‘কিন্তু সেই আওয়াজ শোনার সৌভাগ্য তো আমার কপালে নেই।’ রোহিণী মুখটা বিষণ্ণতায় ভরিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়ানো নন্দার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ডুপ্লিকেট চাবিটা এনে দাও তো নন্দা।’
‘ওহ হো, তাই তো আপনার একটা চাবি তো আমাদের কাছেই রাখা আছে।’ তুষার দত্তকে মনমরা দেখাল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল হয়ে উঠে বলল, ‘দেখুন, আমারই বুদ্ধিতে চাবিটা সেদিন করিয়েছিলেন বলেই আজ দরজা ভাঙার দরকার হল না।’
‘নিশ্চয়। আমি তো বরাবরই মনে করি, আপনার মতো বুদ্ধি, আপনার মতো গায়ের জোর এই কম্বিনেশনের লোক সাদা বাঘের মতোই খুব রেয়ার, পাওয়াই শক্ত।’ বলতে বলতে রোহিণী চাবিটা নন্দার হাত থেকে নিয়ে দরজায় লক—এ ঢোকাল। এখন তুষারের মুখটা কেমন দেখাচ্ছে, তা সে জানে। পাল্লা খুলে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে করতে সে বলল, ‘আচ্ছা, তুষারবাবু, ধন্যবাদ।’
দরজা বন্ধ করে রোহিণীর প্রথমেই সুজাতার মুখটা মনে পড়ল। চোখে ওইরকম কালসিটে টেবলের কোণা লেগে হয় না, মোটা ভারী ধরনের কিছুতে ধাক্কা লাগলে হয়। তা হলে কী! রোহিণী অবাক হয়ে ভাবল, হৃদয়রঞ্জনই কী ওই কালসিটের উদ্ভাবক? কিন্তু কেন? শোভনেশের সঙ্গে সুজাতার ব্যাপার তো কোন কালে চুকে বুকে গেছে! এত বছর পরেও কী ঈর্ষা বেঁচে থাকে বা একজনের স্মৃতি কী কেউ লালন করে বাঁচিয়ে রাখে!
রোহিণী গা ধুয়ে, সুভাষ গায়েনের ভাগ্নির বিয়ের খাবার থেকে মাছগুলো আর দুটো সন্দেশ খেয়ে, লুচি—বেগুনভাজা ঢাকা দিয়ে রেখে দিল গৌরীর মা—র জন্য। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে জানলাগুলো খুলে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে সে তাকিয়ে রইল। আনমনা হয়ে সে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত তার কাজকর্মের ধারা মনে করার চেষ্টা করল। মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যাচ্ছে, একটার সঙ্গে আর একটা জড়িয়ে গেছে, পরেরটার জায়গায় আগেরটা এসে পড়েছে। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে সে টেবল—ল্যাম্প জ্বালিয়ে টেবিলে বসল কাগজ আর কলম নিয়ে।
সকাল দশটায় মীনা চ্যাটার্জি। কাগজের উপরে কথাটা লিখে তলায় লাইন টানল। রোহিণী মনে করতে চেষ্টা করল, তাদের কথাবার্তার মধ্যে তাৎপর্যময় বক্তব্য বা ঘটনা কোনটা যা শোভনেশের সম্পর্কে অজানা কিছু উদঘাটন করেছে? কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে সে ভাবতে শুরু করল।
মীনা বলেছে, স্বামী আর প্রেমিকদের যে ঠকায়, তাকে অর্থাৎ দিদিকে সে ঘৃণা করে। তাকে সে ক্ষমা করতে রাজি নয়। মানুষের মন নিয়ে যারা ঠকানোর কারবার করে, তারাই আসল খুনি। মীনার কোনো দুঃখ নেই বীণা খুন হওয়ায়। তার মতে ছবির ব্যাপারে শোভনেশ ছিল পরিশ্রমী আর সিনসিয়ার।
ভালো কথা। কিন্তু রোজ রাতে শোভনেশের আঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা। মীনা বলেছে, তার দিদির চমৎকার বডি ছিল। দিদিকে হিংসে করত। এখনও বোধ হয় করে। তাই রোজ রাতে বীণাকে নিয়ে আঁকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে—বোধ হয় সে—শোভনেশকেই অভিশাপ দেয়। কেন ‘অভিশাপ’ শব্দটা হঠাৎ তার মনে এল? রোহিণী যুক্তি খুঁজতে খুঁজতে ভাবল, হয়তো তাকে মডেল না করে দিদিকে পছন্দ করেছিল বলেই মীনা নিজেকে বঞ্চিতা মনে করে।
হতে পারে। মীনা তো তাকে বললই, আপনার স্কিন, ফ্লেশ, ভলিউম, স্ট্রাকচার, প্রোপোরশন দেখলে শোভনকাকা ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কিন্তু মীনার জন্য ঝাঁপায়নি। শোভনেশ বিশেষ গড়নের শরীর পছন্দ করত, যে শরীর ওর নেই। মীনার হিংসা তার বারো বছর বয়স থেকে শুরু হয়, আর কুড়ি বছর ধরে সেটাকে ঘাড়ে নিয়ে আজও সে চলেছে। হয়তো মনে মনে বলে বীণার বদলে আমাকে যদি বাছতেন, তা হলে আজ এই পরিণতি হত না। হিংসা নয়, রোহিণী মাথা নাড়ল, করুণা। মীনা বোধ হয় করুণা দেখাতেই ছবিটার দিকে তাকায়।
মীনা নতুন কী জানাতে পারল শোভনেশ সম্পর্কে। রোহিণী কলমটা ঠুকতে লাগল কাগজের উপর । কালো কালো বিন্দু ফুটে উঠেছে সাদা কাগজে। মীনা বলেছে, সে তার লিমিটেশনস জানে, বুঝতে পারে। শোভনেশকে ভালোবাসা জানিয়ে মোলায়েমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। বলার সময় তার চোখে জল দেখেছিল সে।
শোভনেশকে যতটা নিষ্ঠুর উন্মাদ বা নারীলোভী মনে হয়, মীনার এই চোখের জল থেকেই রোহিণী বুঝেছিল, ততটা নয় সে। ওটা অভিনেত্রীর অভিনয় ছিল না। মীনা এখনও মনে মনে পুজো করে শোভনেশকে।
কিন্তু বীণার খুনের কারণ মীনা বলতে পারেনি। পরিষ্কারই বলল,’কোনো কারণ বার করতে পারেনি।’ সত্যি কথা বলল কি?
কনফিউসড, বিভ্রান্তি, এলোমেলো, গুবলেট, আর কী কী হওয়া সম্ভব? রোহিণী কলমটা এবার কপালে ঠুকতে লাগল। পর পর খাতায় লিখে কোনো কিনারা পাওয়া যাবে না। ছবি জাল করে বিক্রির মতলবটা প্রথম গঙ্গাদার মাথাতেই খেলেছিল! একথা কী বিশ্বাস করা যায়? কিন্তু সুভাষ গায়েন আজ সত্যি কথা বলার মতো মেজাজেই ছিল। ভাগনির বিয়েতে আচমকা রোহিণীকে দেখে লোকটা যেন হঠাৎই স্নেহপরায়ণ হয়ে হৃদয়ের উপর জমা শ্যাওলা পরিষ্কার করতে শুরু করে দেয়।
মীনা চ্যাটার্জির কাছে কিছু কি আর জানার আছে? আপাতত নয়। গঙ্গাপ্রসাদ? অবশ্যই আরও অনেক কিছু।
কিন্তু কীভাবে সে কথা শুরু করবে? গঙ্গাদা নিশ্চয় চটবেন তার প্রশ্নে। চটলে তার চাকরি ‘নট’ করে দিতে পারেন, সঙ্গে সঙ্গে এই ফ্ল্যাটও তাকে ছাড়তে হবে। অবশ্য চাকরি সে জোগাড় করে নিতে পারবে। নিজের সম্পর্কে এই আস্থাটা তার আছে। কোনো পত্রিকায় বা বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে বা প্রাইভেট ফার্মে। কিন্তু বলামাত্রই তো আর চাকরিটা তার ঝুলিতে কেউ ভরে দেবে না, কয়েকটা দিন তো সময় চাই। ততদিন সে থাকবে কোথায়? হাতে তো জমানো টাকা সামান্যই।
