‘করেছি, পাড়াতেই শ্যামল বলে একটা ছেলের বাড়িতে আছে….বিয়ে করে।’
শ্রীমন্ত ভীষণ স্বস্তি বোধ করল। বিছানায় কাত হয়ে বালিশটা বগলের তলায় রেখে বলল, ‘তা হলে এত চিন্তার কী আছে। খবর যখন পেয়েছিস, আর বিয়েও যখন করে ফেলেছে….বিয়ে করেছে তো?’
‘হ্যাঁ। রেজিস্ট্রি করে করেছে, সাক্ষী ছিল পাড়ারই দুটো ছেলে আর শ্যামলের কাকা।’ জয়ন্ত বিড়বিড় করে বেদনায় মুহ্যমানের মতো গলায় বলল।
‘ছেলেটা পাড়ার কোথায় থাকে, কী করে? এমন লুকিয়েই বা করতে গেল কেন? তোরা কিছু জানতিস না?’
‘শ্রীদুর্গা ভাণ্ডারের গা দিয়ে যে সরু গলিটা আঠারো নম্বর মাঠকোটায় গেছে সেই মাঠকোটায় থাকে। পাড়ার রুস্তম ছিল….লেখাপড়া জানে না….মিনিবাসে কন্ডাক্টরি করে।’ জয়ন্ত এরপর বিষণ্ণ চাহনি নিজের তালুতে রেখে বলল, ‘জাতে ছোটো।’
শ্রীমন্ত কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জয়ন্তর বয়স তেইশ, সিরিয়াস ধরনের, বি-এ পার্ট টু পড়ছে। বোন না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে বলে নয়, আঘাতটা অন্য দিক থেকে ও পেয়েছে।
‘তা এখন কী করার আছে?’
‘পাড়ায় সবাই হাসাহাসি করছে, বাড়ির সবার কথা তো ছেড়েই দিচ্ছি। বাড়ি থেকে বেরোলে পাড়ার লোক তাকিয়ে দেখে….শেষকালে আমাদের বংশের মেয়ে কি না বিয়ে করল একটা ছোটো জাতকে! এর থেকে লজ্জার আর কিছু আছে?’ রাগে উত্তেজনায় লালচে দেখাল জয়ন্তর মুখ। স্বর কেঁপে গেল।
শ্রীমন্ত আশ্চর্য বোধ করতে লাগল। এত অল্পবয়সি শহুরে, কলেজ-ছাত্রর মনের মধ্যে, বিংশ শতাব্দীর আশির দশকেও এমন একটা সংস্কার দিব্যি কেমন টাটকা রয়েছে!
‘ছেলেটা যদি মিনিবাস কনডাকটর না হয়ে মিনিবাসের মালিক হত, তা হলে তুই লজ্জা পেতিস?’
জয়ন্ত একটু দিশাহারা হয়ে, উত্তর হাতড়াতে শুরু করল, ‘তুমি বুঝতে পারছ না দাদা আমাদের সবার অবস্থাটা, কেউ মুখ দেখাতে পারছি না।’
শ্রীমন্তর মনে পড়ল, উলঙ্গ পাগল বাবাকে রাস্তা থেকে পাড়ার লোকেরা ধরে এনে যখন বাড়িতে দিয়ে গেছল। তারা সবাই লজ্জা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পাড়ার কেউ মুখ টিপে হাসেনি, বেদনা আর সহানুভূতি নিয়ে বাবার অবস্থা জানতে কথা বলত। তাদের আর কখনো লজ্জা পাওয়ার কথা ভাবতে হয়নি।
‘দু-চারদিন লোকে ফিসফাস করবে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, তারপর নিজেদের এতরকম সমস্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে কেউ আর এই নিয়ে সময় নষ্ট করবে না।’ শ্রীমন্ত লজ্জার গর্ত থেকে ভাইকে টেনে তোলার জন্য সান্ত্বনা দিল। ‘আজ যে মুখ টিপে হাসছে তার মেয়েই যে এমন একটা কাণ্ড বাধাবে না, এর কী কোনো গ্যারান্টি আছে?’
‘কিন্তু দাদা চোখের সামনে দিপা এখন সিঁদুর মাথায় পাড়া দিয়ে হাঁটাচলা করবে আর আমাদের তা দেখতে হবে?…মা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তুমি একবার চলো।’
‘যাব। আজ এখানে খুব জরুরি কাজ রয়েছে, বাড়ি গেলে মামা ভীষণ চটে যাবে। তুই যা এখন, কাল যাব। আর মাকে বুঝিয়ে বল, এসব ঘটনা আকছারই হচ্ছে। কুড়ি বছর বয়স, সাবালিকা নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই যখন ঠিক করে নিয়েছে তখন আমাদের আর বলার বা দুঃখ পাবার কী আছে?….তবে লুকিয়ে চুরিয়ে করাটাই যা খারাপ লাগছে, এতে আমাদের প্রতি যেন অবিশ্বাস, অনাস্থাই দেখানো হল।….তোরা কি কিছুই আঁচ করতে পারিসনি?’
‘এতটা যে গড়িয়েছে, কিছু বোঝা যায়নি। পাড়ার অনেক ছেলের সঙ্গেই কথা বলত, ওর সঙ্গেও বলত। কিন্তু তাই থেকে যে-।’ জয়ন্ত উঠে দাঁড়াল। ‘কালই তুমি এসো আর একবার দিপার সঙ্গে দেখা করে ওকে বলো, পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকুক। চোখের সামনে ওকে আর সহ্য করা যায় না।’
শ্রীমন্ত চুপ করে রইল। জয়ন্ত বেরিয়ে যাচ্ছিল, দাদার ডাকে দাঁড়াল। পাল্লা খুলে দেওয়াল আলমারি থেকে পলিথিনের একটা থলি বার করে শ্রীমন্ত ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা নিয়ে যা, দর্জিকে দিয়ে করিয়ে নিবি।’
‘কী এটা?’
‘প্যান্টের কাপড়।’ কথাটা বলে শ্রীমন্তর মনে মুহূর্তের জন্য গ্লানির ছায়া পড়েই সরে গেল। প্যান্টের কাপড়গুলো সাংবাদিকদের উপহার দেবার জন্য মামার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কেনা। দুটো কাপড় বেঁচে গেছে, কিন্তু তার একটা নিজের ভাইকে দেওয়াটা ঠিক চুরিই কি না শ্রীমন্তর তা স্বীকার করতে দ্বিধা হচ্ছে।
জয়ন্ত আর একবার বলে গেল, ‘কাল অবশ্যই যেয়ো।’
উপহার দেওয়ার মধ্যে অসাধু একটা মতলব তো রয়েছেই সুতরাং সেটা কে পেল তার বিচার করে লাভ কী! বিছানায় টানটান হয়ে চোখের উপর দিয়ে আড়াআড়ি হাত রেখে শ্রীমন্ত ভাবল, সে শুধু বাটপাড়ি করেছে মাত্র। খবরের কাগজের ওই তিনটে লোকের তো উপহার পাওয়ার কথা নয়, দিলেও নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু একটা গরিব পরিবারের ছাত্রের….শ্রীমন্ত নিজেদের পরিবারকে মনে মনে গরিব ভাবতে দ্বিধা করল না। জয়ন্ত খুব কষ্ট করেই কলেজে পড়ছে, একটা ছোটো প্রতিষ্ঠানের তৈরি ফিনাইল আর পোকামাকড় মারার ওষুধ বাড়ি বাড়ি বিক্রি করত, হয়তো এখনও করে। প্যান্ট পিসটা ওরই পাওয়া উচিত। ব্রজরাখাল মুখুজ্জের মতো ধুরন্ধর, পয়সাওলা, হামবাগের কয়েকটা টাকা গেল তো কী হয়েছে, লোককে টুপি পরিয়ে কম টাকা তো উপায় করেনি!
বিমল চক্রবর্তীকে একটা ঘর দেব বলে কাজ হাসিল করে মামা কলা দেখিয়েছিল। বিমল তার শোধ নিয়েছিল ক্রস ভোটিং করে। এটা এখন সবাই জানে। এবারও লোকটা হেসে-খেলে গতবারের মতো দু-হাজার মার্জিনে জিতবে আর আবার ব্রজরাখালকে চেয়ারম্যান হতে দেবে না। বিমলের সঙ্গে এবার ভিড়েছে আরও দু-জন কমিশনার। ওরাও এবার দাঁড়াবে আর জিতবে। খুদিনগর স্পোর্টিং ক্লাবের রামানন্দ সরখেল তো বিমল গোষ্ঠীরই লোক। সুতরাং মামার আট বিঘে ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণই।
