যাত্রীদের ভিড় ক্রমশই বাড়তে বাড়তে একসময় বিমল চক্রবর্তী আড়ালে পড়ে গেল। তরুণীর সরু ঘাড় আর মাথাটি শ্রীমন্ত দেখতে পাচ্ছে কিন্তু দ্বিতীয়বার আর দেখার ইচ্ছা হচ্ছে না। তার চোখের উপর দিয়ে অসীমা কয়েকবার চলাফেরা করে গেল। বাড়ি ফিরে খবর পেয়ে অসীমা আজই কী অকাদাদুর সঙ্গে দেখা করতে যাবে? না গেলেই ভালো, কেননা আজ সে খুদিনগরে ফিরবে না। সুতরাং ওকে দেখার সুযোগ সে হারাবে। বিকেলের দিকে খবরের কাগজের অফিসগুলোয় সে তদবির করতে যাবে, ফোটোগ্রাফার দু-জনের সঙ্গেও দেখা করে জেনে নেবে ছবিগুলো কবে পাওয়া যাবে।
শ্যামবাজারের মোড়ে বিমল চক্রবর্তী ও সেই তরুণী নেমে গেল। কয়েক মিনিট পর শ্রীমন্ত নামল হাতিবাগানে। এখন প্রায় এগারোটা, গিজগিজে ভিড়। ফুটপাতে পসরা এমনই সাজানো যে হাঁটাচলা দায়। এরই মধ্য দিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত হেঁটে সে স্টার থিয়েটার ছাড়িয়ে কর্পোরেশনের বাড়ির সামনে পৌঁছে ট্রাম রাস্তা পার হল। আর একটু হেঁটে ডানদিকের একটা গলিতে ঢুকল পথ সংক্ষেপ করতে। দুটো মোড় ঘুরে সে এসে পড়ল একটা মুদির দোকানের সামনে।
দোকানটা ছাড়িয়ে এগোতে গিয়েই সে থমকে পড়ল। শ্রীদুর্গা ভাণ্ডার। পাশ দিয়ে হাত চারেক চওড়া সিমেন্টের গলি। দিপু এখন এই গলির মধ্যে আঠারো নম্বর বাড়িতে বাস করছে। বাড়িটা সে বারো-তেরো বছর আগে শেষবারের মতো দেখেছে যখন চোর-পুলিশ খেলায় এই গলি দিয়ে ছুটতে হত পুলিশের তাড়া খেয়ে। একতলায় ইটের গাঁথুনি, দোতলায় কাঠের মেঝে, টিনের দেওয়াল, বাড়ির চালাটা করোগেটেড টিনের। একটা কাঠের বারান্দা আছে দোতলায়।
শ্রীমন্ত গলিতে ঢুকল। দিপুর সঙ্গে দেখা করে তাকে জানতে হবে, কেন সে এমন একটা করে বসল। জয়ন্ত যেসব কারণে লজ্জায় অপমানে মুষড়ে পড়েছে শ্রীমন্ত সেই ছোটো জাত, কনডাকটর, অশিক্ষিত বা মাঠকোটা নিয়ে মোটেই ক্রুদ্ধ বা দুঃখিত নয়। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা কী ভাবছে তাই নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বিয়ে করতে যাচ্ছে, এই ব্যাপারটা চেপে রেখে সে কী এটাই বোঝাল না যে, তোমাদের কাউকে বিশ্বাস করি না, পরোয়া করি না!
বাড়িটার পাশের দিকে ছোটো সদর দরজা। শ্রীমন্ত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করল। দরজা থেকেই চওড়া রক, তার পাশে পরপর ঘর এবং দোতলার সিঁড়ি। রকেই রান্না হচ্ছে। দিপু একতলায় না দোতলায় থাকে?
উবু হয়ে মাঝবয়সি এক স্ত্রীলোক রান্না করতে করতে মুখ ফিরিয়ে তাকাল শ্রীমন্তর দিকে। আদুড় পিঠে কাপড় টেনে ঢাকতে ঢাকতে বলল, ‘কাকে খুঁজছেন?’
‘দিপু নামে একটা মেয়েকে…নতুন বিয়ে হয়েছে।’
‘ওই সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে যান।’
সরু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে শ্রীমন্ত দোতলায় উঠে এল। টানা বারান্দা, তার একধারে কয়েকটা ঘর। সে কাউকে দেখতে পেল না। দিপু কোন ঘরটায় থাকে?
‘দিপু।’ নীচুগলায় শ্রীমন্ত ডাকল।
‘কে?’ কাছের ঘরটা থেকেই দিপুর গলা ভেসে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে বেরিয়ে এল।
‘বড়দা!’ বিস্ফারিত চোখে দিপু তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিই বুঝিয়ে দিচ্ছে একটা ট্রামগাড়ি দোতলায় উঠে এলেও সে এত অবাক হত না।
দিপুকে শেষ যা দেখেছে, এখন শ্রীমন্তর ঠিক তেমনই লাগছে, শুধু সিঁথিতে চওড়া করে দেওয়া সিঁদুরটাই যা নতুন। এখন বউ হয়েছে, এটা ঘোষণা করতে যেন ওর ভালো লাগছে।
‘বড়দা তুমি! আমি তো ভাবতেই পারছি না। ঘরে এসো, ঘরে এসো।’
তক্তপোশে জমকালো নকশার বেডকভারে ঢাকা বিছানা, দেওয়ালে আয়না, ডিম্বাকৃতি কোয়ার্জ ঘড়ি। কাচের পাল্লার নীচু আলমারি, তার উপর একটা পোর্টেবল টিভি সেট, প্রসাধনের কিছু কৌটো আর শিশি, একধারে আলনা, জলচৌকিতে বাসন আর কেরোসিন-স্টোভ। থালা দিয়ে ঢাকা একটা বড়ো বালতি, টেবল ফ্যান। বাঁশের চ্যাটাইয়ের সিলিং আর টিভি সেটের পাশে নিকেলের ফ্রেমে দাঁড় করানো একটা ফোটো, যাতে ঘোমটা দেওয়া দিপু ও একটি যুবক। শ্রীমন্ত ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে অবশেষে বোনের মুখে তাকাল।
দিপু উৎকণ্ঠা নিয়ে লক্ষ করছে দাদাকে। শ্রীমন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘আমাদের বাড়ির থেকে ভালো।’
ঘরের দু-পাশে তাকিয়ে নিয়ে দিপু বলল, ‘তুমি তো ওকে দ্যাখোনি, ওইটে ওর ছবি।’
শ্রীমন্ত এগিয়ে এসে আলমারির সামনে দাঁড়াল। শ্যামল অবশ্যই সুদর্শন। চোখা, বুদ্ধিদীপ্ত, কষ্টসহিষ্ণু এক বাস্তববাদীর মুখ। গলায় ও কাঁধে শক্তির আভাস আছে। চোখের স্বপ্নাতুর ভাবটা বোধ হয় ছবি তোলার জন্যই এসে গেছে।
দিপু সাগ্রহে শ্রীমন্তর মুখভাব লক্ষ করে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার মুখে হাসি ফুটল। তারপর শ্রীমন্তর হাতের পলিথিন থলিটার দিকে তার চোখ পড়ল।
‘এতে কী আছে?’ দিপুর স্বরে প্রত্যাশার মতো কিছু একটা যেন শ্রীমন্তর কানে ঠেকল। প্রথমে সে থলি ধরা হাতটা গুটিয়ে ফেলেছিল। এসব অসীমার কথা ভেবে কেনা।
‘বাড়ির জন্য?’ দিপুর স্বর নিস্পৃহ। এটা শ্রীমন্তর কানে বাজল। চঞ্চল, ছটফটে, চটুল স্বভাবের। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে একটা বিয়েই শুধু করেছে, আর কিছু তো করেনি। এই তো দিব্যি সংসার পেতেছে একটা ছেলের সঙ্গে। বাড়ি থেকে দেখেশুনে বিয়ে দিলেও তো এই একইরকম হত! তফাতের মধ্যে ছেলেটা হত বামুন, গ্র্যাজুয়েট, আর কেরানি।
