বিদ্যুৎ ঘোষ টেবলে এসে দাঁড়ানো এক তরুণ সাব-এডিটরের দিকে মুখ তুললেন, ‘কী হল?’
‘এটার বাংলাটা-‘ টেলিপ্রিন্টার কপিটা বিদ্যুৎ ঘোষের হাতে দিয়ে তরুণটি বলল, ‘এই শব্দটা…পারফরম্যান্স! এককথায় কী হবে এর বাংলা?’
বিদ্যুৎ ঘোষ বাক্যটি দু-তিনবার পড়লেন, ভ্রূ কোঁচকালেন। ‘শ্রী গান্ধী বলেন, শ্রীলঙ্কায় এ পর্যন্ত আই পি কে এফ-এর যা পারফরম্যান্স, মানে…যা প্রদর্শন করেছে… এ পর্যন্ত যে কাজ করেছে, অর্থাৎ…সাফল্য-অসাফল্য মিলিয়ে যা দেখিয়েছে-‘ অসহায়ভাবে তিনি তরুণটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘তাহলে ‘প্রদর্শন করেছে’টাই লিখি।’
‘তাই লেখো।’ বিদ্যুৎ ঘোষ হাঁফ ছেড়ে শ্রীমন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাংলা ভাষাটা যে কত দুর্বল। আজই আমার কাগজে বেরিয়েছে ‘তিনি খুব ভারসাম্যের সঙ্গে জয়টিকে গ্রহণ করেছেন।’ এটা কী একটা বাংলা হল?’
শ্রীমন্ত সবজান্তার মতো মুচকি হাসল। ভাষা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারটা তার প্রতিভার আওতায় পড়ে না।
‘কী যেন বলছিলাম?’
‘উনি আচ্ছা বলে চলে গেলেন, মানে জ্যোতির্ময় পাল-‘
‘আর ঠিক দু-দিন পরই একটি মেয়ে এসে হাজির হল। প্রণাম করে বলল, আমার নাম অসীমা, বাবা জ্যোতির্ময় পাল। দু-পাতা লেখা হাতে দিয়ে বলল বাবাকে বলেছিলেন ছোটো করে লিখে দিতে, এনেছি। ছোটোর মধ্যে গুছিয়ে, ঝরঝরে লুসিড বাংলায় এত সুন্দর লেখা! জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওটা ওরই লেখা। একুশ মাস কারখানা বন্ধ থাকলে কর্মচারীদের পরিবারে কী অবস্থা হয় সেটা তুলির কয়েকটা আঁচড়ে স্কেচ করে দেবার মতো ওইটুকু লেখার মধ্যেই একজনের আত্মহত্যার ঘটনা তুলে এঁকে দিয়েছে, সঙ্গে স্ট্যাটিসটিকস। এরপর ওকে দিয়ে অনেক লেখা লিখিয়েছি যাতে কিছু টাকা পায়। বুঝতেই তো পারছি বাড়ির অবস্থাটা কেমন। এরই মধ্যে আবার ওর দাদার খুব ভারি অসুখ গেছে, অপারেশন করতে হয়েছিল।…এলে তিনটে-চারটের মধ্যেই আসে, হয়তো কালই এসে দিয়ে যাবে।’
‘একটা লেখার বিষয়ের কথা কাল ওঁকে বলেছিলাম। কিন্তু আপনার অনুমতি না পেলে তো উনি লিখতে পারবেন না।’ শ্রীমন্ত অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে ভূমিকা ফাঁদল। অসীমা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই এমন একটা সম্ভ্রম তার মনে তৈরি হয়ে গেছে যে নামটি উচ্চচারণে তার বাধবাধ ঠেকল।
বিদ্যুৎ ঘোষ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে। শ্রীমন্ত ঝুঁকে টেবলে কনুই রেখে বলল, ‘সারা রাজ্যে মিউনিসিপ্যাল ইলেকশন তো এসে গেল। এবার আপনারা সব পুরসভাগুলোর একটা সার্ভে করান না। উত্তর চব্বিশ পরগনার ভার যদি ওঁকে দেন তাহলে আমি সাহায্য করব, এটা ওঁকে বলেছি। উনি বললেন, লিখতে তো পারি কিন্তু ছাপবে কে?’
‘এরকম একটা প্রস্তাব সার্কুলেশন ম্যানেজার অবশ্য আগেই দিয়েছে, ঠিকও হয়ে গেছে কাকে কোথায় পাঠানো হবে। অসীমা তো আমাদের স্টাফ নয়, ওকে দিয়ে এসব কাজ করানো যায় না।’
‘যায় না!’ শ্রীমন্তর চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ‘একটা পুরসভাও, আমাদের খুদিনগরটাও কী ওঁকে দিয়ে লেখানো যায় না? বলতে গেলে ওই এলাকাতেই থাকেন, দুটো বাসস্টপ, পুরসভার ব্যাপার স্যাপার বোঝেন, ফার্স্ট হ্যান্ড নলেজ আছে। তা ছাড়া ভেতরের খবরও আমি দিতে পারব।’ তার স্বরে একটা অস্বাভাবিক আকুতি ফুটে উঠছে বুঝতে পেরে শ্রীমন্ত নিজেকে সংবরণ করল।
‘পরে ভেবে দেখব, ইলেকশনের আরও তো অনেক রকম বিষয় আছে।’ বিদ্যুৎ ঘোষ সাদামাটা স্বরে প্রসঙ্গটা এড়াতে চাইলেন।
বাইরের দু-জন লোক কথা বলার জন্য টেবলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ঘোষ তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলুন? বসুন।’
শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল। চেয়ার দখল করে বসে থাকার আর উপায় নেই। ‘বিদ্যুৎদা, আজ তাহলে আসি…একটা ছবি দিয়ে যাব কি? যদি জায়গা-টায়গা হয়-।’
‘দিয়ে যেতে পার, বেরোবে কিনা বলতে পারছি না।’
শ্রীমন্ত সমাচার অফিস থেকে বেরিয়ে বাসের দরজায় ভিড়ের চেহারা দেখে সেন্ট্রাল অ্যাভিনু ধরে হেঁটে বাড়ি রওনা হল। প্রথমে সে খুবই বিরক্ত বোধ করল পথের অবস্থায়। ফুটপাত ভাঙাচোরা গর্তে ভরাই শুধু নয়, দোকান পেতে চৌকি, উনুন, ঝুড়ি, বেঞ্চি দিয়ে চলাচলে আরও অসুবিধা তৈরি করেছে। দু-বছর আগে মেট্রো রেলের জন্য খোঁড়া রাস্তার মাঝখান দিয়ে খালের মতো যে বিশাল গহ্বর সে দেখেছিল আজও তা ঠিক একই রকম রয়েছে। কবে বৃষ্টি হয়েছিল, তারই জমা জলে সবুজাভ রং ধরেছে।
হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তিটা সয়ে গেল বিদ্যুৎ ঘোষের কথাগুলো মনে পড়তে শুরু করায়। শুধু ভালোই লাগছিল নয়, একুশ মাস যে পরিবারের প্রধান আয় বন্ধ তারা ভিক্ষা না করে বেঁচে আছে কী করে এটাই তাকে অবাক করছিল, এখন আবার করতে শুরু করল। অসীমাকে দেখে, তার কথার, আচরণের ডাঁটালো ভাব থেকে একটুও বোঝার উপায় নেই কী অসম্ভব কষ্টের জীবন তাকে কাটাতে হচ্ছে। অভাবের মালিন্য ওকে স্পর্শ করেনি। বিদ্যুৎদা যখন ওর লেখার গুণগান করছিলেন কেন জানি তখন তার বুকের মধ্যে সুখের একটা কম্পন সে অনুভব করছিল।
স্কুলে পড়ার সময় শ্রীমন্তর বাসনা হয়েছিল খবরের কাগজের রিপোর্টার হবার। তার ক্লাসের বন্ধু বারিদের বড়দা বিদ্যুৎ ঘোষকে দেখেই সাধটা জেগেছিল। ওদের বাড়িতে তখন তার যাতায়াত ছিল। সমাচারের সাপ্তাহিক ছোটোদের বিভাগে ‘কুঁড়ি’-র পাতায় তার চারটি গল্প ছাপা হয়, অবশ্যই বিদ্যুৎদার সুপারিশে। কাগজ থেকে সেগুলো কেটে সে একটা খামে ভরে রেখে ছিল। এখনও আছে কি?
