‘লোকটা যে ইনফ্লুয়েন্সিয়াল তা তুমি জানো। ওর পকেটে তিনটে ভোট, এবারও তোমার চেয়ারম্যান হওয়া আটকে দিতে পারে, দেবেও।’
ব্রজরাখাল মাথা নামিয়ে টেবলে আঙুলের টোকা দিচ্ছেন। শ্রীমন্ত বুঝল, আত্মম্ভরিতাকে ডুবিয়ে দিয়ে এবার ভেসে উঠেছে লোভ। সেটাকে আরও ভাসিয়ে তোলা দরকার বলে তার মনে হল।
‘এখন কুড়ি হাজার টাকা কাঠা ওই জমির। সামনে একটা দাতব্য চিকিৎসালয় করে দিয়ে পিছনে একটা নার্সিংহোম করো, এই অঞ্চলে তো একটাও নেই, এখন ভালো ব্যাবসা। বাচ্চচাদের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম কেজি স্কুল করো, ভালো চলবে, ভালো আয় হবে। স্বাস্থ্য বা শিক্ষার নামে আন্দোলন করে ক্লাবকে হটাবার জন্য জনসমর্থন নিতে হবে। রিয়েল পলিটিসিয়ানের মতো ঝগড়াঝাটি সরিয়ে এবার কাজে নাম।’
‘কী কাজ?’ ব্রজরাখালের গলা খুবই নরম। মনে হচ্ছে একটা সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ফেলেছেন।
‘পথের কাঁটা সরিয়ে দাও….বিমল চক্রবর্তীদের সঙ্গে হাত মেলাও, ওর প্রাপ্য মিটিয়ে দাও।’
‘তুই তা হলে ওর সঙ্গে কথা বল।’
‘বেশ, বলব।’ শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল।
‘রামানন্দর যোগ ব্যায়াম স্কুলটা তোলা সহজ কাজ হবে না, ওটা থেকে ভালো টাকা কামায়।’ ব্রজরাখাল তাঁর দুর্ভাবনাটা জানালেন।
‘এ নিয়ে পরে ভাবা যাবে। রামানন্দ সহজে ছাড়বে কেন, ওকেও কিছু দিতে হবে। অনেককেই কিছু কিছু দিতে হবে।’
‘বাবা যে কেন ক্লাবটাকে বসিয়ে গেল! এখন খেলার মাঠ চাই বলে যদি পালটা আন্দোলন হয়?’ ব্রজরাখাল আক্ষেপ জানিয়ে ভীত চোখে শ্রীমন্তর দিকে তাকালেন।
‘হলেও টিকবে না। আমাদের খেলাধুলোর হাল দেখে বুঝতে পারো না এটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। খেলার জন্য একজনও ঝান্ডা তুলবে না, তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।’
ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও শ্রীমন্ত ফিরে এসে হাসিমুখে বলল, ‘তোমার বলাটা বেশ ভালো হয়েছে, লোকে মন দিয়ে শুনছিল।’
হাসিতে ব্রজরাখালের মুখ ভরে গেল। প্রশংসা নীরবেই গ্রহণ করে শুধু গলাখাঁকারি দিলেন।
‘অন্যরা কে কেমন বলল? আমি সবার বক্তৃতা শুনিনি।’
‘ভালোই বলেছে। ডি এম ছোট্টর ওপর সুন্দর বললেন, ডিস্ট্রিক্ট স্কুল ইন্সপেক্টরও ভালো বললেন…’ ‘আচ্ছা অকামামা কী আজেবাজে কথা শুরু করলেন বল তো? তোর কথাতেই ওঁকে মঞ্চে রাখলাম কিন্তু-?’ ব্রজরাখাল জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
‘খুব ভালো বলেছেন। এইরকম বক্তৃতাই তো চাই। তোমার ভালোমন্দ লাগা দিয়ে কী এসে যায়, ভোট দেবে যারা, তাদের কেমন লাগছে সেটাই ভালোমন্দের মাপকাঠি।’
‘কিন্তু যেসব কথা বললেন…এখন কোনো ভদ্রলোক রাজনীতি করে না, রাজনীতি এখন ব্যাবসা, বড়ো পুঁজি রাজনীতিকে পকেটে পুরেছে, টাকা ছাড়া ভোট হয় না… এসব কথা কী আমার এগেনস্টেই যাচ্ছিল না?’
‘না। তোমার মামা বলছেন। লোকে ধরে নিচ্ছে ভাগনের পক্ষেই বলছেন। ক্যাম্পেনে তুমি তো এই কথাগুলোই মামার নাম করে লোকের কাছে বলবে। লোকে বুঝবে তুমি ভদ্রলোক, তুমি টাকা ছড়িয়ে ইলেকশন জিততে আসনি। ব্যাপারটা ঠান্ডা মাথায় বোঝ। তোমার অ্যাঙ্গেলটা হবে, জাগরণ চাই, বিপ্লব চাই। টাকা আর গুন্ডামির রাজনীতি নয় ভদ্রলোকের রাজনীতি চাই।…পরে তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলব, এখন তুমি কিছু টাকা দেবে আমায়।’ শ্রীমন্ত নৈর্ব্যক্তিক মুখে অনুরোধ বা আবেদন জানাল না, যেন একটা সিদ্ধান্ত পেশ করল।
‘টাকা! কত?’ ব্রজরাখালকে থতমত দেখাল।
শ্রীমন্ত আন্দাজ করেছে বিজ্ঞাপন হিসাবে ছবি ছাপাতে হাজার তিনেক টাকা বোধ হয় লাগবে। সমাচার ছাড়া অন্য কাগজে তার ঔৎসুক্য নেই। তবে সব কাগজেই দিয়ে আসবে, যদি কেউ ছাপে তো ভালোই। রামরাখাল স্কুলের রজত জয়ন্তী সভার ছবি সংবাদ হিসেবে সমাচার যে ছাপবে না এটা সে জানে।
‘হাজার তিনেক…আপাতত।’
ব্রজরাখাল ইতস্তত করে বললেন, ‘কাল সকালে নিস।’
ঘরের বাইরে জনা তিনেক লোক অপেক্ষা করছে। এরা ব্যবসায় ও বিষয় সংক্রান্ত কাজের কর্মচারী। শ্রীমন্ত বেরিয়ে আসতে তারা ঢুকল। উঠোনের ওপারে অকাদাদুর ঘরের বন্ধ দরজার নীচে একটা সাদা রেখা। ঘরের ভিতর আলো জ্বলছে। দাদু তাহলে জেগে আছেন।
দরজায় টোকা দিয়ে সে বলল, ‘আমি শ্রীমন্ত।’
‘ভেতরে আয়।’
অকাদাদু বালিশে ঠেস দিয়ে আধবসা, হাতে ইংরেজি খবরের কাগজ। ঘরটা বেশ বড়োই। নানা ধরনের বইয়ে দু-টো র্যাক ভরা তা ছাড়াও একটা টেবলের উপর স্তূপাকার। আর একটা ছোটো টেবলে ওষুধের শিশি আর ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল ছড়ানো। একটা আলনায় খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি। টুলে বসানো জল ফিলটারের ড্রাম। ঘরের লাগোয়া স্নানঘরের দরজাটা আধখোলা। দেওয়াল উজ্জ্বল সাদা। প্লাস্টিকের বাজে কাগজের চুবড়ি টেবলের পাশে। মোজাইকের মেঝে ঝকঝকে। মন্থর গতিতে পাখা ঘুরছে। কাঠের ক্যাবিনেটের উপর বসানো টিভি সেট। বিছানার চাদর বা বালিশের ওয়াড় দুধসাদা।
শ্রীমন্ত লক্ষ করেছে, অকাদাদুর জন্য তার মামা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, যে কারণেই হোক খরচে কখনো হাতটান করে না। আর তার দিদিমা সুরুচি তীক্ষ্ন নজর রাখেন, তাঁর দাদার স্বাচ্ছন্দ্যের উপর। এই ঘর পরিচ্ছন্ন ও পরিষ্কার রাখার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া আছে রেবাকে। পরামানিক রোজ সকালে দাড়ি কামাতে আসে।
‘মনে হচ্ছে এখন যেন একটু ভালো আছেন, হয়েছে কী?’
