অনন্ত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল প্রথমে। তারপর ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘ওদের নেমন্তন্ন করে আনব!’
‘হ্যাঁ। তার আগে একটা সোনার আংটি কিনে মাকে দিতে হবে, জামাইকে দেবার জন্য।… তোর যদি এতে আপত্তি থাকে তো বল, তাহলে আমি নিজেই যাব।’
দরজার কাছে জয়ন্ত এসে দাঁড়িয়েছিল, শ্রীমন্ত তা লক্ষ করেনি। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে বলল, ‘আয়, কথা আছে।’
‘দিপুদের ডেকে আনার কথা তো? আন, আমি আর কী বলব।’ নিস্পৃহ শুকনো স্বরে জয়ন্ত বলল। ওর অনুমোদন নেই বুঝতে ঘরের কারোরই অসুবিধা হল না।
জয়ন্ত বেরিয়ে যাচ্ছিল, শ্রীমন্ত ডাকল।
‘তোর আপত্তির কারণ আমি জানি, তুইই বলেছিস।’ শ্রীমন্ত দুই ভাইয়ের এবং মায়ের উপর একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আমার এই ব্যান্ডেজটার কারণ যারা, তারা এই বাড়িরই লোক। এদের সঙ্গে ছোটো জাত, অশিক্ষিত, একটা মিনিবাস কনডাকটরের পার্থক্য কতখানি, সেটা কী কেউ আমায় বুঝিয়ে বলবে?’
‘আমি তো বলেইছি, ওদের ডেকে আনতে ইচ্ছে হয় তো আন।’ জয়ন্তের গলায় আগেরই স্বর এবং তাতে যোগ হয়েছে অল্প একগুঁয়ে কাঠিন্য।
‘দশ বছর ধরে টাকা রোজগারের জন্য যেসব কাজ আমায় করে যেতে হয়েছে, তার খবর তোমরা রাখ না। শুধু আমিই জানি সেসব কাজের জন্য কত নোংরা লোকের কাছে কতটা নীচু আমাকে হতে হয়েছে। সেই কাজ করে পাওয়া টাকায় এই সংসারের লোকেরা ভাত খেয়েছে। আমার মনে হয় দিপুর কাজ নিয়ে আপত্তি তোলার অধিকার আমাদের কারোরই নেই।’
‘বড়দা, ভাত খাওয়ার কথাই যদি বলো, তাহলে বলতে হয় পৃথিবীতে কোনো ভাতই পরিচ্ছন্ন নয়, শুধু উপোস করে থাকলে তবেই নিজেকে গ্লানির হাত থেকে বাঁচানো যায়। ভাত খাওয়ার খোঁটাটা এভাবে না দিলেই পারতে।’ জয়ন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ছে দেখে শ্রীমন্ত অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল। কথাটা এইভাবে বলা ঠিক হয়নি।
‘এটা খোঁটা নয় জয়ন্ত, তোর আপত্তিতে যে যুক্তি নেই সেটাই বোঝাবার চেষ্টা করেছি। যাই হোক, তর্ক করে এসব বিষয়ে মত বদলানো যায় না, এসব রক্তের মধ্যে থাকে। আত্মসম্মান বোধ যে যেরকমভাবে দেখে সেইভাবে সে গ্রহণ করে। আমি তোকে কম্প্রোমাইজ করতে বলব না, শুধু বলব ভুলভাবে তুই এটা দেখছিস। তুই লেখাপড়া করছিস ভালো একটা চাকরি পাবার জন্য কী ব্যাবসা করার জন্য। ধর, তোর উপরওয়ালা যদি হয় শ্যামলের কোনো কাকা বা দাদা তাহলে তুই উঁচু ঘর, উঁচু জাত বলে তাকে দেখে কি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াবি না?’
জয়ন্তর মুখটা শ্রীমন্তর কথাগুলো শুনতে শুনতে কর্কশ হয়ে উঠছিল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে এনে সে বলল, ‘এতসব যুক্তির দরকার নেই, আমার যা বলার তা বলে দিয়েছি।’ কথাটা বলেই আচমকা সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শ্রীমন্তর মনে হল জয়ন্ত যেন এই সংসার থেকেই বেরিয়ে গেল। সে এবার অনন্তর মুখের দিকে তাকাল। নির্বোধের মতো মুখ। যে ভাইয়ের কাছে খাওয়া পরা জুটবে তাকেই মান্য করবে। ওকে নিয়ে সমস্যা হবে না।
‘এখন থাক। আমি একটু ভেবে দেখি। আর শোন, ঘুনুকাকাদের সঙ্গে কোনোরকম ঝামেলা করিস না।’
মাথায় একটা দপদপ যন্ত্রণা হচ্ছিল। শ্রীমন্ত সারাদিন শুয়েই কাটাল। সুপ্রভা একসময় তাকে চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হ্যাঁরে দিপুকে আনবি বললি, ওসব কি তোর মনের কথা?’
‘হ্যাঁ, মনেরই কথা। দ্যাখো মা, কতকাল আর আমি এই সংসার একা একা টানব? ভাইয়েরা এবার পাশে এসে দাঁড়াক! ওদের মানসিকতা না বদলালে ওরা দাঁড়াতে পারবে না, সেজন্য ধাক্কা দেওয়া দরকার। বড্ড আলসে, বড্ড কুঁড়ে হয়ে গেছে, সেজন্যই দিপুর ব্যাপারটা দিয়ে শুরু করলাম। দিপু খুব তাজা মেয়ে…ওকে নিয়ে তুমি ভেবো না।’
তিনদিন বাড়িতে কাটিয়ে শ্রীমন্ত খুদিনগর বাজারে সকাল আটটায় বাসস্টপে যখন নামল তখন সে ঘুণাক্ষরেও জানত না মামার বাড়ি গিয়ে কী পরিস্থিতির সামনে পড়বে।
বৈঠকখানায় কিছু লোক বসে, এটা সে রাস্তা থেকেই দেখে নিয়ে, সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সোজা অন্দরে যাবার জন্য ডানদিকের দরজায় এগোল। এখন নানান ধরনের উমেদার, স্তাবক, পরামর্শদাতা এবং সত্যিকারের কাজ নিয়ে আসা লোকেরা ব্রজরাখালের সঙ্গে দেখা করতে আসে। গুরুত্ব বুঝে ভিতরের অফিসঘরে কাউকে কাউকে নিয়ে গিয়ে সে কথা বলে।
শ্রীমন্ত ভিতরের দালানে ঢুকেই দেখল ট্রে হাতে ব্রজরাখালের অফিসঘর থেকে বেরিয়ে আসছে বিজয়। তাকে দেখে বিজয় দ্রুত এগিয়ে এসে চাপাস্বরে বলল, ‘একদিনের জন্য থাকবে বলে তিনদিন কাটিয়ে এলে? এদিকে কী কাণ্ড হয়েছে জান? …মামাবাবুকে নার্সিং হোমে ভরতি করানো হয়েছে, খুব খারাপ অবস্থা!’
‘কবে? কী হয়েছে অকাদাদুর?’ শ্রীমন্তর মাথায় একঝলক রক্ত উঠে এল। ঝুলে গেল দুটো হাত।
‘তুমি যেদিন চলে গেলে সেদিন বিকেলেই ডাক্তার আনতে হল…পেচ্ছাব বন্ধ হয়ে গেছল, চারদিন ধরে হচ্ছিল না। …এত বয়স পর্যন্ত রোগভোগ যে এতদিন হয়নি এটাই আশ্চর্যের।’
শ্রীমন্ত অকাদাদুর ঘরের দরজাটা বন্ধ দেখল। এই সময় খোলা দরজায় পর্দাটা টানা থাকে। এ ছাড়া অন্য দিনের মতোই বাড়িটাকে মনে হচ্ছে। দোতলায় রেডিয়ো খোলা, বাউল গান ভেসে আসছে। মাসিমা তার নাতিকে চেঁচিয়ে বকলেন।
‘কোন নার্সিং হোমে গেছেন? … কেমন আছেন?’
‘কলকাতায়, খুব বড়ো নার্সিং হোম, দিনে দুশো টাকা শুধু থাকারই ভাড়া, ডাক্তারবাবু ওখানেই ভরতি করাতে বললেন।’
