‘দেখি, দিন।’
রোহিণীর কাঁধ থেকে ঝোলাটা টেনে খুলে নিয়ে সুভাষ গায়েন তালের মতো একটা কাগজের পুঁটলি তার মধ্যে সাবধানে বসিয়ে দিল।
‘শীতকাল, মনে হয় না নষ্ট হবে। কাল দুপুরেও ভাতের সঙ্গে—অবশ্য আজ রাতেই যদি সব শেষ করে না দেন।’
‘আমাকে দেখে কি খুব খাইয়ে মনে হচ্ছে?’
‘বীণা খুব খেতে ভালোবাসত। চলুন, এগিয়ে দিয়ে আসি।’
বীণা ভালোবাসত বলে সেও খেতে ভালোবাসবে, এমন ধারণা লোকটার হল কী করে? হঠাৎ রোহিণীর মনে পড়ল সিদ্ধার্থকে বলা গঙ্গাদার কথা : বীণা আর তার শরীরের ধাঁচ নাকি একইরকম।
মিনিবাসে ওঠার আগে সুভাষ গায়েন বলল, ‘আরও অনেক কথা ছিল, পরে একদিন বলব’খন।’
বাস থেকে নেমে হেঁটে বাড়ি পৌঁছে রোহিণী ফ্ল্যাটের দরজা খোলার সময় উপরের সিঁড়ির দিকে তাকাল। সুজাতা বা হৃদয়রঞ্জন যে দাঁড়িয়ে থাকবেন না সিঁড়িতে, তা জানে। তবু এইরকমই হয় মনের মধ্যে। ওঁদের সঙ্গে পরিচয়ের সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হবার আগেই ভেঙে গেল।
পুঁটলি খুলে কলাপাতা সরিয়েই রোহিণী ‘ওরে বাবা’ বলে উঠল। দু—জনে দু—বেলা খাওয়া যায় এত জিনিস! লুচিতে বেগুন ভাজাটা রেখে, পাট করে মুখে সবে দিয়েছে, তখনই বেল বেজে উঠল। রোহিণীর বুকের মধ্যে কাঁপন লাগল।
আই হোল দিয়ে তাকিয়ে দেখল হৃদয়রঞ্জন শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে।
.
‘কী ব্যাপার! এত রাতে আপনি?’
রোহিণী সারাদিনে যত সঞ্চয় করেছে তা একসঙ্গে উদগিরণ করল গলা দিয়ে। এখন সে শোভনেশকে দেখলেও ততটা আশ্চর্য হত না, যতটা হল, যথেষ্ট আলাপ না হওয়া বার্ধক্যে পৌঁছানো তার এই প্রতিবেশীটিকে দেখে।
‘আপনার কাছে রক্ত বন্ধ হওয়ার কোনো ওষুধ আছে?’ ক্ষীণ মৃদুস্বরে কথাটা বলে হৃদয়রঞ্জন সকাতর নিবেদন করার মতো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেন।
‘রক্ত! কেন? কার?’ রোহিণীর বোধ—বুদ্ধি গুলিয়ে গেছে রক্ত শব্দটা শুনে। ‘আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।’
‘আমার নয়। ফিস ফিস স্বরে হৃদয়রঞ্জন ভুল শুধরে দিলেন, ‘সুজাতা পড়ে গেছে মাথা ঘুরে। ডাইনিং টেবলের কোণটা গালে লেগেছে । টিংচার কী বেঞ্জিন কী মলম—টলম যদি থাকে?’
রোহিণী অসহায় বোধ করল। কোনোটাই নেই তার কাছে। ছোটোখাটো দুর্ঘটনার জন্য এইসব ওষুধপত্তর হাতের কাছে রাখা যে দরকার, এটা সে ছোটোবেলাতেই বাবার কাছে শুনে রেখেছে। কাটা, মচকানো বা সর্দি—জ্বরের মতো ব্যাপারের জন্য কিছু ওষুধ কিনে রাখার কথা ভেবেও কিনি কিনি করে আর কেনা হয়নি।
‘আমার কাছে তো কিছুই নেই, অন্য কারোর কাছে যদি—দাঁড়ান দাঁড়ান তুষারবাবুর কাছে বোধ হয়—’
কথা শেষ না করেই রোহিণী এক এক লাফে দুটো করে সিঁড়ি টপকে উপরে এসে তুষার দত্তর ফ্ল্যাটের বেল বাজাল। সেকেন্ড দশেকের মধ্যেই দরজা খুলে দাঁড়ালেন স্বয়ং তুষার দত্তই। তিনিও চমকিত এবং বিগলিতও।
‘তুষারবাবু, আপনার কাছে ধাক্কা লেগে কেটে যাওয়ার কোনো ওষুধ আছে?’
‘আপনার? কোথায় কোথায়?….কোথায় ধাক্কা লাগল, কোমরে?’
তুষার দত্তর বাড়ানো হাত থেকে রেহাই পেতে রোহিণী দু—হাত পিছোল।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ আছে। অ্যাই নন্দা, ফার্স্ট এড বাক্সটা দে, চটপট।…চলুন।’
সেই মুশকিলটা আবার ঘটেছে, যেটা ঘটেছিল শ্রীনিবাসনদের কপালে। হৃদয়রঞ্জন ব্যস্ততার জন্য সঙ্গে চাবি নিয়ে বেরোননি। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই তালা পড়ে গেছে। এখন ভিতর থেকে না খুলে দিলে দরজা খুলবে না। ভিতরে সুজাতা রয়েছে, কিন্তু তিনি তো গুরুতর আহত। রোহিণী ভাবল, হেঁটে এসে দরজা খুলে দিতে পারবেন কী? তবু সে আর একবার বেল বাজাল। দরজায় কান ঠেকিয়ে শোনার চেষ্টা করল সাড়াশব্দ পাওয়া যায় কিনা!
একেবারেই চুপচাপ। ভিতরে কোনো প্রাণী আছে বলে মনেই হচ্ছে না। হৃদয়রঞ্জন অসহায়ভাবে আই হোলের কাচের দিকে তাকিয়ে। তুষার দত্ত আর নন্দা তাকিয়ে রোহিণীর দিকে। নিজেদের দরজায় আরতিও দাঁড়িয়ে কৌতূহল নিয়ে। তুষার দত্ত আরও দু—তিনবার বেল বাজিয়ে বলল, ‘ভেঙে ফেলব দরজাটা?’
‘না না, আর একটু অপেক্ষা করা যাক। বুড়ো মানুষ, ইনজুরি নিয়ে দরজার কাছে হেঁটে আসবেন—’ রোহিণীর কথা শেষ হবার আগেই লক—এর হাতল ঘোরাবার শব্দ হল। ধীরে ধীরে দরজার পাল্লাটা খুলে গেল। সুজাতা দাঁড়িয়ে।
একটা ভিজে ন্যাকড়া বাম গালে চেপে ধরে রয়েছে। বাঁ চোখে কালসিটে। ফুলে উঠে চোখ প্রায় বন্ধ। অন্য চোখে প্রায় বিরক্তি। একটু শ্রান্ত স্বরে সুজাতা বললেন, ‘এত রাতে লোকজনকে বিরক্ত করার কী দরকার ছিল, ভেতরে এসো।’
হৃদয়রঞ্জন মাথা নীচু করে ভিতরে যেতেই সুজাতা বললেন, ‘উনি খুব নার্ভাস টাইপের, আমার তেমন কিছু হয়নি। বরফ লাগালেই ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা—।’
দরজা বন্ধ হতেই তুষার দত্ত হতাশ চোখে তাকাল রোহিণীর দিকে। আর তখনই রোহিণী বলে উঠল, ‘সর্বনাশ হয়েছে।’ সে প্রায় হুমড়ি খেতে খেতে নীচে নেমে এসে দেখল, সত্যিই তাই হয়েছে। তার নিজের ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। উপরে উঠে আসার ব্যস্ততায় ভুলেই গেছে চাবিটা সঙ্গে রাখতে।
তুষার দত্তও তার সঙ্গে সঙ্গে নেমে এসেছে তিন তলায়। রোহিণীর সমস্যাটা বুঝতে পেরেই তার মুখ থেকে হতাশা কেটে গিয়ে ঝলমল করে উঠল তৃপ্তি।
‘আর ‘না’ বলতে পারবেন না। এবার দরজাটা ভাঙতেই হবে। বেশি নয়, একটা ছোট্ট পুশ করব কাঁধ দিয়ে, আর মড়াত করে একটা আওয়াজ হবে।’
