শ্রীমন্তর মুখে হাসি ফুটল। এই সব গোলমেলে ব্যাপার ম্যানেজ করার জন্যই এখন মামা তার উপরই নির্ভর করছে। কিন্তু এতদিনে ওকে সে যতটা চিনেছে তাতে জানে, কাজ হাসিল হলে তাকেও কলা দেখাবে! সেটা যাতে না পারে তেমনভাবে আটঘাট বাঁধা দরকার। আর সেজন্যই পাবলিসিটির ব্যাপারটায় মামাকে ইমপ্রেস করতেই হবে।
‘বড়োবাবু তোমায় ডাকছে।’ দরজা থেকেই কথাটা জানিয়ে চলে গেল বিজয়। এ বাড়িতে বড়োবাবু ব্রজরাখাল, ছোটোবাবু অঞ্জন। এ ছাড়া আর কোনো বাবু নেই। মামা তা হলে ফিরে এসেছে।
অফিস ঘরে একাই, গদি আঁটা একমাত্র চেয়ারটায় ব্রজগোপাল বসে ভ্রূ কুঁচকে একটা কাগজ পড়ছিলেন। শ্রীমন্তকে দেখেই বললেন, ‘তোর টিভি-র কী হল? য়্যা, দুটো ফোটোগ্রাফারকেই তো শুধু ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম, ক্যামেরা কোথায়?’
‘আসতে পারেনি।’ তিনটে কাঠের চেয়ারের একটায় শ্রীমন্ত বসল।
‘কেন? আনতে পারিসনি কেন?’ ব্রজরাখাল টেবলে মৃদু চাপড় মেরে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। শ্রীমন্ত জানে এখন ওঁকে বোঝালেও বুঝবেন না। সে অন্য প্রসঙ্গে যাবার চেষ্টা করল।
‘সত্য মিশ্র দারুণ চটেছে। স্কুলকমিটির মিটিংয়ে গোলমাল পাকাবে।’
‘পাকাক, ওতে আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু টিভি এল না। কত লোক টিভি আসবে শুনে এসেছিল জানিস? আমার আর মুখ রইল না। আমি তখন তোর কথা শুনেই বুঝেছিলাম তুই চেষ্টা করবি না।’
‘গাড়ি কথামতোই লোকটাকে আনতে গেছল। কিন্তু ওর ক্যামেরাটা আজ সকালেই খারাপ হয়েছে, ফিল্ম রোল করছে না। ড্রাইভার ফিরে এসে আমায় জানাল। এরপর আমি আর কী করতে পারি!’ মৃদু বিষণ্ণ স্বরে কথাগুলো বলে শ্রীমন্ত অসহায়ভাবে দু-হাতের তালু মেলে ধরল। বজ্ররাখাল কাগজটা তুলে নিয়ে পড়ার ভান শুরু করতেই শ্রীমন্ত জানাল, মামার রাগ এবার পড়বে।
‘কাগজের রিপোর্ট আর ছবি বেরোবার ব্যাপারটা ভালো করে দেখ। সমাচার থেকে এসেছিল?’
‘এসেছিল মানে!’ শ্রীমন্তর জোরালো বিস্ময় মুখেচোখে উপচে পড়ল। ‘বিদ্যুৎদা তার বেস্ট রিপোর্টারদের একজনকে পাঠিয়েছিল…অসীমা পাল।’
‘অসীমা! মেয়ে?’
‘হ্যাঁ, তোমার কী চোখে পড়েনি? প্রেস টেবলেই তো বসেছিল।’
‘একটা মেয়েকে যেন দেখলাম! ও যে রিপোর্টার সেটা আর বুঝব কী করে।’
‘একটাই মুশকিল হয়ে গেছে মামা। পুরুষদের কথা ভেবেই প্যান্টের কাপড় কিনেছিলাম কিন্তু একটা মেয়ে যে এসে পড়বে এটা জানতাম না তাই উপহার আর ওকে দেওয়া হয়নি।’
‘সে কী, দেওয়া হয়নি!’ ব্রজরাখাল উদবিগ্ন হলেন, ‘সমাচারের লোক পায়নি?’
‘এ নিয়ে ভেব না, ভাবছি একটা শাড়ি কিনে কালই দিয়ে আসব ওর বাড়িতে।… তবে একটা কাজ করেছি, ভোটের আগে সমাচার সব পুরসভাগুলোর একটা সার্ভে করবে।’ শ্রীমন্ত একটু থেমে, কীভাবে জিনিসটা বানিয়ে গুছিয়ে বললে মামাকে উসকে দেওয়া যাবে সেটাই ভেবে নিল।
‘সার্ভে মানে? সেটা কী?’
‘পুরসভাগুলো কী অবস্থায় রয়েছে, কেমন কাজ হয়েছে, নাগরিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে না কমেছে, লোকেরা কী বলছে, দলাদলি কেমন, কোন পার্টির জেতার আশা আছে, চেয়ারম্যানের বক্তব্য….এই সব নিয়েই লেখা হবে।’
‘খুদিনগর পুরসভা নিয়েও হবে?’
‘নিশ্চয়। আর সেটা লিখবে এই অসীমা পাল, বুঝতে পারছ?’
শ্রীমন্তর ‘বুঝতে পারছ’টা বুঝতে ব্রজরাখাল সেকেন্ড দশেক সময় নিয়েই ব্যগ্রস্বরে বললেন, ‘খাওয়া, মেয়েটাকে খাওয়া। টাকার পরোয়া করিস না।….আজেবাজে শাড়ি নয়, বেনারসি কিনে দে।’
শ্রীমন্ত মনে মনে অট্টহাস্য শুরু করল। মাথামোটা, নির্বোধ। টাকা দিয়ে কার্যোদ্ধার করে করে ভেবে নিয়েছে সবই বুঝি কিনে ফেলা যায়। টাকা যখন আছে তখন কিছু খরচ করুক। তবে সে টাকা অবশ্যই অসীমার কাছে পৌঁছবে না।
‘আমি বলেছি খুদিনগর মিউনিসিপ্যালিটির কাজকর্ম সম্পর্কে ভিতরের সব তথ্য আমার কাছে আছে, আপনাকে আমি সাপ্লাই করব।’
‘শুনে কী বলল?’
‘বলল, তা হলে তো খুবই ভালো, খাটুনির হাত থেকে বেঁচে যাব।’
‘কিন্তু চেয়ারম্যানের বক্তব্য, মানে সত্য মিশ্রর বক্তব্য ছাপা হলে তো জিনিসটা ঠিকমতো দাঁড়াবে না।’ ব্রজরাখাল চিন্তিত স্বরে বললেন।
‘চেয়ারম্যানের কথা তো লেখায় রাখতেই হবে। সার্ভে তো নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়েই করতে হবে। তা থাকুক না সত্য মিশ্রর বক্তব্য, তার পালটা যেসব কথা থাকবে তাতেই ও ডুবে যাবে। তা ছাড়া খুদিনগরের উন্নয়নের জন্য তোমার যেসব প্ল্যান আছে সেগুলোও তুমি বলবে।’
‘প্ল্যান? কী প্ল্যান?’
‘খেলার মাঠটা ফিরে পাবার প্ল্যান। ওই জমিতে তুমি দিদিমার নামে একটা আউটডোর ডিসপেনসারি নিজের খরচে করে দেবে যদি পুরসভার কর্তৃত্ব হাতে পাও। এজন্য স্থানীয় জনগণ আর সব রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে আসতে হবে, এ কথাটাও জানিয়ে রাখবে। অবশ্য আসলে বিমল চক্রবর্তীর সঙ্গে তোমার একটা রফায় আসতেই হবে যদি লক্ষ লক্ষ টাকা দামের ওই জমিটা তুমি উদ্ধার করতে চাও। এই লোকটাই শেষ পর্যন্ত জনগণের মঙ্গলের জন্য ডিসপেনসারির দাবি তুলে, আন্দোলন করে খুদিনগর ক্লাবকে জমি থেকে উৎখাত করবে, যেমন তোমার সুপার মার্কেটের জন্য একসময় করেছিল। এ ছাড়া আর কোনোভাবেই কিন্তু তুমি আট বিঘে জমি ফিরে পাচ্ছ না।’ শ্রীমন্ত শেষ বাক্যটি এত কঠিনভাবে বলল যে, ব্রজরাখাল কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন এবং চুপ করে ভাবতে শুরু করলেন।
