‘আপনার আজকের বক্তৃতায় ওইটে দারুণ বলেছেন, রাজনীতিকরা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে।’
‘তুই সবটা শুনেছিস? আমার তো মনে হচ্ছে খুব এলোমেলো বলেছি। যা সব বলতে বলেছিলিস তখন কিছুতেই যেন মনে করতে পারছিলাম না আর ভয় হচ্ছিল তোর বকুনি নির্ঘাত খেতে হবে।’
‘কিন্তু পরিবেশ দূষণ নিয়ে এত যে আপনি ভাবছেন, তাতে লাভটা কী? জীবনের এই সময়ে তো মানুষ ভগবানের নাম করে, তীর্থধর্ম করে, নয়তো স্মৃতিকথা লেখে!’
‘আমি তো ভগবানে বিশ্বাস করি না কাজেই নাম করার প্রশ্নই ওঠে না আর স্মৃতিকথাও অনেকে লিখে ফেলেছে। আমার কলম ধরার কোনো দরকার নেই। নিজের পিঠ নিজে চাপড়াতে যে স্কিলটা লাগে তা আমার নেই। এক্ষেত্রে খাওয়া আর ঘুমোনো ছাড়া এই বয়সে আমার আর কিছুই করার থাকে না।’
‘কিন্তু বিপ্লববাদকে স্বীকার করেছিলাম কী শুধুই দেশ স্বাধীন করার জন্য? যেই দেশ স্বাধীন হল অমনি আমি আর বিপ্লবী রইলাম না?…আসলে সত্যিই আমি আর ছিলাম না। হাভাতে-হ্যাংলারা এমনভাবে দেশটার উপর ঝাঁপিয়ে খুবলে খুবলে খেতে শুরু করল…’
‘ব্রজরাখাল মুখুজ্জের মতো লোকেরা?’
অক্ষয়ধন মিটমিট করে হেসে, ঠোঁটে আঙুল রেখে শ্রীমন্তকে শাসন করলেন। ‘মনে রাখিস ওর দয়াতেই তুই খাচ্ছিস পরছিস।’
‘ব্রজমামারা যখন দেশটাকে খোবলাচ্ছিল তখন আপনি কী করছিলেন?’ শ্রীমন্ত পালটা মিটমিট হাসল।
‘কোণঠাসা মনে হচ্ছিল কিন্তু কিছু করার ছিল না কেননা আমার কোনো দল, পার্টি নেই। লোকে পড়ে না এমন পত্রপত্রিকায় বড়োজোর দু-চারটে প্রবন্ধ লিখতে পারতাম কী কোনো ক্লাব ঘরে বসে গোটা কুড়ি লোকের কাছে আমার চিন্তা প্রকাশ করতে পারতাম। তার বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এত তাড়াতাড়ি রাজনীতির চরিত্রটা যে বদলে যাবে ভাবতে পারিনি। এত স্থবিরতা এত নির্বুদ্ধিতা, এত অবক্ষয় আর অচেতনতা কেন গ্রাস করবে আমাদের?’
‘তাই আপনি আর বিপ্লবী রইলেন না! ব্রজমামাদের হাত থেকে দেশটাকে স্বাধীন করার যে কাজ সামনে রয়েছে সেটাকে পাশ কাটিয়ে আপনি এখন পরিবেশ দূষণ নিয়ে জাগরণ ঘটাতে চাইছেন…একেই কিন্তু পলায়নি মনোবৃত্তি বলে।’ শ্রীমন্ত ঢোলকে চাপড় দেওয়ার মতো বিছানায় তালু বসাল শব্দ করে। টেবলে একটা ছোট্ট কৌটো দেখে সে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। ঢাকনা খুলে আঙুলে বাছাবাছি করে একটা লবঙ্গ নিয়ে মুখে ফেলতে গিয়েই চোখ পড়ল অকাদাদুর দিকে।
লকআপে মার খাওয়ার যন্ত্রণা চাপার চেষ্টার মতো নয়, দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে কেউটের ফণার সামনে দাঁড়ানোর মতোও নয়, অকাদাদুর মুখটা কালো হয়ে রয়েছে অসহ্য লজ্জা আর অপমানের ছায়ায়। শ্রীমন্ত লবঙ্গটা আর মুখে দিতে পারল না। তার বুকের মধ্যে হায় হায় করে উঠল। এ কী কথা বলে ফেললাম! বাহাদুরি করে এতটা বেড়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল? সৎ, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক এক বৃদ্ধ বিপ্লবীকে তো সে একটি শব্দে প্রায় হত্যাই করল।
‘দাদু, আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই কিছু না ভেবে, ইডিয়টের মতো মন্তব্য করেছি।’ শ্রীমন্ত ভেবে পাচ্ছে না; অকাদাদুর পায়ে সে হাত রাখবে কি না।
অক্ষয়ধন হাসার চেষ্টা করলেন, হাসলেনও। ‘হয়তো ঠিকই বলেছিস। দেশটাকে আবার স্বাধীন করার কাজ সামনে রয়েছে, এখন অন্য কিছু নিয়ে মেতে ওঠাটা, একরকম তো পালানোই।’
‘না না দাদু, পরিবেশও একটা অত্যন্ত জরুরি সমস্যা, ভয়ংকর সমস্যা, সারা পৃথিবীর সমস্যা। এটা নিয়ে আমাদের দেশের লোক একদমই মাথা ঘামাচ্ছে না। আপনি যেসব কথা-‘
শ্রীমন্ত যখন কথাগুলো বলছিল, অক্ষয়ধন তখন খাট থেকে নেমে স্নানঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ভিতরে ঢুকে তিনি শ্রীমন্তর কথার মাঝেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন একবারও পিছনে না তাকিয়ে।
অসীমা পালের বাড়ির সামনে শ্রীমন্ত যখন পৌঁছল তখন সকাল প্রায় ন-টা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে বাড়ির কোনো লোকজন দেখতে পাচ্ছে না। আগলটার কাছে গিয়ে বন্ধ লোহার হুড়কোটা টেনে যখন খুলছে তখন সাইকেলে একজন এসে নামল।
‘কাকে চাই?’ লোকটি সাইকেল হাতে ধরে এগিয়ে এল। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স, আধময়লা প্যান্ট ও বুশ শার্ট, হাওয়াই চটি। শীর্ণ গড়ন। মুখের আদলে অসীমার আত্মীয়ই মনে হয়। সাইকেলটার সঙ্গে বাড়ির বাইরের চেহারার মিল রয়েছে।
‘অসীমা পালকে একটু দরকার।’
‘কোথা থেকে আসছেন…আমি ওর দাদা।’ লোকটির স্বর কর্কশ তবে সেটা জন্মগত। চোখে-মুখে কোনো অপ্রসন্নতা নেই কিন্তু মার্জিত ভঙ্গি রক্ষা করার দায়ও মানা হচ্ছে না।
‘আমি আসছি খুদিনগর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার ব্রজরাখাল মুখুজ্জের কাছ থেকে। কাল ওখানকার স্কুলের-।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি, রজতজয়ন্তীর সভা ছিল তো। অসীমা গেছল রিপোর্ট করার জন্য, গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে।’
‘আমিই পৌঁছে দিয়ে গেছি।’ শ্রীমন্ত বিনীত স্বরে পেশ করল। গাড়িতে পৌঁছে দেওয়াটা, বলার মতো একটা সম্মানবৃদ্ধিকর ঘটনা এদের কাছে। শ্রীমন্ত দ্রুত আঁচ করে নিল, অসীমাদের আর্থসামাজিক অবস্থান কতটা নীচের দিকে।
‘অসীমা তো সকালে টিউশুনিতে যায়, ফিরেছে কি না…আসুন আপনি।’ অসীমার দাদা ভিতরে যেতে যেতেই চেঁচাল, ‘খুকু ফিরেছে নাকি মা?’
‘না তো, কেন?’ ঘর থেকে উত্তর এল পুরুষের গলায় এবং বেরিয়ে এলেন গত রাতে দেখা বৃদ্ধ লোকটি।
