‘বাড়ির জন্য নয় রে, তোর জন্য!’
শ্রীমন্ত থলিটা বাড়িয়ে ধরল। দপ করে জ্বলে উঠল দিপুর মুখ। শ্রীমন্ত মুগ্ধ হয়ে মনে মনে বলতে বাধ্য হল, কী সুন্দর ওকে দেখতে। অথচ দিপুর দেহে অসাধারণ স্বাস্থ্যটুকু ছাড়া চলতি মানদণ্ডের সৌন্দর্য ওর মুখে নেই।
থলিটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়েই শাড়ি আর সন্দেশের বাক্সটা বার করল। শাড়ির পাট খুলে কাঁধের উপর ঝুলিয়ে দিপু আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘আঁচলটার কাজ খুব সুন্দর।…তুমি জানলে কী করে আমি হালকা জমির সঙ্গে হালকা পাড় পছন্দ করি! লক্ষ করেছ, না?…বাড়িতে না থাকলে কী হবে, সব কিন্তু তুমি ঠিকই নজর করো। ম্যাচ করে একটা ব্লাউজ পিসও আনলে না কেন?’
খুশিতে বকবক করে যাচ্ছে দিপু। মনে কোনো সংকোচ, ভয়ের লেশমাত্র নেই। আর শ্রীমন্ত গ্লানিবোধ করছে। মোটেই ওর কথা ভেবে, ওর জন্য যে কেনা নয়, এ খবর পেলে দিপার এই আনন্দ নিমেষে কালো হয়ে যাবে। যার জন্য কেনা সে কী এমন উচ্ছল হয়ে পড়ত? অসীমার গম্ভীর কঠিন মুখটা ঝলসে উঠত-‘উপহার! কীজন্য?’
‘বড়দা চা খাবে?’
‘খাব।… তোর রান্নাবান্না হয় কোথায়? ভালো কথা, এখন তোর পদবি কী?’
‘পদবি রায়। রান্নাবান্না আমি করি না। এই তো এখানে এলুম।’
কেরোসিন-স্টোভ, কেটলি নিয়ে ঘরের কোণে দিপু বসে পড়ল। কাজের সঙ্গে চলল তার কথা।
‘বাবুদার দর্জির দোকানের পাশে যে ভাতের হোটেলটা আছে, ওখান থেকে ডাল মাছ তরকারি দিয়ে যায়, ভাতটা আমি ঘরে করে নি। মাসকাবারি ব্যবস্থা। আর টুকটাক যা কিছু… মামলেট খাবে?’
‘না।’
‘কেন, খাও না!’ দিপু সরল চোখে শ্রীমন্তর মুখে তাকাল।
দিপু মনে করে নিতে পারে, সামাজিক স্তর থেকে ও নেমে গেছে বলে বড়দা তার হাতে খেতে চায় না। ওকে বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের হরিজন বানানোটা বন্ধ করতে হবে। জীবনে এই প্রথম ও আতিথেয়তার, গৃহিণীপনার সুযোগ পেয়েছে স্বাধীনভাবে। ওর উৎসাহে ভাটা পড়ুক শ্রীমন্ত তা চায় না।
‘দে। মামলেট নয়, পোচ কর। তেল-ঘি কম খাওয়াই ভালো।’ বলার সময় আবার অসীমাকে তার মনে পড়ল। মনে মনে হাসলও। ‘ভাজাভুজি মানে তেল-ঘি পেটে…’, অসীমা তাকে প্রভাবিত করছে কী!
‘ও তো কাঁচাই খায়। বলে এতেই নাকি বেশি উপকার, সত্যি?’
‘কী জানি।’
খাটে পা ঝুলিয়ে বসে শ্রীমন্ত লক্ষ করে যাচ্ছে। খ্যাচ খ্যাচ করেও মা ওকে দিয়ে ঘরের কাজ করাতে পারত না। আর এখন। নিজস্ব মালিকানা মানুষকে যে কাজের করে তোলে দিপুই তার একটা উদাহরণ।
‘তোর বর কোথায়?’ শ্রীমন্ত ‘জামাই’ শব্দটা ব্যবহার করল না। মনের কোথায় যেন বাধবাধ ঠেকল।
‘কাল রাতে শিলিগুড়ি গেছে, কালই ফিরে আসবে।’
‘শিলিগুড়ি!’ শ্রীমন্তর ভ্রূ কুঁচকে গেল। ‘শুনেছি মিনিবাসে কাজ করে।’
‘বাস তো বসে গেছে। মালিকদের সঙ্গে বোনাস, ছুটি, ডিউটি এসব অনেক কিছু নিয়ে ঝামেলা চলছে, না মিটলে বাস বেরোতে দেবে না…মাসের সব দিন তো কাজ থাকে না, ক-টা টাকাই বা হয়। তাতে কী চলে?’
‘তুই এইসব জানতিস?’ শ্রীমন্ত বোঝাতে চাইল এইরকম অবস্থা জেনেও বিয়ে করলি?
‘হ্যাঁ। আমাকে তো সবই বলেছে।’ দিপু কেটলি নামিয়ে গরম জলে চা ভেজাতে দিয়ে একটা সসপ্যান স্টোভে বসাল।
‘শিলিগুড়িতে গেছে কেন?’
‘মাল আনতে। এ মাসে তো এই নিয়ে তিনবার গেল। একা তো নয়, তিন-চারজন মিলে যায়।’
কেন যায়, কী মাল আনতে যায় শ্রীমন্ত তাই নিয়ে প্রশ্ন তুলল না। সে জানে কলকাতা থেকে বহু ছেলে চোরাচালানী জিনিস সীমান্তের কয়েকটা জায়গা থেকে নিয়মিত আনে। শুধু বলল, ‘খুব রিস্কি কাজ।’
‘হ্যাঁ, রিকস তো আছেই। দু-বার তো ওকে ধরেও ছিল, টাকা খাইয়ে ম্যানেজ করেছে। …টাকায় সব হয় বড়দা।’ ডিম ভেঙে সসপ্যানে ঢেলে দিপু কাজে ব্যস্ত থেকে কথাগুলো বলল। স্টোভ থেকে সেটা নামিয়ে রেখে সে ঘুরে বসল।
‘এখানে একটা খাবারের দোকান দেবে। ওর চেনা একজনের আলুর দম-পাউরুটির দোকান আছে টাউন স্কুলের রাস্তার উপর। লোকটা আমাশায় মরে গেছে। তার বউ এখন দোকান চালাচ্ছে। কিন্তু পারছে না চালাতে। জায়গাটা বেচে দিতে চায়। ও বলেছে নেবে, নিয়ে বেঞ্চি পেতে বড়ো সাইজের পুরি, শুকনো আলুর দম, মাংসের ঘুগনি প্লেটে করে বেচবে যাতে ভদ্রলোকও খেতে আসে। শালপাতাফাতা কী দাঁড়িয়ে খাওয়া আর চলে না। তোমায় কী বলব বড়দা, সস্তায় পেট ভরে, মুখেও স্বাদ লাগে এমন খাবারের যে কী ডিম্যান্ড তা বলা যায় না! তিনদিন আমি দাঁড়িয়ে লক্ষ করেছি, যে ক-টা খাবারের দোকান, তারা তো বেচে কূল পায় না। তুমি কী বল, লাভ হবে না? অবশ্য লোক রাখতেই হবে, দরকার হলে আমিও গিয়ে বসব।’ দিপু উত্তর পাবার জন্য আগ্রহ দেখাল না।
শ্রীমন্ত সন্ত্রস্ত চোখে তাকাল। তাদের বাড়ির মেয়ে টাউন স্কুলের রাস্তায় ঘুগনি, আলুর দম বেচবে? দিপু ভাবতে পারল কী করে? বিয়ে করে ওর চিন্তাভাবনায় এই পরিবর্তন এসেছে নাকি পরিবর্তনটা ঘটে গিয়েছিল বলেই এই বিয়েটা করল? রাস্তা দিয়ে বাড়ির, পাড়ার লোকেরা যেতে যেতে দেখবে বনেদি বাঁড়ুজ্যে বাড়ির মেয়ে ঘুগনি বেচছে! বাড়াবাড়িই করবে, বিয়েটার থেকেও।
‘লজ্জা প্রথম প্রথম করবে।’ চা ছেঁকে দিপু দুধ-চিনি মেশাচ্ছে। মুখে ভাবান্তর নেই। ‘দু-দিনেই অবশ্য ওটা কেটে যাবে। ও বলেছে দু-তিনমাস প্রচণ্ড খেটে দাঁড় করাতেই হবে। ঝাল কষা মাংসটা যদি স্টার্ট করতে পারি তাহলে বছরখানেক পরই…’ কেউ চায়ের কাপ শ্রীমন্তর হাতে তুলে দিল।
