‘এই ভদ্রলোক এসেছেন খুকুর খোঁজে।’
অসীমার দাদা ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকে গেল। বৃদ্ধ বললেন, ‘এখনই ফিরবে ও। একটু অপেক্ষা করবেন কী?’
‘এই দুটো জিনিস ওঁকে দেবার ছিল আর কিছু কথাও বলার ছিল।’ শ্রীমন্ত তার হাতের পলিথিন থলিটা দোলাল। ওর মধ্যে আছে কুড়ি টাকার সন্দেশ আর দুশো দশ টাকা দিয়ে খুদিনগর সুপার মার্কেটে কেনা একটা টাঙ্গাইল। ব্রজরাখালের দেওয়া তিন হাজার টাকা থেকে এটাই প্রথম খরচ। বাকি টাকাটা এখন তার প্যান্টের পকেটে রয়েছে।
‘তা হলে বসুন।’
বৃদ্ধ একটা টুল আনলেন ঘর থেকে। দালানের নীচে বাড়ির ছায়ায় জমিতে টুলটা রেখে বললেন, ‘এখানেই বসুন, হাওয়া আছে।’
‘আমাকে কলকাতায় যেতে হবে।’ টুলে বসে শ্রীমন্ত বৃদ্ধকে ভালো করে লক্ষ করল। গত রাতে যে লুঙ্গি আর শার্ট দেখেছিল পরনে তাই রয়েছে। স্বাস্থ্যের মধ্যে অভাবের হস্তাবলেপ স্পষ্ট হলেও মুখভাব ও আচরণে শিক্ষা আর ভদ্রবোধ পুরোনো জের টেনে রেখেছে।
কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে? জিনিস দুটো এঁর হাতে দিয়ে গেলেও চলে। কিন্তু শ্রীমন্তর অন্তরের গভীরের ইচ্ছাটা, অসীমাকে একটু দেখা আর কথা বলা, সেটা তা হলে অপূর্ণ থেকে যাবে। কাল রাতে অকাদাদুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর সে অসহনীয় একটা শূন্যতার মধ্যে নিজেকে ভেসে যেতে দেখেছিল। ক্রমশ সে আবিষ্কার করছিল, যে খুঁটিটার সঙ্গে শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের সূক্ষ্ম সম্পর্কে সে বাঁধা ছিল সেই খুঁটিটাকেই সে নিজের হাতে উপড়ে ফেলেছে। অকাদাদুর স্নানঘরের দিয়ে এগিয়ে যাওয়া আর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার দৃশ্যটাই বার বার তার চোখের সামনে ফুটে উঠছিল।
শূন্যতার মধ্যেই সে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে হাত বাড়িয়ে প্রথমেই পেয়ে গেল অসীমাকে। সে অবাক হয়ে গিয়েছিল। এত কিছু থাকতে শুধু অসীমাই বা কেন তার চেতনায় ভেসে উঠল! ওর কঠিন অথচ সহজ কথাবার্তা, হাবভাবের মধ্যে, কণ্ঠস্বরে বা পদক্ষেপে সে কোনো ঋজু সততার, মর্যাদাকর অস্তিত্বের আভাস কী পেয়েছে? কিন্তু সে নিজেও কী এখন দূষিত পরিবেশের সঙ্গে চমৎকারভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয়নি? তা হলে কেন নির্মল বাতাসের ঝলকের জন্য তার এত আকুলতা!
হঠাৎ সে সচেতন হয়ে পড়ল থলির মধ্যেকার জিনিস দুটি সম্পর্কে। অসীমাকে সন্দেশ আর শাড়ি উপহার দিতে যাওয়ার মতো নির্বোধ সে এত অল্প সময়েই হয়ে গেল কী করে! শ্রীমন্ত এখন নিজেকে নিয়ে গভীর লজ্জা বোধ করল। বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ না পেলে এমন দুঃসাহস বোধ হয় করা যায় না। এটা যে স্পষ্টতই ঘুস আর অসীমা শুধু প্রত্যাখ্যানই করবে না, তার সম্পর্কেও যে একটা হীন ধারণা পোষণ করবে, তাতে শ্রীমন্ত কোনোরকম অস্পষ্টতা পাচ্ছে না। আসলে এইভাবে কার্যোদ্ধার করে করে এটা বোধ হয় তার অভ্যাসের অন্তর্গত হয়ে গেছে।
‘আমি আর অপেক্ষা করব না, জরুরি কাজ রয়েছে, দেরি হয়ে যাবে। আপনি ওঁকে বলে দেবেন’, শ্রীমন্ত দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ‘অক্ষয়ধন মিত্র এখন ভালোই আছেন, উনি যদি কথা বলতে চান তা হলে গিয়ে কথা বলতে পারেন।… নামটা মনে থাকবে? অক্ষয়ধন মিত্র।’
‘মনে থাকবে।’ বৃদ্ধ ঘাড় নাড়লেন।
‘আর আমার নাম শ্রীমন্ত ব্যানার্জি, ওনারই নাতি।’
শ্রীমন্ত এরপর হাতের থলিটা গুটিয়ে ছোটো করে, দ্রুত পায়ে অসীমাদের বাড়ির চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে এসে স্বস্তি বোধ করল। বাসরাস্তার দিকে হাঁটার সময় তার পাশ দিয়েই সাইকেলে চলে গেল অসীমার দাদা। মুখ ঘুরিয়ে একবার তার দিকে তাকালও। বোধ হয় তার হাতের থলিটাকেই দেখল।
একটা বি বা দী বাগ-গামী মিনিবাস পেয়ে শ্রীমন্ত উঠে পড়ল। বাসটা খুদিনগর থেকে ছাড়ে। এখনও ভিড় হয়নি। পিছনের সিটে পাঁচজন বসার কথা কিন্তু আজকাল বসছে ছ-জন। নিজেরাই নড়েচড়ে শ্রীমন্তর জন্য জায়গা বার করে তাকে ষষ্ঠ ব্যক্তি করে নিল। বসার পর বাসের অন্যান্য লোকেদের দিকে তাকাতে গিয়ে চোখে পড়ল বিমল চক্রবর্তী বসে আর তার পাশে জানলার ধারে এক রুগণা তরুণী চোখে পুরু কাচের চশমা। বিমল তার সঙ্গে কথা বলল দেখে আর উঁচু কপালে পিছিয়ে থাকা চুল, নাক ও চিবুকের গড়ন থেকে শ্রীমন্ত আন্দাজ করল ওর কোনো আত্মীয়াই হবে। হয়তো মেয়ে।
বিমল চক্রবর্তী খুদিনগরে বিমল বা বিমলদা। প্রভাবশালী নেতা, পুর এলাকায় অধিকাংশ মানুষ ওকে চেনে। চল্লিশ বছর পার্টি করছে, চাকরি করে রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদে, অফিসে যায় ইচ্ছামতো। বারো নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার, থাকে সঙ বাজার এলাকায়। ওর ছ-টি মেয়ে, তাদের একজনকেও সে দেখেনি।
ওর পাশের সিটটায় বসতে পারলে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেত। শ্রীমন্তর দরকার হবে ওর সঙ্গে দেখা করার। তারই প্রস্তাবনাটা ওর পাশে বসে এখন করা যেতে পারত। মামাকে সে বলেছে পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে দরকার বিমল চক্রবর্তীদের সঙ্গে হাত মেলানো। এই মেলাবার দায়িত্বটা সে নিয়েছে। রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং দায়। সফল হতে পারলে নিশ্চয় পুরস্কার সে দাবি করতে পারবে। প্রেস, বাস, বস্তি, বাজার, এর যেকোনো জায়গায় তিনটে ভাইয়ের কাজের ব্যবস্থা করার কথা সে ইদানীং ভাবতে শুরু করেছে। সোজাসুজি চাইলে মামা কাজ দেবে না। কিছু না পেলে ব্রজরাখাল কিছু দেয় না।
ব্রজরাখালের পার্টি নেই, ছেলেও নেই কাজ করার। টাকা দিয়ে ঠিকে কাজ করায়। গতবার জেতার জন্য কত টাকা দিয়ে বিমল চক্রবর্তীর কর্মীদের ‘উদাসীন’ রেখেছিল ব্রজরাখাল তা শ্রীমন্তর কাছে ভাঙেনি। এবার ব্যাপারটা অন্যরকম। বিমল চক্রবর্তী সম্পর্কে টাকাপয়সা সংক্রান্ত দুর্নীতির কথা শোনা যাচ্ছে, লোকাল কমিটিতে ওর বিরুদ্ধে একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, রাজ্য কমিটিতে ওর খুঁটিটা নাকি নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। তা হলেও লোকটির প্রভাব কিছু কমেনি। ওর সঙ্গে শ্রীমন্তর মুখচেনার থেকে একটু বেশিই আলাপ হয়েছিল, যখন শিরদাঁড়ায় একটা ব্যথার জন্য সে রামানন্দর কাছে যোগব্যায়ামের তালিম নিতে আসত। বিমল চক্রবর্তী জানে সে ব্রজরাখালের ভাগনে, এখন দেখা হলে চোখ নাচিয়ে মাথা হেলায়।
