‘আমি আসি এখন।’ মাসিমা নমস্কার করল। শ্রীমন্ত এটার জন্য তৈরি ছিল না। তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে সে প্রতি নমস্কার জানাল।
‘কে?’ শ্রীমন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে দিপুকে জিজ্ঞাসা করল।
‘আমার পাশের পাশের ঘরে, একা থাকেন। এখানে রয়েছেন বছর তিন, নার্সিং হোমে আয়ার কাজ করেন। তিরিশ বছর বিধবা। এক মেয়ে ছিল, কষ্ট করে টাকা জমিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন, দেড় বছর পর মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে আগুনে পুড়ে মারা যায়।’
‘ওহ।’ কেন বা কী কারণে পুড়ল, সেই কৌতূহলের দিকে না গিয়ে শ্রীমন্ত বলল, ‘তোর শ্বশুরবাড়ি কোথায়, কে কে আছে?’
‘নিজের কেউ নেই, এক জ্ঞাতি কাকা থাকে, গৌরীবেড়েতে।…বড়দা…’ দিপু কী যেন বলতে গিয়ে দ্বিধাভরে চুপ করে গেল।
‘বল।’
দিপু মুখ নীচু করে নাক খুঁটতে শুরু করল। শ্রীমন্ত অধৈর্য স্বরে বলল, ‘কী বলবি বল, এখন আমায় যেতে হবে।’
‘আমার জন্য কাপড় না এনে ওর জন্য যদি কিছু একটা আনতে।’
‘এই দ্যাখো, ইসস, কী ভুলই না হয়ে গেল! দেড়শো টাকা দিয়ে একটা প্যান্টের কাপড় কিনে শেষকালে কিনা ফেলে রেখে এসেছি। এবার যেদিন আসব নিয়ে আসব।’
মিথ্যার উপর ভর করে যখন শুরু হয়েছেই তখন যতক্ষণ পারে চলুক, এমন এক মনোভাবে শ্রীমন্ত এখন আক্রান্ত। দিপুর মুখের খুশি কতদিন বজায় থাকবে তা সে আন্দাজ করতে না পারলেও একটা দায় থেকে সে অন্তত রেহাই পেয়েছে। ভবিষ্যতে যদি স্বামীর সঙ্গে অবনিবনা হয়, তা হলে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে সে অপরাধী করতে পারবে না। তবে বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী দিপুর বাসনার চাহিদা, শ্রীমন্তর মনে হল, বোধ হয় অপূর্ণ থাকবে না। যেহেতু ও ভদ্দরলোক হবার ধার ধারে না।
‘মাকে বোলো আমি ভালো আছি, একটুও যেন না ভাবে আমার জন্য। আর বোলো, আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।…না এটা বোলো না, তা হলে কান্নাকাটি শুরু করবে, তার থেকে বরং…’ দিপু চোখ কোঁচকাল। কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘মাকে আসতে বল না, দুপুরে, কেউ জানতে পারবে না। বলবে?’
‘বলব।’
বাড়িতে এসে শ্রীমন্ত কাউকে বলল না সে এইমাত্র দিপুর কাছে গিয়েছিল। শরিকি বাড়ির দোতলার পিছন দিকে তাদের দু-খানা ঘর আর রান্নার জায়গা। সাবেক আমলের খাট, আলমারি, জানলার পাল্লা ঝুলে পড়া, দেওয়ালের পলেস্তরা খসা, মেঝের সিমেন্ট চটা দুটো ঘরের অনেকটা জায়গাই খেয়ে ফেলেছে। তারা চারভাই শোয় বড়ো ঘরটায়, দিপু শুতো মায়ের সঙ্গে অন্য ঘরে যেটার কিছু অংশ ভাঁড়ারও।
জয়ন্ত খেতে বসেছে। শ্রীমন্তকে একবার দেখেই সে মুখ নামিয়ে খেয়ে চলল। সুপ্রভা ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘ভাত খাবি তো?’
‘খাব।’
ভাত খেয়ে শ্রীমন্ত মায়ের ঘরেই খাটে শুয়ে পড়ল। জয়ন্ত বেরিয়ে গেছে। অনন্ত আর বসন্ত একসময় এল। বড়দা এসেছে জানতে পেরেই বোধ হয়, ভাত খেয়েই বেরিয়ে গেল। ওদের আসা যাওয়াটা শ্রীমন্ত তন্দ্রার মধ্যেই জানল।
বিকেলে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সে মাকে বলে গেছল রাত্রে থাকবে। দিপু প্রসঙ্গে কোনো কথাই সে বলেনি। প্রথমে গেল ফোটোগ্রাফারদের স্টুডিয়োতে। ফিল্ম ডেভেলাপ করে দু-দিনের মধ্যে প্রিন্ট দেবার জন্য তাগিদ দিল। তারপর তিনটি খবরের কাগজের অফিসে গিয়ে চিফ রিপোর্টার ও নিউজ এডিটরের কাছে কয়েক মিনিট বসল।
যে রিপোর্টাররা কাল রামরাখাল স্কুলে গেছল তাদের মধ্যে দু-জনের সঙ্গে দেখা হল। একজন বলল, এখনও লিখে ওঠা হয়নি, আজই লিখে দেবে। অন্যজন বলল, কালই লিখে দিয়ে গেছে, স্থানাভাবে বেরোতে পারেনি। দু-জনকেই বাইশ টাকা দামের বিলিতি সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে একই কথা বলল, ‘নিন দাদা, আজ সকালেই এক পার্টি এসে দিল আমায় কিন্তু আমি তো খাই না, তাহলে কাকে এটা দিই ভেবে শেষকালে নিয়ে চলে এলাম।’ রিপোর্টারদের একজন বলল, বড়ো করেই লিখবে। অন্যজন কথা দিল, তাড়াতাড়ি যাতে বেরোয় সেটা দেখবে।
শ্রীমন্ত সমাচার অফিসে দেখা করল বিদ্যুৎ ঘোষের সঙ্গে। অসীমা আজ আসেনি।
‘কোথাও পাঠালে পরের দিনই লেখা জমা দিয়ে যায়, খুব রেসপন্সেবল মেয়ে, হয়তো কোনো কাজটাজে আটকে গেছে।’
‘উনি কী এই সব লেখা ছাড়া অন্য কাজ করেন নাকি?’ হয়তো অবাঞ্ছিত কৌতূহল দেখানো হয়ে গেল, এই ভেবে শ্রীমন্ত তাড়াতাড়ি যোগ করল, ‘এইভাবে লিখে ক-টা টাকাই বা হয়, ওঁর বাড়ি দেখে মনে হল…।’
‘তুমি ওর বাড়ি দেখেছ নাকি?’ বিদ্যুৎ ঘোষ প্রশ্ন করে তাকিয়ে রইলেন। শ্রীমন্তর মনে হল, উনি যেন বুঝে নিতে চান, বাড়ির কতটা সে দেখেছে।
‘যা দেখেছি সেটা অবশ্য না দেখারই মতো। কাল গাড়িতে ওঁকে পৌঁছে দিতে গিয়ে যতটুকু অন্ধকারে সম্ভব।’
‘অসীমার বাবা জ্যোতির্ময় পাল, রাজশাহিতে আমাদের গ্রামেরই লোক। আমার বাবা, মা ওঁকে চিনতেন। এদেশে আসার পর আমাদের বাসায় আসতেন মাঝে মাঝে, ছোটোবেলায় ওকে আমি দেখেছি। বহু বছর পর, মাস তিনেক আগে একদিন উনি এই অফিসে এসে আমার সঙ্গে দেখা করলেন খবর ছাপাবার জন্য। উনি কাজ করতেন বিষ্ণুপুর পেপার মিলের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ সেকশ্যানে, একুশ মাস মিল বন্ধ, মাইনে পাচ্ছে না সতেরোশো কর্মী, তার মধ্যে আছেন উনিও। মাঝে মাঝেই এসব খবর কাগজে বেরোয়। কিন্তু জ্যোতির্ময়কাকা আটপাতার একটা লেখা সঙ্গে এনেছেন, তাতে কারখানার বন্ধ হওয়ার ইতিহাস, কর্মচারীদের দুরবস্থা, ইউনিয়নগুলোর আর নেতাদের আন্দোলন আর সংগ্রামের ধাপ্পাবাজি, রাজ্য সরকারের অসহায়তা-এই সবই ছিল। আমি বললাম, করেছেন কী! এতবড়ো লেখা ছাপব কোথায়? বুড়ো মানুষ, ফিরিয়ে দিতেও কেমন মায়া হল। বললাম, এটা ছোটো করে দু-পাতার মধ্যে লিখে দিন মেইন পয়েন্টসগুলো রেখে। উনি, ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন।’
