‘ওরে অনু, ওরে শঙ্কু, আমায় মেরে ফেললে রে…শিগগিরি আয়, আয় ওরে শিগগিরি আয়-।’
দুই যুবক ছেলে দোতলা থেকে হুড়মুড় করে নেমে এল। একজনের হাতে দু-হাত লম্বা একটা জলের পাইপ। ওরা বাবাকে মেঝেয় পড়ে থাকতে দেখেই শ্রীমন্তর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে বাড়ির কয়েকজন ছুটে এসে ওদের মাঝে দাঁড়িয়ে হাতাহাতিটা বন্ধ করল। শ্রীমন্তর মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল, একজন তাকে টেনে নিয়ে গেল পাড়ার এক ডাক্তারের কাছে।
অন্ধকার ঘরে বিছানায় মা-র পাশে শুয়ে ঘটনাটার কথা ভাবতে ভাবতে শ্রীমন্ত নিজের সম্পর্কে একটা ভয় পাওয়ার মতো ধারণায় পৌঁছল। উসকানি যতই থাক তার এমনভাবে নাড়া খেয়ে ওঠাটা উচিত হয়নি। ফ্যামিলিটা নুইসেন্স, দুটি মাত্র শব্দ যে তাকে এইভাবে ক্ষেপিয়ে দিতে পারে, এটাই তার আবিষ্কার। খুবই প্রখর একটা আবেগ সংসারকে ঘিরে তার মধ্যে টলমলে অবস্থায় রয়েছে, সেটা ভালো না খারাপ তাই নিয়ে চিন্তা সে করছে না, তবে একটা ব্যাপার সে বুঝে ফেলেছে, মা, বোন, ভাইয়েরা অর্থাৎ সংসারটাকে হৃদয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি এনে ফেলে সে আবেগটাকে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। অল্প বয়সেই পাঁচটি মানুষকে রক্ষার দায়িত্ব পেয়ে আর এখনও পর্যন্ত তাতে সফল হয়ে এটাকেই সে তার জীবনের অন্য ব্যর্থতাগুলো ঢাকনা হিসাবে হয়তো ব্যবহার করছে। কিছুটা দূরত্ব রেখে সংসারের সঙ্গে চলাই ভালো। যদি চলত, তাহলে সারা পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে যাওয়া এই ঘটনাটা ঘটত না। ঘুনুকাকাকে সে জন্ম থেকেই দেখছে, যদিও আত্মীয়, একই বাড়িতে বাস কিন্তু তাদের সঙ্গে সদভাব একদমই নেই তবু প্রতি বিজয়ায় প্রণাম করতে যায়, মুখোমুখি হলে ঠোঁটে হাসিও ফোটায়। লোকটা নিকৃষ্ট ধরনের, তবু ওর সঙ্গে এমন রূঢ় ব্যবহার করাকে কোনোভাবেই সে সায় দিতে পারছে না।
সাতটা সেলাই নিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথাটাকে শ্রীমন্ত দু-পাশে নাড়াতেই সুচ বেঁধার মতো তীক্ষ্ন যন্ত্রণা পেল। কাতর শব্দ শুনে সুপ্রভা বললেন, ‘কষ্ট হচ্ছে?’
‘না।…ভাবছি। আজ সারাদিনটা কী ভাবেই না কাটল।’
সুপ্রভা চুপ করে রইলেন।
‘খুদিনগর থেকে আসার সময় দিপুর কাছে গেছলাম।’
শ্রীমন্ত অনুভব করল তার মা মুহূর্তে টানটান হয়ে উঠল। স্বাভাবিকই। এবার সে প্রশ্নের অপেক্ষায় রইল। দীর্ঘ একটা মিনিট ঘরটা বাকশূন্য রইল।
‘মা, একটা কথা বলব?…তোমরা এটা মেনে নাও। তোমাদের আপত্তিগুলো এখন আর চলে না। এই দ্যাখো না, আজ এ বাড়িতে যা হল, এটা কী আমাদের বংশে, যা আমাদের মর্যাদা, সম্মান ছিল, তাতে কী এই সব হওয়ার কথা? কিন্তু হচ্ছে, আরও হবে।…আমরা অতীতের ছায়ার আওতায়ই রয়ে গেছি…দিপুই প্রথম রোদ্দুরে বেরোল।…এবার ওকে একটা ছাতা দাও।’
শ্রীমন্ত শুনতে পাচ্ছে ঠোঁট চেপে মা-র কান্না। সে হাত বাড়িয়ে সুপ্রভার কাঁধটা পেল। কোনো সান্ত্বনা দিল না।
‘ভাইয়েদের বল।’
‘বলব।’
সকালে শ্রীমন্ত ডাকল বসন্তকে। বালিশে হেলান দিয়ে সে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘বোস।’
বসন্ত খাটের কিনারে বসল। মুখ পাংশু।
‘দিপুর বিয়ে দেব বলে সব ভাইয়ের কাছে কিছু কিছু টাকা চাইব ঠিক করেছিলাম, তা দিপু তো তোমাদের রেহাই দিয়েছে। কিন্তু আমি তো রেহাই দিতে পারব না।’ শ্রীমন্ত প্রথমেই একটা চাপ ওর ঘাড়ে তুলে দিয়ে প্রতিরোধটা দুমড়ে দেবার পন্থা নিল।
‘চেষ্টা তো করছি। আর্ম পুলিশে তোমার চেনাজানা কেউ আছে? বিজ্ঞাপন দিয়েছে রিক্রুটমেন্টের।’
‘দরখাস্ত করেছিস?’ শ্রীমন্তর মনে হল, বসন্ত তাকে মিথ্যা কথা বলে বেপথে নিয়ে যেতে চাইবে।
‘না।’
‘না করেই চেনাজানার কথা বলছিস? তোর বুকের ছাতি কত? হাইট, ওজন কত?’
‘মুরুব্বি থাকলে সব ম্যানেজ হয়ে যায়।’
‘যায় বুঝি! আচ্ছা তাহলে দরখাস্ত একটা কর, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি চেনা কেউ আছে কিনা।’
কথাবার্তা শেষ ধরে নিয়ে বসন্ত উঠে দাঁড়াল।
‘দাঁড়া। সামনের মাস থেকে অনন্ত আর তুই দুশোটা করে টাকা মাকে দিবি। এতকাল আমি টেনে এসেছি আর আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ শ্রীমন্ত তীক্ষ্ন চোখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইল।
‘কিন্তু আমি তো চেষ্টা…।’
‘আর শোন, দিপুর বর শ্যামলকে তো চিনিস?’
বসন্ত মাথা নেড়ে বোঝাল, চেনে।
‘ওর সঙ্গে লেগে থাক। রোজগারের একটা কিছু রাস্তা তোকে বাতলে দিতে পারবে। শিলিগুড়ি গেছে ফিরেছে কিনা খোঁজ নে।’
‘কে, শ্যামল গেছে?’
বসন্তর গলার স্বর থেকে শ্রীমন্ত বুঝল, ওর প্রশ্নটা হল, তুমি সেটা জানলে কী করে?
‘হ্যাঁ, শ্যামল গেছে। দিপুর সঙ্গে কাল আমি ওর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছি।’
প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য শ্রীমন্ত তাকালও না। জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুধু বলল, ‘বসে বসে খাওয়ার লজ্জা থেকে বেরোবার চেষ্টা কর।’
দুপুরে অনন্তকে আর ডাকতে হল না। সেই নিজেই এসে খাটের কিনারে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বড়দা একবার তুমি রাতেও আমাকে বললে না? আমি তো ভাবলুম ঘর অন্ধকার করে শুয়ে পড়েছ। মা-ও যদি তখন বলত তাহলে ওই অনু আর শঙ্কুকে তখনই ঘর থেকে টেনে বার করে হাত দুটো ভেঙে দিতুম।’
‘ব্যস, শুধুই হাত?’ শ্রীমন্ত বিদ্রুপটা একটু বেশি করেই গলায় ঢালল যাতে অনন্ত সেটা বুঝতে পারে। ওর থতমত হওয়া থেকে বুঝল, বুঝেছে।
‘ওদের দু-জনের হাত থেকে দেবার মতো গায়ের জোর আমার ছিল, এখনও আছে। কিন্তু আসল অপমানটা তো অন্য জায়গায়। ঘুনুকাকা আমাদের বাবা আর বোনকে ঠেস দিয়ে আমাদের ফ্যামিলিকে নুইসেন্স বলেছে…এর শোধ নেব। তুই দিপু আর শ্যামলকে নেমন্তন্ন করে আসবি। ওরা দু-জন এই বাড়িতে ভাত খাবে।’
