেরিয়েছে? আমি মিথ্যে করেই বললাম, ‘কই চোখে পড়েনি তো! শোভু মানে শোভনেশ সেনগুপ্ত কি?’ বলল, ‘এতক্ষণে সেটা বুঝতে পারলি! শোন, আমি তোর সঙ্গে দেখা করতে চাই। কিন্তু পুলিশ নিশ্চয় আমার চেনাজানাদের ওপর নজর রাখবে। বউবাজারে যাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে কোথায় দেখা হতে পারে?’ আমি বললাম, ‘দেখা করার দরকারটা কী?’ ও বলল, ‘অনেক দরকার। আমার ছবিগুলো নিয়ে কথা বলব। প্রচুর জাল ছবি আমি দেখেই গেছিলাম, বাজারে তখনই বেরিয়ে গেছিল। মানুষ হিসাবে সমাজে আমার জায়গা হয়তো হবে অনেক নীচেই, কিন্তু শিল্পী হিসাবে এদেশে আমি প্রথম পাঁচ—সাত জনের মধ্যে তো পড়বই। আমার রেপুটেশন আজ অ্যান আর্টিস্ট ধ্বংস হচ্ছে এইসব জাল ছবির জন্য। এর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। এইজন্যই দেখা করতে চাই। এইজন্যই আমি পালিয়েছি।’ আমি বললাম, ‘তুই কোথায় আছিস বল, আমি গিয়ে দেখা করব।’ ও এড়িয়ে গেল, আমার প্রস্তাব। হঠাৎই বলল, ‘রোহিণী কোথায় আছে জানিস?’ কথাটা শুনেই আমি কীরকম ঘাবড়ে গেলাম।’
গঙ্গাপ্রসাদ থেমে গিয়ে নাটকীয় নীরবতা তৈরি করলেন। টানটান হয়ে উঠল রোহিণীর ঔৎসুক্য। কেন জানি তার মনে হল, গঙ্গাদা তাকে দূরবিন দিয়ে দেখছেন, কী কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কথাগুলো শুনে। তাই সে প্রাণপণে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে পায়ের উপর পা তুলে, ঊরুর উপর শাড়ির পাট ঠিক করতে করতে বলল, ‘হুঁ, তারপর?’
‘কোথায় আছ, সেটা বলব কী বলব না ভাবতে—ভাবতে বলেই ফেললাম, ‘রোহিণী কলকাতাতেই আছে, এক জায়গায় চাকরি করছে।’ শুনেই ওর মুখ থেকে একটা শব্দ বেরোল। অনেকটা যেন থুথু ফেলার মতো। বলল, ‘ঠিকানাটা কী জানিস, একবার ওকে দেখাব।’ মনে হল, থ্রেটনিং টোন যেন গলায় পেলাম। বললাম, ‘ঠিকানা জানি না।’ ও বলল, ‘আর বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব নয়, তোকে আমি আবার ফোন করব।’ এই বলে রেখে দিল।’
‘এবার ফোন করলে বলবেন, ‘রোহিণী তোর সঙ্গে কথা বলার জন্য দেখা করতে চায়।’
গঙ্গাপ্রসাদের চোখে পলকের জন্য বিভ্রান্তি ফুটে উঠেছিল, যা রোহিণীর নজর এড়াল না।
‘তুমি দেখা করবে! কেন? ওর মানসিক অবস্থা এখন কেমন, তা তুমি জান না। আমিও নয়। তোমার সম্পর্কে ওর মনোভাব যা দেখেছিলাম তাতে—।’
‘অর্থাৎ এই মার্ডারের জন্য আমিই দায়ী। আমিই সিটিং দিতে রাজি না হওয়ায় শোভনেশ ক্ষেপে উঠে বীণার কাছে ছুটে যায়। যদি না যেত, তাহলে মার্ডারটাও আর হত না।’
কথাটা বলেই রোহিণী ঠিক করে ফেলল, আর নয়। এবার নখ দাঁত বার করে অন্য মূর্তি ধরতে হবে। গঙ্গাপ্রসাদের মুখে রহস্যময় হাসি ফুটেছে দেখেও সে ঘাবড়াল না।
‘কাল তুমি কার্জন পার্কে বসেছিলে?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু একা নই। উৎপল কি সেটা বলেনি?’
‘বলেছে। সিদ্ধার্থ সিংহিকে অনেক কথাই বলেছিলাম, সব এখন মনে নেই। তবে যা বলেছি, তা ঠিকই। তোমার শরীর শোভুকে পাগল করেছিল। তোমাদের বিয়ে আমার ঘটকালিতেই হয়েছে। আমিই ওকে বুদ্ধিটা দিই, এমনি ন্যুড হতে বললে রাজি হবে না, কিন্তু স্বামীর কাছে আপত্তি করবে না। তুই মেয়েটাকে বিয়ে করে স্বামী হয়ে যা। কিন্তু আমি ভুল বলেছিলাম বা বুঝেছিলাম। এই মার্ডারের পিছনে আমিও তো অনেকটা দায়ী। বিয়েটা না ঘটালে এসব কিছুই হত না।’
