প্রথম চুমুক দিয়ে শ্রীমন্ত বলল, ‘হ্যাঁ বছরখানেক পর?’
‘বলেছে ফ্রিজ কিনে দেবে।’
আনন্দের শিহরনটা দিপুর সারা মুখে কয়েক সেকেন্ড ছোটাছুটি করে স্থির হয়ে রইল। আর শ্রীমন্ত অবাক হয়ে শুধু চেয়ে থাকল। দিপু নিজেকে সামলে তাড়াতাড়ি বলল, ‘বললেই কী আর হয়, কপালও থাকা চাই। দোকান চলবে কী চলবে না তার ঠিক কী? গাছে কাঁঠাল আর গোঁপে তেল দিয়ে থাকার মেয়ে আমি নই…তবে ও ভীষণ খাটতে পারে। আমাদের তো কোনো সহায়সম্বল নেই যে…।’
দিপু কী বলতে চায়? সহায়সম্বল মানে বাপের বাড়ি? দাদাদের সাহায্য? তা চাইবার কোনো মুখ ওর আছে কী? এটা নিশ্চয় ও ভালো করেই জানে।
‘বাড়িতে কী বলছে আমার সম্পর্কে?’ পোচটা প্লেটে নিয়ে শ্রীমন্তর কাছে দাঁড়িয়ে দিপু নীচু গলায় বলল। ঔৎসুক্য, উৎকণ্ঠা, বিষাদ সব মিশে আছে ক-টা শব্দে।
‘আমি এখনও বাড়ি যাইনি, খুদিনগর থেকে সোজা আসছি।’
‘জানলে কী করে, ছোড়দা গিয়ে বলেছে? …ও নাকি বলেছে আমি এ পাড়ায় থাকলে ও পাড়া ছেড়ে চলে যাবে। আমার এক বন্ধু মা-র কাছ থেকে শুনে এসে আমায় বলল। আচ্ছা আমি এখানে থাকলে কী এমন ওর ক্ষতি হবে? লোকে নিন্দেমন্দ করবে তো আমাকেই, ওকে তো নয়। আর আমিও তো ও বাড়িতে আর যাব না।’
‘যাবি না?’
‘তোমরা ঢুকতে দেবে?’ দিপু স্বচ্ছ নিশ্চিতভাবে হাসল।
শ্রীমন্ত জানে না এর উত্তর। যদিও সে-ই এখন পরিবারের প্রধান এবং প্রভাবশালী সদস্য, তার মতামতই শেষ কথা, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সে নিরুপায়। কে কীভাবে ব্যাপারটা নিয়েছে শুধু জয়ন্ত ছাড়া আর কারোর মনোভাব সে এখনও জানে না।
‘বাড়ি তো আমার একার নয়, তা ছাড়া তুই কিছুই না জানিয়ে এটা করেছিস। একবার অন্তত কথাটা পেড়ে কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটাও তো দেখে নিতে পারতিস। হয়তো সবাই মেনে নিত, তা হলে আর…।’
‘না মানত না, আমি জানি, মানত না।’
এতক্ষণে দিপু বোধ হয় তার কয়েকদিনের উৎকণ্ঠার চাপ থেকে নিজেকে বার করার সুযোগ পেল। এই আলোচনাটা হোক যেন সে চাইছিল।
‘জন্ম থেকে সবাইকে দেখছি, আমাদের বাড়ির লোক কে কীরকম তা আমি জানি। দু-খানা ঘর, সাতটা লোক তার মধ্যে একজন পাগল। দু-বেলা উনুন ধরবে কি না সেই চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা ছিল না। তুমি কলেজ ছেড়ে রোজগারের জন্য মামার কাছে চলে গেলে। মেজদা, সেজদা লেখাপড়া করল না, তাদের পড়াতে বসানোর লোক কেউ ছিল না। বাড়ির বাইরেই আড্ডা দিয়ে কাটাত। ছোড়দাটা অন্যরকম হয়েছে, ও বুঝেছে পড়াশুনো না করলে দাঁড়ানো যাবে না। আর আমার কথা কে ভাবে?’
দিপু দম নেবার জন্য আবেগ সামলে নিয়ে আবার শুরু করার জন্য একটু থামতেই শ্রীমন্ত এক হাত তুলে বলল, ‘থাম। দরকার নেই এখন এসব কথায়।’ শ্রীমন্ত খালি চায়ের কাপ মেঝেয় নামিয়ে প্লেটটা দিপুর হাত থেকে নেবার জন্য হাত বাড়াল।
‘কেন থামব, কেন দরকার নেই? আমি যদি ভাইদের ভরসায় বাড়িতে পড়ে থাকতুম, তা হলে জীবনেও আমার বিয়ে হত না।…টাকার অভাব যে কী জিনিস, তার থেকেও বড়ো কথা বংশমর্যাদা আঁকড়ে ধরে ভদ্দরলোক সেজে থাকার যে কত বজ্জাত সেটা তো আমাদের বাড়িতেই দেখেছি। সরিৎজ্যাঠার মেয়েদেরই দেখ না, মিনুদির তো আজও বিয়ে হল না, আর হবেও না। তিনুদিকে তিন ছেলেমেয়ের বাপ একটা হেঁপো দোজবরের সঙ্গে গ্রামে বিয়ে দিল, তিনুদি বনেদি বাড়িতে খুব সুখেই আছে, কেমন? বিনুদি একটু দেখতে শুনতে ভালো, বি এ পাশ, জাত মিলিয়ে এক কেরানি বামুনের ছেলেকেই লটকালো, বিয়ের সাতমাস পর বাচ্চচা হল। বুঝি না কিছু, না?’
‘দিপু।’ ধমকে উঠতে চেয়ে শ্রীমন্তর গলা দিয়ে কাতর মিনতির মতো হয়ে শব্দটা বেরোল। একগ্রাসে পোচটা মুখে পুরে সে ইশারায় জল চাইল।
বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক মাঝবয়সি স্ত্রীলোক ‘কী কচ্ছ গো সুদীপা…’ বলেই ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেল শ্রীমন্তকে দেখে।
‘মাসিমা, এখন ফিরছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার বড়দা।’ দিপু মুহূর্তে বদলে গিয়ে উচ্ছল গলায় বলল, ‘এই দেখুন শাড়ি এনেছে আর সন্দেশ।’
শাড়িটা তুলে মাসিমার হাতে দিয়ে সে সন্দেশের বাক্স খুলতে খুলতে বলল, ‘জানো বড়দা, মাসিমা গান জানেন, উনি বাবাকে গান গাইতে শুনেছেন, হ্যাঁ অ্যা অ্যা।’
দিপু সন্দেশের বাক্সটা মাসিমার সামনে এগিয়ে ধরল, ‘নিন নিন, না বললে শুনব না, আমার বাপের বাড়ির জিনিস-।’
মাসিমা ইতস্তত করে একটা তুলে নিল। ওর তোলার ভঙ্গিটা দেখে শ্রীমন্তর আবার মনে পড়ল অসীমাকে। ও কী আজই অকাদাদুর সঙ্গে কথা বলতে যাবে? যেতে বলার কথাটা না বললেই ভালো হত।
‘সুদীপা, তা হলে তো মন কষাকষির পালা শেষই হয়ে গেল, শাড়ি মিষ্টি নিয়ে বড়দাই যখন হাজির!’ মাসিমার কণ্ঠস্বরে উদবেগ অবসানের সুর। ‘আপনার বোনের মনে খুব কষ্ট ছিল, বাড়ির কেউ এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি বলে। যাক তাড়াতাড়িই যে আপনারা মেনে নিলেন এটাই সুখের। আমিও বলেছিলাম, মা দাদারা কতদিন আর পারবেন তোমাকে ত্যাজ্য করে রাখতে? প্রাণ ঠিক কাঁদবেই। শ্যামল ছেলে খুব ভালো, মনটা সাদা, বছর তিন দেখছি তো ওকে।’ সন্দেশটা মুখে না দিয়ে মাসিমা ধীর স্বরে যখন বলে চলেছে, শ্রীমন্ত অস্বস্তিতে তখন মেঝের দিকে তাকিয়ে। দিপুর চোখেমুখে এই খুশির আভা তার অর্ধেকটাই যে কৃত্রিম, তার কাছে এটা অসহ্য লাগছে। সম্পর্কের বাঁধন ছিঁড়ে দিপু বেরোতে পারেনি। বাড়ির লোক তাদের মেনে নিয়েছে এটা সবাইকে জানাবার দুর্বলতা থেকে তৈরি হল এই অভিনয়। অথচ বাড়ি এদের মানতে রাজি নয়। শ্রীমন্ত নিজেকেই দায়ী করতে লাগল এই মিথ্যা ধারণাটা এখানে বয়ে আনার জন্য। হাতে এই শাড়ি আর সন্দেশের বাক্সটা না থাকলে…।
