শ্রীমন্ত খাটের উপর এসে বসার আগে স্নানঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। মেঝেয় ট্যাবলেট-মোড়কের ছেঁড়া টুকরো পড়ে। বোধ হয় ছুড়ে চুবড়িতে ফেলতে গিয়ে পড়েনি, সে তুলে নিয়ে চুবড়িতে ফেলল।
‘কিছুই নয়। তলপেটটা কেমন যেন টাইট লাগছিল, বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল।’
‘একটা ট্যাবলেট এখুনি বোধ হয় খেয়েছেন।’
‘ঘাড়ের ব্যথাটা কমছে না দেখে খেলাম। …যাক গে, পৃথিবীতে কী ঘটছে সেই খবর দে।’
‘আপনি দু-টো খবরের কাগজ রোজ তন্নতন্ন পড়েন, আমি একটা। খবর তো আপনিই দেবেন।’
‘একই খবর, পঞ্জাবে টেররিস্টরা গুলি করে লোক মারছে এখানে খ্যাপা বাঙালিরা গণপিটুনিতে লোক মারছে।’
‘আপনারাও তো টেররিস্ট ছিলেন।’
‘আমি ছিলাম রেভেলিউশনারি। এর সঙ্গে টেররিজমের বিরাট প্রভেদ। রামুদা ছিল টেররিস্ট। পিস্তল নিয়ে মানুষ… থাক ওসব কথা।’
‘থাকবে কেন, বলেই ফেলুন না।’ শ্রীমন্ত একটা বাড়তি বালিশ টেনে, বগলের তলায় রেখে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।
‘দাদামশাই কী করত বলুন তো? দেশ স্বাধীন হবার আগেই নাকি বড়োলোক হয়ে গেছলেন… মা-র কাছে শুনেছি।’
শ্রীমন্ত লক্ষ করল, শোনামাত্র অকাদাদুর কপালে ভাঁজ পড়ল। ধূসর মণি দুটো মুহূর্তের জন্য ছোটো হয়ে গেল, ঠোঁট দুটো চেপে ধরলেন। এই সব কিছুই যেন, অতীতের দিকে স্মৃতিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা থেকে তৈরি হওয়া। অকাদাদুর মনে রাখার ক্ষমতাটা প্রচণ্ড। শ্রীমন্ত বহুবার তার প্রমাণ পেয়েছে।
‘তোর মা, সুপ্রভা, যখন জন্মাল তখন আমি হিজলি জেলে। আমাদের ‘সি’ ব্লকে ছিল হরেন, খুব ভালো স্বভাবের ছেলে, বছর একুশ-বাইশ, বি এ পড়তে পড়তে এ দিকে চলে আসে। জেলে গুলি চলল, ষোলোই সেপ্টেম্বর, বুধবার।’
‘বুধবার না মঙ্গলবার, ঠিক জানেন?’
‘জানি, কারণ হরেন একটি মেয়েকে ভালোবাসত, তার দেখা করতে আসার দিন ছিল বৃহস্পতিবার। কিন্তু হরেন তখন জেল হাসপাতালে। আগের দিন বুধবার রাতে একদল সিপাই জেলের মধ্যে বেধড়ক লাঠি পেটা করে, গুলিও ছোড়ে, তাতে সন্তাোষ মিত্তির আর তারকেশ্বর সেনগুপ্ত মারা যায়। হরেনের মাথায় কাঁধে লাঠি পড়ে। অজ্ঞান অবস্থায় ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার মেয়েটি এসেছিল। ওই সঙ্গে বরিশালের দুই ভাই, কালিবিলাস আর শ্রীমন্তর বিধবা মা-ও এসেছিলেন ছেলেদের সঙ্গে দেখা করতে। তখন তো আর আজকের মতো জেলখানার অত্যাচারের খবর বাইরে প্রকাশ পেত না! সেই রাতের লাঠি, গুলি, মৃত্যুর ঘটনার কথা সব লিখে, তারকেশ্বরদার মুখের একটা স্কেচও করে ফেলা হয়। দুটোই লুকিয়ে মেয়েটির হাতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওখানে একজন গার্ড বোধ হয় সন্দেহ করে কিছু একটা ওর হাতে লুকিয়ে দেওয়া হল আর মেয়েটিও সেটা বুঝতে পেরে ধরে নেয় তার বডিসার্চ করা হতে পারে। তাই সে বুদ্ধি করে তক্ষুনি শ্রীমন্তর মায়ের হাতে কাগজ দুটো পাচার করে দেয়। তিনি সেটি আনন্দবাজারে পৌঁছে দেন। খবর ছাপা হতেই তো সারা দেশে তুমুল কাণ্ড, বিরাট বিক্ষোভ শুরু হল, রবীন্দ্রনাথ ‘প্রশ্ন’ কবিতাটাও লিখে ফেললেন।…সুপ্রভা জন্মায় গুলি চলার পরের বুধবার, তেইশে।’
অক্ষয়ধন কাগজটা তুলে চোখের সামনে ধরে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘তোর মা আর কী বলেছে?’
‘বাবার সম্পর্কে মেয়ে আর কী বলবে। তবে আমার বাবার কাছে শুনেছি, বিপ্লব-টিপ্লব সব বাইরের ভড়ং আসলে উনি ডাকাতি করে টাকা করেছিলেন। তাই দিয়েই বিষয়-সম্পত্তি, ব্যাবসা।’ শ্রীমন্ত হালকা সুরে, মজার কথা বলার মতো ভঙ্গিতে বলল।
কাগজে চোখ রেখে অক্ষয়ধন স্মিত হাসলেন মাত্র কিন্তু কপালের চামড়া কুঁচকে রইল।
‘বাবা অবশ্য শ্বশুরের উপর খুব চটা ছিল। বানিয়ে বানিয়েও বলতে পারে। দাদু তো মেয়েকে বিষয়-আশয়, টাকাপত্তর কিছুই দিয়ে যাননি!…দিয়ে যেতে পারতেন। জামাইকে না হোক, মেয়েকে কিছু দিতে পারতেন তাহলে আজ আর আমাদের এমন দুর্দশার মধ্যে কাটাতে হত না।’ বলতে বলতে শ্রীমন্ত উত্তেজনা বশে উঠে বসল। ‘আমার বোনের একটা ভালো ছেলের সঙ্গে তাহলে বিয়ে দিতে পারতাম।’
অক্ষয়ধনের চোখ কাগজেই আটকে রইল। শ্রীমন্ত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এল।
‘যাক গে এসব কথা, বোনের বিয়ে আর দিতে হবে না, সে নিজেই বিয়ে করে ফেলেছে।’
‘কবে করল! কাকে?’
‘এই দিন দুই আগে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাড়ারই একটা ছেলেকে, মিনিবাস কনডাকটর, জাতে ছোটো…সেটা অবশ্য কিছু নয়। একদিক থেকে ভালোই হল, এমনি বিয়ে দিতে হলে যে টাকা আমাকে খরচ করতে হত সেটা বেঁচে গেল।’ শ্রীমন্ত হাসার চেষ্টায় মুখ থেকে খকখক আওয়াজ বার করল।
অক্ষয়ধন কাগজ থেকে চোখ তুলে ধীর স্বরে বললেন, ‘কেউ যদি নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করে তো করুক না। তোর দিদিমাও তো নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করেছিল, বাড়ির সবার অমতে। রামুদা ওর থেকে অন্তত কুড়ি বছরের বড়ো।’
‘আপনারও মত ছিল না?’
অক্ষয়ধন চুপ করে থেকে শ্রীমন্তর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘কি, আপনারও মত ছিল না?’
‘ছিল না।’
‘বয়সের তফাতের জন্য?’
‘না, অন্য কারণে…দরকার কী ওইসব পুরোনো কথা এখন তুলে। যারা বিয়ে করেছে তারা যদি সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে তাহলে ভালো বিয়েই বলতে হবে। কিছুদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে দেখ ওরা কেমন রয়েছে।’
অক্ষয়ধনের স্বর ও বসার ভঙ্গি যেভাবে বদলাল তাতে শ্রীমন্ত বুঝল এই বিষয়ে আর কোনো কথা উনি পছন্দ করবেন না। সে নিজেও বসা থেকে আবার বালিশ আঁকড়ে কাত হয়ে পড়ল।
