‘চলুন বাইরে চেয়ারে ততক্ষণ বসি।’
বাইরে এসে বসার সঙ্গে সঙ্গেই রোহিণী বলল, মিথ্যা কথাটা বললেন কেন? সকালে তো ঘুণাক্ষরেও বলেননি আজ আপনার ভাগনির বিয়ে, নেমন্তন্ন করা তো দূরের কথা!’
‘একটু আধটু রং চড়িয়ে বলা আমার অভ্যেস। এতে তো কারোর ক্ষতি হচ্ছে না।’
‘তাহলে এতদিনে যা যা বলেছেন, তাতেও রংটং চড়িয়েছেন?’
‘যেমন?’
‘গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জির সঙ্গে মিলে আপনি শোভনেশের ছবি নকল করার ব্যবসা খুলেছিলেন। আমার কাছে এই কথাটা চেপে গেছেন আর আপনাকে খুনের চেষ্টার কথাটা বলেছেন রঙ চড়িয়ে।’
সুভাষ গায়েনের মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় ফুটে ওঠার বদলে থমথম করে উঠল রাগ। সেটা রোহিণীর জন্য নয়।
‘কিছু কিছু মিথ্যে কথা আপনাকে বলেছি ঠিকই, তবে সবটাই তা নয়। শোভনেশের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলি, বীণার বিশেষ বিশেষ পোজের ছবি আঁকার জন্য। টাকার জন্য উনি রাজি হন। এ কথার মধ্যে কোনো ভেজাল বা রংটং নেই। ওইরকম একটা ছবি গঙ্গাপ্রসাদ দেখে ফেলে শোভনেশের বাড়িতে। দেখার পর লোকটার মনে কী ঘটল কে জানে, সে শোভনেশকে সরিয়ে তার বাড়িতে মোমিনপুরে, তারপর সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি বাসুদেবপুরে নিয়ে গিয়ে রাখে। আমি খোঁজ করে করে বাসুদেবপুরে গিয়ে হাজির হলুম। গিয়ে কী দেখলুম জানেন?’
‘কী করে জানব?’ রোহিণী মনে মনে মিলিয়ে নিচ্ছে সিদ্ধার্থর কাছ থেকে আজ বিকেলেই শোনা কথাগুলোকে।
‘শোভনেশ ছবি আঁকছে, হ্যাঁ বীণারই ছবি, তবে ন্যুড নয়। গলা টিপে ধরে, খাড়ার কোপ মেরে, গায়ে আগুন লাগিয়ে, জলে মুখ চেপে ধরে, বন্দুক দিয়ে গুলি করে—যত রকমে সম্ভব, তত রকমে একটা উলঙ্গ মেয়েকে খুন করছে একটা লোক—এই হচ্ছে শোভনেশের ছবির বিষয়, লাল আর কালো রঙে আঁকা বীভৎস সব ছবি!’
‘ওখানে আপনি ওকে গ্রাম আর প্রকৃতি নিয়ে ছবি আঁকতে দেখেননি?’
‘না। ঘরে শুধু ওই ছবিগুলোই দেখেছি।’
‘আপনাকে কিছু বলল?’
‘আমি ওকে একসময় ভয় দেখিয়েছিলুম, যেরকম ছবি ওকে আঁকতে বলেছি, যদি সেইরকম ছবি এঁকে না দেয়, তাহলে কোর্টে যাব, আমার বউয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত এই অভিযোগ নিয়ে। তাইতে উনি ভয় পান আর আমার চাহিদা মতো ছবি আঁকেন। বাসদেবপুরে আমাকে দেখে তেড়ে এলেন। এই মারেন তো সেই মারেন। বললেন, আর আমাকে দিয়ে নোংরা ছবি আঁকাতে পারবে না। আমাকে তোমরা নষ্ট করেছ, আমিও তোমাদের খুন করব। ওকে দেখে মনে হল মাথার ঠিক নেই, কেমন যেন উন্মাদের মতো হাবভাব। আমি চলে এলাম।’
‘এসে তারপর জাল করার কারবার শুরু করলেন?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি একা নই। তার আগে আপনার গঙ্গাদা একদিন এসে হাজির আমার গোয়াবাগানের বাড়িতে। উনি শোভনেশের কাছ থেকে সব শুনেছিলেন আমার সম্পর্কে। এই বদবুদ্ধিটা ওনার মাথাতেই প্রথম খেলে। উনিই আমাকে প্রস্তাব দেন, এই সব ছবির যখন এত ভালো বাজার, এত ভালো দাম, তাহলে দু—জনে মিলে শুরু করা যাক। আমি রাজি হইনি। কেন হব? ব্যবসাটা তো আমি একাই শুরু করতে পারি, আবার পার্টনার নোব কেন? গঙ্গাপ্রসাদকে ফিরিয়ে দিয়ে আমি একাই নেমে পড়লাম।’
‘গঙ্গাদা নিশ্চয় তা জানতে পারেন।’
‘হ্যাঁ পারে। তার প্রমাণ আমাকে খুনের চেষ্টা। কোনো সন্দেহ নেই, গঙ্গাপ্রসাদই আমাকে মারতে চেয়েছিল। আমি যে বাসুদেবপুর গিয়েছিলুম,এটা জানতে পেরে উনি ক্রমাগতই বন্ধুকে ওসকাতেন আমার বিরুদ্ধে পুলিশে নালিশ করতে। কিন্তু শোভনেশ তাতে রাজি হয়নি। কেননা তাহলে বীণাকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হত। এরপর ওই প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে গঙ্গাপ্রসাদের আসা আর আমার রাজি না হওয়া… থাক এখন এসব কথা, নিন ধরুন।’
একটি মেয়ে মাটির প্লেটে কলাপাতার উপর কয়েকটি রুই মাছের টুকরো, চারটি সন্দেশ, মাটির গ্লাসে দই নিয়ে রোহিণীর সামনে দাঁড়িয়ে। দেখেই আঁতকে উঠল সে।
‘আপনার যা স্বাস্থ্য, তাতে এগুলো ব্রেকফাস্ট হওয়া উচিত।’
‘হ্যাঁ উচিত, তবে এখন তো ব্রেকফাস্টের সময় নয়। তাই একটা সন্দেশ, কেমন?’
‘তাহলে কাল সকালেই খাবেন। ওরে এগুলো কলাপাতায় মুড়ে বেঁধে দে তো।’
‘তার মানে! ছাঁদা?’
‘উপহার। ছাঁদা কে বলল?’ সুভাষ গায়েন মৃদু ধমক দিল। ‘আপনার ওই ঝোলার মধ্যে দিব্যি চলে যাবে, শুধু দেখবেন বাসে, কেউ চাপটাপ না দেয়।’
‘কিন্তু এভাবে, না না।’
‘নিয়ে যান, এতে লজ্জার কিছু নেই। মীনাও বহু পার্টিতে না খেয়ে খাবারটা বাড়িতে নিয়ে আসে। আমিও তাতে ভাগ বসাই। আপনার বাড়িতে আরও তো লোক আছে?’
‘না, আমি একাই থাকি। একটা ঝি—চাকরও নেই।’
‘নিজেই রাঁধেন। বাহ তাহলে তো একটু বেশি করেই—’ বলতে বলতে সুভাষ গায়েন ভিতরে ঢুকে গেল।
অপ্রতিভ অপ্রস্তুত রোহিণী। এতক্ষণ যেসব কথা বলে সুভাষ গায়েন তাকে অস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে রেখে দিয়েছিল, এখন তাকে দ্বিগুণ অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিল। শোভনেশ খুনের ছবি আঁকত বাসুদেবপুরে। গঙ্গাদা বলেছে, গ্রামজীবনের শান্ত স্নিগ্ধ ছবি আঁকব। গঙ্গাদাই তাহলে ছবি নকল করার মতলবটা সুভাষ গায়েনকে দেয়! সুভাষকে খুনের চেষ্টা—হ্যাঁ, গঙ্গাদার পক্ষে তা করার পিছনে যুক্তি আছে। অতঃপর মনে হল, ছাঁদাটা একটু বড়ো করে দেওয়ার পিছনেও যুক্তি আছে। বাড়ি গিয়ে তাকে তাহলে রান্নার উদ্যোগ করতে হবে না।
