রোহিণী অবাক হল। হৃদয়রঞ্জন কাঁদছেন কি অনুতাপে দগ্ধ হয়ে? এই বুড়ো বয়সেও এত ভালোবাসা?
‘হ্যাঁ যাব’খন দেখতে।’
‘মাসিমা তোমাকে যেতে বলেছেন।’ গৌরীর মা যাবার সময় বলে গেল।
রোহিণী অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। কুন্তী দু—বার কী যেন বলল, সেটা তার মাথায় ঢুকল না। সুজাতা কেন যেতে বলেছেন, তার কারণ বার করার জন্য মাথাটা তার ব্যস্ত।
‘রুনিদি, আপনি কী অত ভাবছেন যে, আমার কথার জবাব দিচ্ছেন না?’
‘ওহঃ…হ্যাঁ, বলো, একটা কথা মনে পড়ে গেল, তাই।’
‘আমি লিখতে চাই।’
‘কোন ভাষায়, ইংরিজিতে?’
‘না না বাংলাতেই। আপনাদের ম্যাগাজিনে আপনি একটু চান্স করে দেবেন? এইটে বলতেই এসেছি।’
‘বেশ তো, খুব ভালো কথা। কী বিষয় নিয়ে লিখবে? আগে কি কোথাও লেখা বেরিয়েছে?’
‘কোথাও না। আমি কখনো লিখিইনি জীবনে। কিন্তু ঠিক করেছি এবার লিখব, ছাপাব, আর সবাইকে দেখাব।’
‘সবাই মানে তো, কত্তা?’
‘হ্যাঁ, পল্টুকে তো দেখাবই। ও ভীষণ জেলাস টাইপের, আমি লিখে ফেমাস হয়ে গেলে হিংসেয় মরে যাবে।’
‘ভালো কথা। তা কী নিয়ে লিখবে?’
‘সেটা আপনি বলে দিন।’
‘ওমমা, আমি বলে দেব, তারপর তুমি লিখবে। তাই কখনো হয়?’
‘হয়। আমি অনেক রকম জিনিস পড়ি, ভাবি, মনেও রাখি। যেমন সিনেমা, রক মিউজিক, স্পোর্টস, গোস্ট স্টোরিজ, ক্রাইম ডিটেকশন, ফিজিক্যাল ফিটনেস, ডেকরেশনস, গার্ডেনিং, আর ধরুন—’
‘ধরেছি। ক্রাইম ডিটেকশন পারবে? তাহলে তোমাকে একটা খুনের গল্প বলব, সেটা সলভ করার চেষ্টা করতে পারো।’
‘সলভ করলে ছাপাবেন?’
‘আমি ছাপাবার মালিক নাকি? তবে তোমার হয়ে সম্পাদককে যে খুবই ধরাধরি করব, এই কথাটা দিতে পারি।’
‘বেশ, বলুন কীরকম খুন? সত্যি তো?’
‘একদম সত্যি। কিন্তু ভাই এখন তো সময় নেই হাতে, একটা লেখা এখুনি শেষ করতে হবে। তুমি বরং এক কাজ করো, যে ম্যাগাজিনটা সেদিন তোমাদের কাছ থেকে এনেছিলাম, সেটায় সিধারথ সিনহা নামে একজনের একটা আর্টিকেল—’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, পড়েছি। কী যেন নামটা, দ্য আর্টিস্টস হু ওয়্যার কনজিউমড….এই ধরনের একটা বিরাট নাম। পড়েছি, পড়েছি। একটা ন্যুড ছবি আছে, যেজন্য পল্টু ওটা কিনেছিল।’
‘কারেক্ট। আগে ওটা পড়ে ফ্যালো। শোভনেশ সেনগুপ্ত নামে একজনের কথা ওতে আছে, সেটা খুঁটিয়ে মন দিয়ে পড়ে তারপর এসো, তখন বলব কী কী ব্যাপার ডিটেক্ট করতে হবে, কেমন?’
কুন্তী ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। সময় কাটাবার জন্য কাজের মতো একটা কাজই শুধু পাওয়া নয়, লেখার সঙ্গে তার নামটাও বেরোবে। তার মানে পরিচিতি আর খ্যাতিও।
‘আপনি এখন ব্যস্ত, তার মানে ডিস্টার্ব করছি। এখন তাহলে আসি। কালকেই আপনাকে বলব কীভাবে, কী কারণে মার্ডার হয়েছে, আর কে করেছে।’ দরজা খোলার জন্য গোলাকার নবটায় হাত রেখে কুন্তী অবশেষে বলেই ফেলল, ‘আপনি বাড়িতে ব্রা পরেন না কেন?’
‘বাইরেও তো অনেক সময় না পরেই বেরোই।’
‘কেন? উইমেনস লিব সাপোর্ট করেন বলে? অবশ্য ব্রা না পরলেও আপনার চলে।’
‘মোটেই না। পুরুষদের মাঝে মাঝে একটু জ্বালাতন করার ইচ্ছে হলে পরি না।’
বলেই রোহিণী জোরে হেসে উঠে তারপর বলল, ‘তোমার আবার পুরুষদের মতো এইসব দিকে নজর কেন?’
‘আমি অত এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না পল্টু বলে, আমি শুনি।’
তার মানে কথা হয়েছে। রোহিণী মনে মনে বলল, সোফিয়া লরেন তো হয়েছি, তারপর কি লোলোব্রিজিদা, মনরো না অ্যানিটা একবার্গ? কিন্তু এদের জেনারেশন মনরো বা একবার্গকে কি দেখেছে? এখন বিগ গার্লসদের যুগ তো আর নেই!
‘শ্রীমান পল্টু যা বলে, শুনে যেয়ো। আর আমি যা বলছি সেটাও শুনে নাও, এখন দৌড়ে গিয়ে ম্যাগাজিনটা পড়তে শুরু করো আর কাল কী পরশু আমাকে বলে যেয়ো ওর মধ্যে থেকে কী কী মিস্ট্রি তুমি খুঁজে পেয়েছ। তারপর তোমাকে কয়েকটা ক্লু দেব। এখন কেটে পড়ো, আমার লেখা শেষ করতে হবে।’
দরজা বন্ধ করে রোহিণী একবার ভাবল, উপরে গিয়ে সুজাতাকে দেখে আসবে কী না। কিন্তু লেখাটা আগে শেষ করে ফেলা দরকার। রাতে গিয়ে দেখে এলেও, মারা তো আর যাচ্ছেন না।
একঘণ্টার মধ্যেই রোহিণী লেখা শেষ করে ফেলল। মীনার সঙ্গে শোভনেশ প্রসঙ্গ নিয়ে সে গভীরে যাবার কোনো চেষ্টাই করল না। টাইপ করা বায়োডাটা থেকে কিছু কিছু খবর তুলে যে মোটামুটি বোঝাবার চেষ্টা করল, এমন শিক্ষিতা মেধাবী, সুরুচিসম্পন্না ও সুরসিকা অভিনেত্রী বাংলায় কখনো জন্মায়নি। লেখাটা ভাঁজ করে ঝুলিতে রাখতে গিয়ে, কী ভেবে সে ভাঁজ খুলে তলার দিকে এক জায়গায় লিখল—বোধ হয় জন্মাবেও না। রোহিণী জানে, প্রশান্তদা কথাটা কেটে দেবেনই।
অফিসে লিফট থেকে বেরোতেই সে কমলের মুখোমুখি হল। রোহিণী জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, ছেলে এখন কেমন আছে? কিন্তু তার আগেই কমল বলল, ‘দু—বার আপনার খোঁজ করেছেন। গিয়ে এখুনি দেখা করুন।’
‘কে গঙ্গাদা?’
‘হ্যাঁ।’
লেখাটা প্রশান্ত হালদারের টেবিলে রেখে দিয়েই রোহিণী কামরা থেকে বেরিয়ে আসার সময় ভাবল, দু—বার খোঁজ করা কেন? শোভনেশ সম্পর্কে কিছু কি জানতে পেরেছেন? গঙ্গাপ্রসাদ প্লাস পাওয়ারের চশমা পরে টেবলে ঝুঁকে টাইপ করা কাগজ পড়ছিলেন। চশমাটা নাকের ডগার কাছে নামানো। ফ্রেমের উপর দিয়ে তিনি তাকিয়ে বললেন, ‘বোসো, এক মিনিট।’
এক মিনিট ফুরোবার আগেই পড়া বন্ধ করে তিনি বললেন, ‘টিভি—র জন্য একটা বিভাগ করব বলেছিলাম মনে আছে তো?’
