আহহ! রোহিণী চেয়ারের পিছনে মাথাটা হেলিয়ে সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে রইল। এই এক সমস্যা। এই সময় রাজেন যদি থাকত, তা হলে নিশ্চয় বলত—গো অ্যাহেড, আমি তো আছি। থাকা খাওয়ার ব্যাপারে দায়িত্বটা আমার। তুমি গঙ্গাদাকে যা প্রশ্ন করার, করো।
রোহিণী মাথা নাড়ল। রাজেন না ফেরা পর্যন্ত তাকে চুপচাপ থেকে চাকরি করে যেতে হবে। অবশ্য তার মধ্যে যদি—ভাবনাটা থমকে গেল রোহিণীর। সে নিজের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে লাগল, ভাবনাটাকে আর একটু টেনে নিয়ে গিয়ে এইরকম একটা আশা করবে কিনা—তার মধ্যে যদি শোভনেশ এসে পড়ে।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে নিজেকে বলল, আসুক। ও ছাড়া কার কাছ থেকেই বা সত্যি কথাটা জানব?
.
সকাল থেকে রোহিণী টেবিলে। মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎকারটা লিখে ফেলে আজই প্রশান্তদাকে দিতে হবে। নোটবইটা মাঝে মাঝে দেখতে হচ্ছে মীনার কথাবার্তা উদ্ধৃত করার জন্য। দেখার পর চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভেবে আবার ঝুঁকে পড়ছে লেখার জন্য। এইভাবেই চলছে গত দেড় ঘণ্টা ধরে। টেবিলে গ্লাসের দুধে সর পড়ে গেছে, টোস্টগুলো মিইয়ে ভিজে পেস্টবোর্ডের মতো। লিখতে লিখতে বাঁহাতে মুখে পুরে দেওয়া দুটো সিদ্ধ ডিম ছাড়া আর কিছু তার পেটে যায়নি। গৌরীর মা লুচি—বেগুনভাজা কাগজে মুড়ে রেখে কাজ সারতে গেছে উপরে, সুজাতাদের ফ্ল্যাটে।
চেয়ার থেকে উঠে রোহিণী পায়চারি শুরু করল। মীনার সঙ্গে শোভনেশের ব্যাপারটা তার লেখায় কতটা রাখবে, ঠিক বুঝতে পারছে না। ছোটোবেলায় একজন আর্টিস্টের সংস্পর্শে এসে মীনার মধ্যে একটা টান জেগেছিল শিল্প সম্পর্কে, একটা শিল্পবোধ গড়ে উঠেছিল। লেখাটাতে সে মীনাকে ওই দিক থেকে দেখিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা হল, ভালোবেসে প্রেম নিবেদন করে শোভনেশের কাছে মোলায়েম প্রত্যাখান পাওয়া, আজও তার স্মৃতি ধরে রাখা, এইসব ডেলিকেট জিনিস তার লেখার মধ্যে রাখলে লেখাটা খুলবে ঠিকই, কিন্তু মীনা চ্যাটার্জির পক্ষে অস্বস্তির এমনকী হয়তো রাগেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভেরি ভেরি প্রাইভেট অ্যাফেয়ার এগুলো। তা ছাড়া কমার্শিয়ালও চোট পেতে পারে। মীনার যা ইমেজ—দাগ না পড়া, টোল না খাওয়া হৃদয়, রাজপুত্রের জন্য প্রতীক্ষারতা রাজকন্যে, অনাঘ্রাতা ফুলের মতো শরীর। এইগুলোই পাবলিসিটিতে প্রচ্ছন্নভাবে কাজে লাগানো হয়। ‘নির্মল, কোমল ত্বকের জন্য’ বলে মীনা সাবানের বিজ্ঞাপনে যে হাসিটা দেয়, তা নাকি দেবকন্যারা ছাড়া আর কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। এহেন দেবকন্যা একদা কাউকে হৃদয় দিয়ে ফেলেছিল, এখনও সেই হৃদয় প্রত্যাহার করেনি, তা জানলে ফ্যানেরা আঘাত পাবে, তাদের সংখ্যা কমে যাবে। প্রোডিউসাররা এসবও নাকি কাউন্ট করে নায়িকা নির্বাচনের সময়।
রোহিণী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসল। ঘাড় বেঁকিয়ে, মুখটা নামিয়ে, পাশে ফিরিয়ে পাঁচ—ছ রকম ভাবে হেসে শেষকালে মা—কালীর মতো জিভ বার করে মনে মনে বলল, ‘এইটেই হচ্ছে আসল হাসি।’
টেবিলে এসে কাগজগুলো তুলে সে কত শব্দ লেখা হয়েছে, তার একটা হিসাব কষল। এক হাজার শব্দ তো বটেই এগারোশোও হয়ে যেতে পারে। প্রশান্তদা বলেছেন, বারো—তেরোশোর বেশি কিছুতেই নয়। সঙ্গে তিনটে ছবিও যাবে।
দুধের গ্লাসটা তুলে এক চুমুকে শেষ করল। সাদা গোঁফটা কেমন তৈরি হল দেখার জন্য সে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। একটা হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। ছোটোবেলায় সে আর দিদি কম্পিটিশন করত দুধের গোঁফ বানাবার। কার গোঁফ চীনেম্যানের মতো হয়েছে, তার বিচার করতে হত বাবাকে। একবার বাবা বললেন, ‘সুনুরটা আজ ঠিক মাও সে তুংয়ের মতো’, অমনি দিদি দু—কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাংরা নাচ শুরু করে বলল, ‘আমি আজ মাও! আমি আজ মাও!’ বাবা তারপর সান্ত্বনা দেবার জন্য বললেন, ‘রুনিরটা একদম চিয়াং কাইশেক।’ ব্যস, শুনেই দিদির মুখ শুকিয়ে গেল। রাগে দুমদুম করে পা ফেলে বেরিয়ে সদরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা গিয়ে ওকে বোঝালেন, ‘আরে বোকা মেয়ে, মাওয়ের কাছে তো যুদ্ধে চিয়াং হেরে গেছে, তাহলে রাগ করছিস কেন?’
রোহিণী জিভ দিয়ে ঠোঁটের উপর থেকে দুধের রেখা সবে চাটতে শুরু করেছে, তখনই বেল বেজে উঠল। গৌরীর মা নিশ্চয়, লুচি—বেগুনভাজা নিতে এসেছে। টোস্ট আর খেতে ইচ্ছে করছে না, ওগুলোও ওকে দিয়ে দেবে ঠিক করে সে দরজা খুলতে গেল।
‘আরে, কী ব্যাপার, এসো এসো।’ রোহিণী অবিশ্বাস্য বেগে প্রথম কণ্ঠস্বরকে পিছনে ঠেলে দিয়ে তার দু—নম্বরি স্বর বার করে আনল।
‘আপনাকে ডিসটার্ব করলাম না তো?’ কুন্তী একগাল হেসে বলল, ভিতরে না ঢুকে।
‘একটুও না, একটুও না। বরং এখনই ভীষণভাবে চাইছিলাম খুব মিষ্টি মুখের কোনো মেয়ে যদি গল্প করতে আসে, তাহলে খুব ভালো হয়। ভেতরে এসো।’
পুলকে উজ্জ্বল চোখ দুটি বার চারেক পিটপিট করে কুন্তী ভিতরে ঢুকল।
‘দ্যাখো, অত সাহেবি ফর্ম্যালিটি আমার সঙ্গে করতে হবে না। ডিস্টার্বড হলাম কী না হলাম, তাতে তোমার কী আসে যায় বাপু?’ রোহিণী স্নেহভরে নরম ধমক দিল। ‘দরজা খোলা পেলেই ঢুকে পড়বে। কাজ—টাজের কথা যদি থাকে বলে ফেলবে, তারপর যদি হাতে তোমার সময় থাকে, পরচর্চা শুরু করে দেবে। এটা আমি ভীষণ ভালোবাসি, তুমি?’
