‘এখানে আপনার মামার বাড়ি?’
‘হ্যাঁ। এখানেই আছি।’
‘নিজের বাড়ি তা হলে কোথায়?’ শ্রীমন্ত অস্বস্তি বোধ করল। কথাবার্তা ব্যক্তিগত দিকে মোড় নিচ্ছে। হয়তো এবার জানতে চাইবে কেন মামারবাড়ি থাকেন? কী কাজ করেন? অবশ্য অতদূর কৌতূহলকে টানবে না কিন্তু মনে মনে তার সম্পর্কে একটা কিছু তো ধারণা করবেই।
‘আমি থাকি কলকাতায়, দর্জিপাড়ায়। এখানে মাঝে মাঝে আসি। মামার নানারকমের ব্যাবসা, বিষয়সম্পত্তি, তার উপর রাজনীতিতে জড়িয়ে আর সামলাতে পারে না। এক ছেলে, সে কিছুই বোঝে না, দেখে না, কলকাতাতেই সারাদিন কাটায়, রবীন্দ্রসংগীত গায়।….আমি মামাকে হেল্প করি।’
‘ইলেকশন তো এসে গেল।….আমার নামার জায়গাও এসে গেল। গাড়িটা একটু থামান।’ ড্রাইভারের দিকে ঝুঁকে অসীমা বলল। গাড়ি থামল।
‘এটা তো বাসস্টপ। এই যে বললেন এখান থেকে ভেতরে হেঁটে-।’
‘হ্যাঁ, মিছিমিছি কেন আবার যাবেন। হেঁটেই চলে যাব।’
‘না, না, বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি যাবে, রাস্তাটা বলে দিন।’
‘আপনার আতিথেয়তায় একটুও খুঁত রাখবেন না দেখছি।….ডানদিকে সোজা, তারপর আবার ডানদিক।’
গাড়ি ডানদিকে ঘুরল। এটা খুদিনগর পুরসভা এলাকা নয়। তবে খোয়া ওঠা রাস্তার গর্ত, আলো না জ্বলা বাতিস্তম্ভ, নর্দমার পাঁকের গন্ধ খুদিনগরেরই মতো। গাড়ি খুব মন্থর চলেছে।
‘ইলেকশন আসছে, এখন কিছু কাজ দেখানো হবে। এইসব পুরসভা কেন যে আছে, কী যে কাজ করে-।’ অসীমা হতাশ, বিরক্তস্বরে বলল সামনে তাকিয়ে।
‘এই নিয়েই তো ফিচার লিখতে পারেন। এই জেলার সব কটা পুরসভার একটা সার্ভে করে যদি কোথাও পর পর ছাপাতে পারেন….লোকে মানে ভোটাররা তা হলে একটু সচেতন হতে পারে।’ শ্রীমন্ত ইতিমধ্যেই একটা চমৎকার সম্ভাবনার হদিশ দেখতে পেয়েছে। যদি পুরসভা নিয়ে কিছু লেখার জন্য অসীমাকে উসকে দেওয়া যায় তা হলে খুদিনগর নিয়ে লিখবেই। একে যদি ভালো করে ব্রিফ করা যায় তা হলে মামার ক্যাম্পেনে সুবিধা হবে। ওইসব লেখা থেকে তুলে তুলে বলার সুযোগ পাওয়া যাবে।
এবার ডানদিকে….কে ছাপবে। ঘোরাঘুরি করে লিখতে তো পারি….ব্যস ব্যস।’
‘সমাচার তো ছাপতে পারে।’
‘আমি কী সমাচারের মালিক নাকি যে লেখা দিলেই ছাপা হবে!’ অসীমা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়াল।
‘আপনি বিদ্যুৎদাকে কথাটা বলে দেখুন না। আপনাকে আমি নানান মেটিরিয়াল দিতে পারব, বিশেষ করে আমাদের পুরসভার।’
‘আচ্ছা, বলে দেখব।’
রাস্তা থেকে দু-তিন গজ দূরেই নীচু পাঁচিল। কাঠের একপাল্লার বেড়ার আগল। সেটা খুলে অসীমা ঢুকল।
গজ দশেক ভিতরে পলেস্তরাহীন, অসমাপ্ত একতলা দু-খানা ঘর। বাইরে ছোটো দালান। লুঙ্গি পরা শার্ট গায়ে এক বৃদ্ধ, মাদুরে বসে কম ওয়াটের বালবের আলোয় একটি শিশুকে স্লেটে লেখাচ্ছেন। দালানটা সিমেন্ট দিয়ে পাকা করা নয়। ঘরের গায়ে নীচু টালির চালের রান্নাঘর। সেখানে লম্ফ জ্বেলে কেউ রান্না করছে। গাড়ি ছেড়ে দেবার আগে শ্রীমন্ত শুধু এইটুকুই দেখার সময় পেল।
‘নাগেরবাজার?’ ড্রাইভার জানতে চাইল।
‘না, বাড়ির কাছে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তুমি স্কুলে চলে যাও। আর আমার গাড়ির দরকার নেই।’
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে শ্রীমন্ত হেঁটে ফিরে এল। বৈঠকখানায় জয়ন্তকে দেখেই সে অবাক হয়ে বলল, ‘তুই! কী ব্যাপার?’
জয়ন্ত বড়দাকে দেখামাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে। থমথমে, গম্ভীর মুখ। চাপা গলায় বলল, ‘বলছি, তোমার ঘরে চলো।’
নিজের ঘরে এসে শ্রীমন্ত আলো জ্বালল। ঘরটা প্রায় ফাঁকাই। দেওয়াল-আলনায় দুটো প্যান্ট, টিশার্ট, পাজামা আর গামছা। ঝুলছে একটা ছোটো আয়না। টুলের উপর কুঁজো আর গ্লাস, একটা তক্তপোশে হ্যান্ডলুমের রঙিন বেডকভারে ঢাকা বিছানা, পাল্লা বন্ধ দেওয়াল আলমারিতে কিছু জিনিসপত্র আর একটা পলিথিনের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। একটা টেবল বা চেয়ারও নেই।
‘বল। আবার কোনো গোলমাল?’
‘হ্যাঁ, তবে মেজদাকে নিয়ে নয়।….দু-দিন হল দিপু বাড়ি নেই।’ জয়ন্ত বিছানায় বসে তার বড়দার মুখের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন শ্রীমন্ত জানে তাদের বোন কোথায়।
চার ভাইয়ের পর সুদীপা বা দিপু। বয়স একুশ। স্কুলে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার জন্য চার বছর সময় নিতেই শ্রীমন্ত বলেছিল, ‘আর ওকে পড়িয়ে টাকা নষ্ট করে লাভ নেই। স্কুলে সিট না পেয়ে কত ভালো মেয়ে ভরতি হতে পারে না। একটা সিট খালি হলে হয়তো এমন কেউ পড়তে পারবে যাকে দিয়ে পরিবারের বা সমাজের উপকার হবে।’
পড়াশুনো আর করতে হবে না জেনে দিপু হাঁফ ছাড়ে বটে, তবে দু-খানি ঘরের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখার কোনো ইচ্ছা তার চঞ্চল চরিত্রে ছিল না। বিরাট পুরোনো তিনতলা বাড়িতে নিকট-দূর সম্পর্কের কাকা-জ্যাঠাদের এগারোটি সংসার। পোষা বেড়াল ও কুকুর ছাড়াও প্রায় অর্ধশত প্রাণী এই বাড়িতে মাথা গুঁজে আছে ঈর্ষা, বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাপাচুপি দিয়ে। দিপু এই চাপ থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় হাঁফ ছাড়তে পাড়ার বান্ধবীদের গৃহে বা অন্য কোথাও গমনটা বাড়িয়ে ফেলল। শ্রীমন্ত বাড়িতে থাকলে হয়তো এটা লক্ষ করতে পারত কিন্তু যেটুকু সময় সে থেকেছে তাতে দিপুর বহির্মুখিনতা তার নজরে আসেনি।
‘বাড়ি নেই তো কোথায়? খোঁজখবর করেছিস?’ শ্রীমন্ত তার সন্ত্রস্ত বোধটা বিরক্তি দিয়ে মুড়ে দিল।
