‘আমিও বাসি, তবে খুব বেশি নয়।’
‘বেশি নয় মানে! পরচর্চা আবার ডিগ্রি মেপে করা যায় নাকি? করবে যখন, প্রাণ খুলে চুটিয়ে করবে। তোমার কত্তা করে?’
‘করে, তবে শুধু অফিস কলিগদের নিয়েই। আচ্ছা, অচেনা লোকদের সম্পর্কে পরচর্চা করে কি সুখ হয়, বলুন? কালকেই ক্লাব থেকে ফিরে এসে বলল, বাণ্টু ঘোষের বউকে নাকি দেখা গেছে গড়িয়াহাটের এক কাপড়ের দোকানে হাফ প্রাইসে শাড়ি বিক্রি করছে। দু—মাস আগে বিয়ে হয়েছে, সত্তর—আশিটা শাড়ি পেয়েছে। অত শাড়ি দিয়ে কী আর হবে, তাই চুপি চুপি দোকানে গিয়ে কথাবার্তা বলে আদ্দেক দামেই নতুন নতুন শাড়িগুলো সেল করে দিয়েছে। আর সেটা দেখে ফেলেছে বাণ্টু ঘোষের অফিসেরই একজন।’
‘বাহহ, এটা তো ভালো সাবজেক্ট!’
‘কিন্তু বাণ্টু ঘোষকে আমি চোখেই দেখিনি, তার বউকে তো নয়ই। ওরা কীরকম কথাবার্তা বলে, কীভাবে থাকে, স্যালারি কত, পার্কস কীরকম পায়, ওদের টেস্ট কেমন, কানেকশনস কেমন, শ্বশুর কী করে, বউ কোন স্কুলে পড়েছে, সেসব কিছুই জানি না। মজার কথা কী জানেন পল্টুও তা জানে না।’
‘পল্টু কে?’
‘আমার কত্তা, ভালো নাম অলকেন্দু। ম্যাগনানি অ্যান্ড ফ্রেজিয়ারের হরিসাধন দত্ত ক্লাবে এটা গল্প করেছে। আর বাণ্টু ঘোষ থাপার গ্রুপ ছেড়ে সবে জয়েন করেছে ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্ম মিলকমে। কে বাণ্টু, কে হরিসাধন কাউকেই জানি না, কী পরচর্চা করব বলুন তো?’
কুন্তী ঝরঝর করে হেসে উঠল। রোহিণীর মজা লাগল ওর কথা শুনে। বাস্তব থেকে কিছুটা দূরে, একটু আলাদা জগতে অন্যভাবে মানুষ হওয়া, সরল মেয়ে। সচ্ছলতা থেকে সচ্ছলতায় এসে পড়েছে।
‘ঠিকই বলেছ, একদম অপরিচিতদের নিয়ে হয় না। যদি আমার মতো প্রতিবেশীও হত, তাহলেও নয় করতে পারতে।’
‘না না রোহিণীদি, আপনাকে—’
‘রোহিণী নয় রুনি।’
‘হ্যাঁ, রুনিদি আপনাকে নিয়ে আমরা একটুও চর্চা করি না। সত্যি বলছি, মা কালীর দিব্যি!’
মা কালী তাহলে মুখ থেকে বেরিয়েছে! কুন্তী নামটা মহাভারত থেকে, সিঁথেয় সিঁদুরও দিতে হয়। নির্ঘাত মা বা ঠাকুমা কিংবা এখানে যার ফ্ল্যাটে রয়েছে সেই বিধবা মাসিমা রীতিনীতি মানা সম্পর্কে একটু জবরদস্ত প্রাচীনা।
‘ঠিক বলছ তো? আমাকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না?’ রোহিণী হাসি চেপে বলল। ‘সোফিয়া লোরেনের মতো হিপ সুইং করে’ বলতে পারো যখন, আর কিছুও যে বল না, এটা কী বিশ্বাস করতে হবে?
বেল বেজে উঠল। গৌরীর মা।
‘কী গো, এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি তো ঠিক করেই ফেলেছিলাম, লুচি বেগুনভাজা শেষ পর্যন্ত বোধ হয় আমার পেটেই যাবে।’
‘খাবে তো খাও না। বাসি নুচি খেতে যা লাগে না দিদি!’
গৌরীর মা চটপট কাগজ খুলে এগিয়ে দিল, কুন্তী উৎসুক চোখে তাকাল। রোহিণী ইতস্তত করে ‘আচ্ছা, তাহলে একটা—’ বলেই একটা লুচি আধখানা বেগুনভাজা মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে চোখ বুজে বলল, ‘গ্রে এ এ ট!’
‘খুব দারুণ, না?’ কুন্তীর ঠোঁট সামান্য খুলে গেল। জুলজুল করে তাকিয়ে।
‘নাও না, তুমিও একটা নুচি খেয়ে দ্যাকো।’
কুন্তী চট করে একটা শক্ত মড়মড়ে লুচি তুলে নিয়েই কামড় বসাল।
‘বেগুনভাজা নিলে না!’ গৌরীর মা ব্যস্ত হল।
‘না, শুধুই খাব। সত্যি রুনিদি…উমমম…মনে হচ্ছে কার্ল লিউইসের চারটে ওলিম্পিক গোল্ড মেডেল চিবিয়ে খাচ্ছি…সিলভেস্টার স্ট্যালোনের হিরোইন মনে হচ্ছে, মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে গান গাইছি, আর একটা খাব? কুন্তী প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার মতো ভঙ্গিতে গৌরীর মাকে বলল।
‘খাও না। একটা কেন, অত রয়েছে, দুটো নাও।’
কুন্তী দুটো লুচি তুলে নিয়ে রোহিণীকে বলল, ‘জানেন, পল্টু আমায় তেল, ঘি, বাটার, সুগারের জিনিস একদম খেতে দেয় না, পার্টিতে সবসময় নজর রাখে আমার প্লেটের দিকে। খালি ক্যালোরি আর ক্যালোরি শুনে মাথা খারাপ হবার মতো অবস্থা। কারণ, মোটা হয়ে যাব। আচ্ছা আমার এই ফড়িংয়ের মতো চেহারা ছেলেদের ভালো লাগবে? আপনার মতো ফিগার না হলে—।’ কুন্তী থেমে গেল আচমকা। রোহিণী ওর চোখে ক্ষোভ আর হতাশা দেখতে পাচ্ছে, গৌরীর মা—ও বোধ হয়। বিদ্রোহীর মতোই কুন্তী কচমচ করে লুচি দুটো খেয়ে নিজেই গ্লাস নিয়ে বেসিনের কল থেকে ঢকঢক করে জল খেল।
রোহিণী ওর কষ্টটা বুঝেছে। মেয়েটা রোগাই। একটু ভরন্ত হলে খারাপ দেখাবে না। ওকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই সে বলল, ‘তোমার ফিগার তো খারাপ নয়, স্লিম, ছিপছিপে বেতের মতো—’
‘থাক, আপনাকে আর মিথ্যে কথা বলতে হবে না। আমি যে কী, সেটা আমি ভালোই জানি। পল্টু যেসব ম্যাগ কেনে, তাতে শুধু সেক্সি মেয়েদের ছবি। কেন? আমার ফিগার যদি অ্যাট্রাকটিভই হবে, তাহলে চুরি করে আপনার—’ কুন্তী আবার থেমে গেল। রোহিণী গম্ভীর হল। হঠাৎ তার মনে পড়ল, মীনা তার দিদিকে হিংসে করত এই শরীরের জন্যই।
‘গৌরীর মা, আমরা আর খাব না, এবার তুমি ওগুলো নিয়ে যাও।’ রোহিণী কথাগুলো বলল ওকে এখান থেকে সরিয়ে দেবার জন্য। গৌরীর মা খুবই চালাক—চতুর এবং গোপ্পে। কুন্তীর কথাগুলো এই বাড়ির অন্যান্য ঝিয়েদের মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়ুক এটা রোহিণী চায় না।
‘দিদি, তুমি একবার ওপরে গিয়ে মাসিমাকে দেখে এসো। কাল রাতে পড়ে গিয়ে চোখের যা অবস্থা হয়েছে না! মেসোমশাই তো সকাল থেকে বসে বসে কাঁদছে।’
