শ্রীমন্তর মাথার মধ্যে হঠাৎই দাউ দাউ করে, চেপে রাখা দিশেহারা রাগটা জ্বলে উঠল, যেটা ঘুনুকাকার কথাতেও জ্বলে উঠেছিল।
‘দাদামশাই বিপ্লবী ছিলেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য বোমা পিস্তল নিয়ে নাকি শত্রুদের সাবাড় করতে আত্মগোপন করে থাকতেন। কপর্দকহীন গরিবের ছেলে ছিলেন। মা-র কাছেই এসব শুনেছি, আর…।’ শ্রীমন্ত নিজেকে সামলে নিল। আর একটা কথা বললেই তাকে বিপদের মধ্যে পা বাড়াতে হবে। এখানকার পাট চুকিয়ে ফিরে যাওয়ার কথাটাই তার মনে ঝলসে উঠল।
সুরুচি ঠান্ডা চোখে তাঁর দৌহিত্রের দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে। শুধু ঠোঁট দুটি নাড়িয়ে বললেন, ‘আর…আর কী?’
‘আর কিছু নয়।’
সুরুচির কোনো পরিবর্তন ঘটল না। শুধু স্বরটা একটু নামিয়ে বললেন, ‘দাদা?…কিছু বলেছে?’
‘না।’
‘ঠিক করে বল।’
‘দাদু কখনো তাঁর অতীত নিয়ে কথা বলেন না।’
‘জানি…আচ্ছা আয় এখন।’
অত্যন্ত চিন্তিত এবং ত্রস্ত মনে শ্রীমন্ত নীচে নেমে এল। মামার অফিস ঘরের দরজা এখনও ভেজানো। সে তালা খুলে নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। তার চিন্তাটা আর অকাদাদুকে নিয়ে নয়।
বোকার মতো দিদিমাকে সে চটিয়ে দিল। তবু শেষ মুহূর্তে চুপ করে গিয়ে খানিকটা সামলাতে পেরেছে। তাহলেও ওই ঠান্ডা চাহনিটা খুবই সন্দেহজনক। যেকোনোদিনই মামা তাকে ডেকে বলতে পারে : ‘এবার এখান থেকে বিদেয় হ। তোর মতো লোক আমি টাকা দিয়ে অনেক পাব। …বাবার সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলিস কিনা তারই বাড়িতে বসে? আজ তোদের পরিবার খেয়েপরে বেঁচে আছে তারই দয়ায়। মাসে মাসে যে টাকা পাস, সেটা তো আসছে রামরাখাল মুখুজ্জেরই গড়া বিষয় আর ব্যাবসা থেকে। আর তার সম্পর্কেই ব্যঙ্গ করে বলিস, ‘বোমা-পিস্তল নিয়ে নাকি’… ‘নাকি’ মানে? …এখুনি দূর হ।’
‘দাদা ঘুমুচ্ছেন?’
দরজার কাছ থেকে রেবার কুণ্ঠিত গলা শোনা গেল। শ্রীমন্ত মাথাটা সামান্য তুলে বলল, ‘কী দরকার?’
ঘরের মাঝামাঝি এসে রেবা বুকের উপর কাপড় টানল, যদিও দরকার ছিল না।
‘আপনার মাথায় কী হয়েছে?’ রেবার স্বরে একটু উদবেগ।
এ বাড়িতে আজ এই প্রথম একজন তাকে লক্ষ করেছে। শ্রীমন্তর ভালো লাগল। সে পূর্ণ দৃষ্টি রাখল রেবার মুখে। সহানুভূতি মাখানো রয়েছে, মমতা চোখের মণিতে।
‘উপর থেকে একটা সিমেন্টের চাঙড় খসে হঠাৎ মাথায় পড়ল। খুব বেশি কাটেনি…হ্যাঁ আমাদের বাড়িতেই। ছাদটা খুব পুরনো, একশো বছরের উপর বয়স। কিছু বলবে?’ শ্রীমন্ত উঠে বসল।
রেবার হাতে একখণ্ড কাগজ রয়েছে শ্রীমন্ত তা নজর করেনি। সেটা এগিয়ে ধরে কুণ্ঠিত স্বরে সে বলল, ‘এটায় যা যা লিখতে হবে একটু লিখে দেবেন?’
একটা আবেদনপত্র। শ্রীমন্ত চোখ বুলিয়ে বলল, ‘অনাথ আশ্রমে কাকে দেবে?’
‘ছেলেকে। কথা বলে খোঁজটোজ নিয়ে এসেছি।’
‘ছেলেকে? ও অনাথ নাকি? তুমি মা রয়েছ, তাহলে অনাথ কীসে?’
‘ওখানে ছাড়া আর কোথায় রাখব, আমার টাকা কোথায় যে আলাদা কোথাও রেখে মানুষ করব? এখানে থাকলে ও নষ্ট হয়ে যাবে।’
‘এই ফর্মে বলছে, ছেলের বাবা-মা কেউ নেই, কবে, কোথায়, কীভাবে তারা মারা গেছে, দু-জন নিকট আত্মীয়ের নাম-ঠিকানা, কার কাছে এতদিন রয়েছে, তার আয় কত, এইসব লিখে দিতে হবে। কিন্তু তুমি তো বেঁচে আছ!’
‘লিখে দিন মা মরে গেছে, মাসির কাছে রয়েছে। মাসি তিন বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে, আড়াই শো টাকা মাসে রোজগার। মাসি আর এখন সংসার চালাতে পারছে না বলে বোনপোকে আশ্রমে দিতে চাইছে।’
রেবার বলার ধরন থেকে শ্রীমন্ত বুঝল, কথাগুলো আগে থেকেই ভেবেচিন্তে তৈরি করে রাখা।
‘যা বললে তার মধ্যে সত্যি কথা ক-টা?’
‘সবই সত্যি…একটা ছাড়া।’ রেবার হাসি ওর মুখটাকে করুণ করে দিল।
‘নিজেকে মেরে ফেলছ।’
‘ছেলেকে বাঁচাতে গেলে…আপনি জানেন না আমরা যেখানে থাকি সে জায়গাটা কী খারাপ! ওকে লেখাপড়া শেখাতে চাই। এখানে থাকলে ও খারাপ হয়ে যাবে।’
‘তোমার স্বামী কী করত, কীভাবে মারা গেল?’
‘ভ্যান রিশকা চালাত, নেশা করত। চার বছর আগে লরির ধাক্কায় একটা পা গেল। সেটা কেটে বাদ দিতে সেখানে ঘা হল। হাসপাতালে বলল ক্যানসার, বাড়ি নিয়ে যাও। বাড়িতে আসার তিন হপ্তার মধ্যে মরে গেল। ছেলে রমু তখন তিন বছরের।’
‘তারপর থেকে তুমি রোজগেরে নামলে?’
‘ঝিয়ের কাজ একবাড়িতে আগেও কত্তুম, পরে আরও দুটো বাড়ি ধরলুম।’
‘এই কাজ ছাড়াও আর কিছু?’
রেবার মুখ কয়েক মুহূর্তের জন্য বোধরহিত শূন্যতায় ভরে রইল। তারপর সহজভাবে প্রশ্নটাকে নিল। ‘একজন হপ্তায় দু-দিন আসে আমার কাছে, সুপার বাজারে মুদির দোকান আছে। সেই তো এই অনাথ আশ্রমের খবরটা আমায় দিয়েছে।’
‘লোকটা কত দেয় তোমায়?’ শ্রীমন্ত কৌতূহল আর চাপতে পারল না। কিন্তু প্রকাশ করেই বুঝল নিজেকে খেলো করে ফেলেছে কেননা রেবার এতক্ষণের বিড়ম্বিত, সংযত চাহনিতে হঠাৎ চাপল্যের আভা ফুটে উঠল।
‘তা জেনে আপনি কী করবেন?’
‘কী আবার করব।’ শ্রীমন্ত মুখ একটু বেশিই গম্ভীর করল। ঝোলাটা থেকে কলম বার করে ভারি গলায় বলল, ‘যা যা জিজ্ঞেস করছি জবাব দাও।’ ফর্মটা বিছানায় একটা খাতার উপর রেখে সে ঝুঁকে বসল।
‘বাবার নাম?…তোমার স্বামী।’
‘বিনোদচন্দ্র পাইক।’
‘গ্রাম, পোস্ট অফিস, থানা?’
‘গ্রাম আর পোস্টাপিস একই, বড়ো কুরকুরিয়া, থানা কুলতলি।’
