‘কে ডাক্তারবাবু?’
‘নাম জানি না, চিনিও না। যে মেয়েটি মামাবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল কাগজের আপিস থেকে সেই তো ফোন করে ডেকে আনল ডাক্তার…আরে তখন তো বাড়িতে কেউ ছিলই না। না বড়োবাবু, না একটা ব্যাটাছেলে।’
শ্রীমন্ত আর কথা না বলে ছুটে গেল ব্রজরাখালের অফিসঘরের দিকে, দরজা ভেজানো হয়েছে। তার মানে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা চলছে। চলুক, এটাও গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে।
মাঝবয়সি দুটি লোক টেবলের এ ধারে। শ্রীমন্ত তাদের চেনে। গতবারের ইলেকশনে এই কিশোরী জোয়ারদার আর মনু ঘোষ ছিল ব্রজরাখালের দুটি বিশ্বস্ত হাত। ইলেকশনের পোলিং এজেন্ট ভাড়া করা থেকে শুরু করে বিজয় মিছিলের মাইক্রোফোন ভাড়া করার মধ্যে যত খুঁটিনাটি কাজ থাকতে পারে, সবই এরা দু-জন করেছিল।
শ্রীমন্ত ঘরে ঢোকামাত্রই ব্রজরাখাল কথা বন্ধ করে তাকালেন। যেন গাড়ি থামাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, ‘পরে…পরে আসিস।’
এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে না এসে উপায় নেই। কিন্তু কতক্ষণ সে অপেক্ষা করবে? অকাদাদুর খবর জানতে শ্রীমন্ত এত ব্যস্ত হল যে, কদাচিৎ যেটা সে করেছে তাই করল, দোতলায় উঠে এল।
লম্বা দালানটা তখন জল-ন্যাতা দিয়ে রেবা মুছছে। শ্রীমন্তকে দেখেই বলল, ‘দাদুর খবর শুনেছেন?’
‘হ্যাঁ, দিদিমা কোথায়?’
‘রান্নাঘরের দিকে দেখুন।’
দোতলায় শ্রীমন্ত আসে না, যেহেতু দরকার হয় না। মামারবাড়ির লোকেদের থেকে সে নিজেকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্নই রাখে। এরাও তাকে নিজেদের একজন হিসেবে কাছে টেনে নেয়নি। দিদিমা সুরুচি কালেভদ্রে নীচে নামেন শুধু তাঁর দাদার সঙ্গে কথা বলতে তখন যদি দেখা হয়ে যায় সুপ্রভার খোঁজখবর তার কাছে নেন। শ্রীমন্ত প্রতিবারই জানায়, ভালোই আছে। একটা ব্যাপার সে বোঝে না, এত ধনসম্পত্তি, বিত্ত যাদের রয়েছে তারা কেন বাড়ির গরিব মেয়েকে নিয়মিত সাহায্য করে না। এমনকী কোনো উৎসব অনুষ্ঠানেও ডাকে না, একখানা কাপড়ও দেয় না। তাকে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছে যেন কর্মচারী হিসাবেই, তার দৌহিত্র বা ভাগনে পরিচয়টা এদের বিড়ম্বিত করে।
দোতলার পিছন দিকে রান্নার আর ভাঁড়ার ঘর। তার লাগোয়া ছোটো একটা টালির চালায় ঢাকা ছাদ। সেখানে একটা কাঠের চেয়ারে সুরুচি বসে ছিলেন। ঝি আনাজ কুটছে। শ্রীমন্ত কাছে এসে দাঁড়াল। সুরুচিই প্রথম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখন এলি?’
‘হ্যাঁ, দাদুর কী হয়েছে?’
‘পেচ্ছাব হচ্ছিল না। চাপা লোক তো, সহ্যশক্তিও তেমনি, কাউকে কিছু বলেনওনি। একবার যদি আমাদের বলতেনও তাহলে তো কত আগেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারতুম। বাইরের একটা মেয়ে এসে…হ্যাঁ রে মেয়েটা কে রে?’ সুরুচির অনুযোগ একটু উত্তেজিত কণ্ঠেই প্রকাশ পেল।
‘মেয়ে! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না! …এইমাত্র তো এলাম।’ শ্রীমন্তকে আকাশ থেকে পড়ার মতো দেখাল। অবশ্য সে বিজয়ের কথাতেই বুঝে গেছল মেয়েটি অসীমা আর সত্যি সত্যিই তখন অবাক হয়েছিল। খবর পেয়ে অসীমা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবে! এত কৌতূহল অকাদাদু সম্পর্কে!
‘যে মেয়েটাকে তুই আসতে বলেছিলি দাদার সঙ্গে দেখা করার জন্য।… কথাবার্তা কেমন ধারা যেন, বলে কিনা চার দিন ধরে অসুস্থ অথচ কেউ খোঁজ রাখেনি? এই সব লোককে তুই আসতে বলিস এ বাড়িতে?’
শ্রীমন্ত চুপসে গেল দিদিমার বিরক্তি ভরা ধমকে। কৈফিয়ত দেবার মতো সুরে বলল, ‘আমি কী করে জানব ওর কথাবার্তা কেমন, ওকে কী আমি ভালো চিনি? সমাচার কাগজের থেকে এসেছে, দাদুর ইন্টারভিউ চেয়েছিল তাই আসতে বলেছিলাম। …দাদু আছে কেমন?’
‘ক্যাথিটার দিয়ে পেচ্ছাব করিয়েছে। তবে ডাক্তার বলেছে দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে।… গাদা গাদা ওষুধের বড়ি খেয়ে নিজের সব্বোনাশ নিজেই করেছে তা আমরা আর করব কী?’
‘দুটো কিডনি নষ্ট হলে তো…’ শ্রীমন্ত ভীত স্বরে বলল, ‘কোন নার্সিং হোমে আছে জান?’
‘না, ব্রজ বলতে পারবে। …তবে যখন তখন গেলে দেখা করতে দেয় না। বিকেল চারটে থেকে দু-ঘণ্টা শুধু।’
সুরুচি অতঃপর কুটনো কোটার দিকে মনোনিবেশ করলেন। শ্রীমন্ত মিনিটখানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, দিদিমার ডাকে ঘুরে দাঁড়াল।
‘দিপু নাকি একটা নীচু জাতের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে, সত্যি?’
শ্রীমন্ত প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল। আশ্চর্য তো! খুদিনগরে বসে চুয়াত্তর বছরের দিদিমা এ কথা জানল কী করে! কে পৌঁছে দিয়ে গেল? সুরুচিও বুঝতে পেরেছেন ঠিক এই জিজ্ঞাসাটাই নাতির মাথায় এখন ঘুরছে।
‘আমি অনেক খবরই পাই রে। তোদের চেনে জানে এমন লোকও তো এখানে আছে যে ব্রজর কাছে বলে দিয়ে গেছে। বল না কথাটা কি সত্যি?’
‘সত্যি। কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী?’
শ্রীমন্ত উদ্ধত ভঙ্গিতে, এবার পালটা প্রশ্ন তুলল। সুরুচি ভ্রূ তুলে নাতির রুক্ষ মুখভাব লক্ষ করে মুখ শক্ত করলেন। ‘ইলেকশনের আগে এসব খবর রটলে ভোটারদের কাছে অনেক নীচু হয়ে যেতে হয়। ব্রজর এলাকাটা গেরস্তদের নিয়ে।’
‘ভোটাররা এসব গ্রাহ্য করে না, তাহলে দাদামশাই ভোটে জিতে এমএলএ হতে পারতেন না।’
‘মিত্তিরের মেয়ে মুখুজ্জেকে বিয়ে করলে তাকে নীচু জাতে করা বলে না। তোর দাদামশাই গুন্ডা বদমায়েশও ছিলেন না।’
