পুরোনো অনেক জিনিসই নেই। সাত-আট মাস আগে বাড়িতে তন্নতন্ন খুঁজে শ্রীমন্ত তার বাবার গাওয়া রেকর্ড দুটোর হদিশ পায়নি। গানের কথাগুলো তার মনে নেই। একটার প্রথম লাইন শুধু এখনও মনে আছে : ‘ফিরে কেন ডাকলে আমায় দুয়ার হতে’। গ্রামোফোন ছিল, একগাদা রেকর্ডও ছিল। মাঝে মাঝে বাবা বাজাতেন, কিন্তু নিজের গানের রেকর্ড দুটো বাদ দিয়ে। ‘দুর, ও গান শোনার মতো নয়, বরং শচীনদেবের এই গানটা শোন।’ রেকর্ডগুলো শ্রীমন্তই বিক্রি করে দিয়েছিল সত্তর টাকায় শুধু বাবার দুটো তুলে রেখে। গ্রামোফোনটার জন্য খদ্দের পায়নি।
দিপুর পাশের পাশের ঘরের মাসিমা নাকি বাবাকে গান গাইতে শুনেছেন। শ্রীমন্তর চেনাজানাদের মধ্যে অনেকেই শুনেছে কিন্তু একজন অচেনাকে সে এই প্রথম পেল। আধুনিক গানের জগতে বাবা কী পর্যায়ের গাইয়ে ছিলেন সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। শেষ জীবনটা এমন মর্মান্তিকভাবে না কাটালে হয়তো বাবার সম্পর্কে সে আগ্রহ রাখতে পারত। ওঁর মৃত্যু, খোলাখুলিভাবেই তারা সবাই কামনা করত।
দিপুর ব্যাপারটা নিয়ে বাড়ির কারোর সঙ্গে কথা হয়নি। কিন্তু কী কথাই বা আর এখন বলার আছে? যা হবার হয়ে গেছে এখন মেনে নাও, এইটাই তাকে বলতে হবে। তবে জয়ন্তর ভীষণ লজ্জা, রাগ, দুঃখ, ছোটো জাত এক মিনিবাস কনডাকটরের বউ দিপু সিঁদুর মাথায় পাড়া দিয়ে হাঁটবে আর সেটা কিনা তাকে দেখতে হবে! ওর দাবি, দিপু পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাক। কিন্তু দিপু যাবে না।
শেষকালে জয়ন্তই যদি বংশমহিমা রক্ষার জন্য অন্য কোথাও চলে যায়! শ্রীমন্ত বিব্রত বোধ করল। এই ভাইটার উপরই তার যা কিছু ভবিষ্যতের ভরসা। নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে একদিন সংসারের হাল ধরায় জয়ন্ত তাকে সাহায্য করবে, এটাই সে ধরে রেখেছে। দিপুর ব্যাপারে বিগড়ে যেতে দিলে সংসারের প্রতি ওর টানটা নিশ্চয় ঢিলে হয়ে যাবে।
চিন্তা মাথায় নিয়েই শ্রীমন্ত বাড়িতে ঢুকল। সদরে দেখা হল ছোটো ঠাকুরদার তরফের ঘুনুকাকার সঙ্গে। মেপে কথা বলেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি আর মাথাজোড়া টাক। হাইকোর্টে রেজিস্ট্রারের অফিসে চাকরি করেন। দোতলায় সামনের অংশের মালিক।
‘শ্রীমন্ত, বাড়ির ট্যাক্সের ব্যাপারটা তো মুশকিলে ফেলল। শুনেছিস বোধ হয়, পটল আর বাসুদা বলেছে, ওদের অংশ ছোটো আর পেছন দিকে, ওরা কেন সামনের অংশের সমান ট্যাক্স দেবে! পার্টিশান না করলে এর তো কোনো সুরাহা হবে না।’ ঘুনুকাকা যেন জটিল একটা সম্পাদ্যের সম্মুখীন হয়েছেন এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন।
‘এসব কথা তো আজ দু-বছর ধরেই শুনে আসছি। এই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও হয়েছে। আমিও তো বলে ছিলাম বাড়ি পার্টিশান না করলে এই সমস্যা মিটবে না। যে যার নিজের পোরশানের ট্যাক্স দিক, মেরামত করুক, ইলেকট্রিকের কী জলের লাইন আনাক, কোনো ঝামেলা থাকবে না।’
‘পটল কী বাসুদার কাছে তুই কথাটা পেড়ে দ্যাখ না, আমি তো রাজিই।’ ঘুনুকাকা বাড়ির ভিতরে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। শ্রীমন্ত বাড়াল না। ঘুনুকাকা আশা করেছিলেন শ্রীমন্তও তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে অন্তত সিঁড়ি পর্যন্ত যাবে। তা না হওয়ায় তিনি সামান্য আহত বোধ করেও থমকে গিয়ে বললেন, ‘কিন্তু আর কেউ কী রাজি হবে? পার্টিশান হলেই একটা খরচের মধ্যে পড়তে হবে, সবার কী সে ক্ষমতা আছে?’
শ্রীমন্ত জানে বেশিরভাগেরই নেই, এমনকী তার নিজেরও নেই। তাই সে ঘুনুকাকার প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘সবাইকে আপনিই বলুন, একদিন বসে এই নিয়ে কথা বলার জন্য। কার কী বক্তব্য সবাই সেটা সবার সামনেই জানাক। মেজরিটি যদি পার্টিশানের পক্ষে মত দেয় তাহলে পার্টিশান হবে। খরচ বইবার ক্ষমতা যার নেই তারটা অন্যেরা শেয়ার করে দিয়ে দেবে।’
সে জানে অন্যের খরচের দায় ভাগ করে নেবার জন্য এই বাড়ির একজনও রাজি হবে না। বাড়ির সেরা, সুবিধার অংশটা এই ঘুনুকাকার। ওঁরই আগ্রহ বেশি কিন্তু টাকা খরচ করতে চান না। অথচ ওঁরই অবস্থা সবার থেকে ভালো। সে জানে এই বাড়ির কোনোদিনই পার্টিশান হবে না, ছুতোনাতায় ঝগড়া বেধে যাওয়াটা বরং বাড়বে আর এরই মধ্যে তাকে আজীবন বাস করতে হবে।
‘এসব বুদ্ধি তোর মাথায় কে ঢোকাল?…অন্যেরা শেয়ার করে দিয়ে দেবে? কেন দেবে? তুই কল-পায়খানা করবি, সিঁড়ি বানাবি আর খরচ দেব আমি?’
‘হ্যাঁ দেবেন যদি নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতে চান।’ শ্রীমন্ত গলাটা একটু কঠিন করেই বলল।
‘হ্যাঁ দেবেন!’ ঘুনুকাকা চ্যালেঞ্জের চাহনি এনে চোখ দুটি বিস্ফারিত করলেন। ভাবখানা, এতবড়ো কথা তার মুখের উপর বলার সাহস দেখাল! ‘না দিলে ঝঞ্ঝাট হবে?…তুইও কী বাপের মতো পাগল হলি?’
কথাটা শোনামাত্র শ্রীমন্তর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। সে এগিয়ে ঘুনুকাকার মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘বাবা পাগল ছিল, কিন্তু আপনার তো কোনো ক্ষতি করেনি।’
‘না করেনি, শুধু ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে আমাদের বাড়িটাকে হাসির বস্তু করে দিয়ে গেছে যেমন আবার করল তোর বোন!…তোদের ফ্যামিলিটা যে কী নুইসেন্স-‘
কথা শেষ হবার আগেই শ্রীমন্ত তার গলায় ধাক্কা দিয়ে পিছনে ঠেলে দিল। ঘুনুকাকা উলটে পড়ে গিয়েই তারস্বরে ছেলেদের নাম ধরে চেঁচাতে শুরু করলেন।
