‘ঘরেই আছেন, বললেন মাথা ধরেছে। শুয়ে পড়লেন।’
‘ওঁকে এই রোগ আবার কবে ধরল!’ বলেই উদবিগ্ন হয়ে এক পা এগিয়েই বলল, ‘বিজয়দা একটা প্লেট সাজিয়ে দাও, একজন এসেছে।’ তারপর সে বন্ধ দরজার সামনে এসে নীচু গলায় ডাকল, ‘দাদু, ঘুমিয়েছেন নাকি?’
‘শ্রীমন্ত? ভেতরে আয়।’
দরজা ভেজানো ছিল। ভিতরে অন্ধকার।
‘আলো জ্বালব?’
‘না, থাক। কিছু বলবি?’
‘শরীর খারাপ? তখন বক্তৃতাটা হঠাৎ যে বন্ধ করলেন?’
‘মনে হল অনর্থক অকারণে বলছি, কেউ শুনছে না। তা ছাড়া পেটে তখন এমন একটা অস্বস্তি শুরু হল যে-।’
‘হজমের গোলমাল? আপনার কাছে অ্যান্টাসিড কিছু থাকে তো খেয়ে নিন।’ শ্রীমন্ত খাটের পাশে এসে দাঁড়াল।
‘না না ওসব কিছু নয়।’
‘একটি মেয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কাগজেটাগজে লেখালেখি করে, যাকে বলে ফ্রি-ল্যান্সিং। আজ এখানে এসেছে সমাচারের হয়ে রিপোর্ট করার জন্য। আপনার কথাগুলো ওর খুব ভালো লেগেছে, এই নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে চায়। আলাদা প্রবন্ধ লিখবে।’
‘আজ থাক। দু-দিন পরে আসতে বল।’
শ্রীমন্ত চুপ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে আসছে, অক্ষয়ধন আবার বললেন, ‘আমি এমন কী বলেছি যে প্রশ্ন জাগতে পারে? কী জানি!….তুই ওকে দিনকয়েক পরেই আসতে বল।’
বৈঠকখানায় শ্রীমন্তর সঙ্গেই খাবারের প্লেট আর জলের গ্লাস হাতে বিজয়ও ঢুকল। অসীমার সামনে টেবলে প্লেট রাখামাত্র সে বলল, ‘আমি কিছু খাব না।’
শ্রীমন্ত বিস্মিত ও বিনয়াবনত হয়ে গেল।
‘সে কী! আতিথেয়তার সুযোগ পেয়েও হারাব? একটু মিষ্টিমুখ না করলে কিন্তু দুঃখ পাব।’
‘আমি মিষ্টি খাই না আর ভাজাভুজি মানে তেল-ঘি পেটে একদমই সহ্য হয় না। কিছু মনে করবেন না।’
‘গ্যাস্ট্রিক?’
‘অক্ষয়ধনবাবু কী বললেন?’
তার প্রশ্ন অর্থাৎ কৌতূহলটাকে কোনো পাত্তা না দিয়ে অসীমা পালের পালটা জিজ্ঞাসায় শ্রীমন্ত অপ্রতিভ হয়ে মনে মনে চটে উঠল। তাই দ্বিগুণ বিনয় সহকারে বলল, ‘দাদুর শরীরটা খুব খারাপ, শুয়ে পড়েছেন। আপনি কি দিনদুয়েক পর আসতে পারবেন?’
‘কেন পারব না! তাই আসব।’ ঝোলাটা হাতে নিয়ে অসীমা উঠে দাঁড়াল। ‘সকালের দিকেই তো ওনার সুবিধে?’
‘সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধে যখন খুশি আসতে পারেন। উনি দুপুরে ঘুমোন না।’
অসীমা দরজা পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্লেটের দিকে তাকাল। ‘কম মিষ্টি আছে কোনটাতে?’
শ্রীমন্তর চার-পাঁচ সেকেন্ড লাগল কথাটা বুঝে উঠতে। তারপরই ব্যস্ত হয়ে প্লেটটা তুলে এগিয়ে এল।
‘ওই চৌকো সন্দেশটা নিন, কম মিষ্টি।’
দু-আঙুলে সন্দেশটা তুলে মুখে ফেলার আগে অসীমা বলল, ‘অভব্য ভাবার সুযোগ দিতে আমি রাজি নই।’
‘না না, তা ভাবব কেন! অনেকে অনেক কিছুই খায় না, তার পিছনে নানান কারণও থাকে। বাবা মারা যাবার পর আমার মা ফুলকপি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, কারণ বাবা ফুলকপি খুব ভালোবাসতেন। ….নিন আর একটা।’
‘না না, একটাই….আপনার অনুরোধ রাখতেই খেলাম।’ অসীমা জলের গ্লাস তুলে নিল। শ্রীমন্ত প্রীত বোধ করল কিন্তু ধরেই নিল অনুরোধ-টনুরোধ বাজে কথা, আসলে খিদে পেয়েছে। সন্ধ্যার ঠিক পরেই এই সময়টায় সবারই খিদে পায়।
‘আপনার কথায় সাহস পেয়ে তা হলে আর একটা অনুরোধ করব।’
ধাঁধায় পড়া চোখে অসীমা চেয়ে রইল। শ্রীমন্ত কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলল, ‘রজতজয়ন্তী কমিটি অতিথিদের জন্য সামান্য উপহার রেখেছে, আপনি যদি দয়া করে নেন।’
‘উপহার! কী জন্য?’
‘আপনি আসায় আমরা আনন্দ পেয়েছি, তাই।’
কথাটা বলেই শ্রীমন্তর মনে হল বড্ড কাঁচা, ভ্যাদভেদে ডায়লগ। এতটা ন্যাকামো করে না বললেও চলত। বুদ্ধি রাখে, হয়তো মনে মনে হাসছে। তা ছাড়া এই মেয়ে বিনা উপহারেই, নিজের গরজেই যা লেখার লিখবে। ভদ্রতার বাড়াবাড়ি করলেই বরং বিগড়ে যেতে পারে।
‘কী উপহার দেবেন? আমার কলমের রিফিলটা শেষ অবস্থায়, যদি একটা দিতে পারেন-।’
শ্রীমন্ত হাঁফ ছাড়ল। বুকপকেট থেকে কলম তুলে এগিয়ে ধরে বলল, ‘রিফিলটা কালই কলমে ভরেছি, এটাই নিন। কলমটার দাম এক টাকা সুতরাং আপনি একে নিশ্চয় উপহার পর্যায়ে ফেলবেন না।’
অসীমা হাসল এবং এই প্রথম শ্রীমন্তর মনে হল মেয়েটির একটা আলগা লাবণ্য আছে। ওর মুখের শুকনো কঠিন ভাবের নীচে বিছানো আছে কোমল আস্তরণ।
কলমটা ঝোলার মধ্যে রেখে অসীমা বলল, ‘গাড়িটাড়ির দরকার নেই, বাসেই চলে যাব।’
‘আমার দরকার আছে নাগেরবাজার যাওয়ার, আপনাকে লিফট দিতে পারি।’ শ্রীমন্ত মিথ্যাকথাটা বলল একটা উদ্দেশ্যেই, অসীমার বাড়িটা চিনে রাখার জন্য।
গাড়িটা বাসরাস্তার দিকে ঘোরার সময় অসীমা বলল, ‘তখন ওই লোকটি কী বলতে চাইছিল বলুন তো?….ওই যে রাস্তায় আপনি যখন ডেকে আমায় দাঁড় করালেন?’
‘ওহহ….সত্য মিশ্র, এখানকার মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। ওঁকে মঞ্চে না তুলে নীচে চেয়ারে বসতে দেওয়ায় রেগে গেছেন। ব্যাপারটা ঠিক হয়নি মানছি তবে এটা কেন হল বুঝতে হলে এখানকার রাজনীতিটাও জানা দরকার। তা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে, দরকার নেই এখন শুনে, তবে আমার মামা ব্রজরাখাল মুখুজ্জে গতবার চেয়ারম্যানশিপের জন্য বামফ্রন্টের ক্যান্ডিডেট ছিলেন কিন্তু ক্রস ভোটিংয়ে এই সত্য মিশ্র বেরিয়ে গেলেন। সেই থেকে মামার রাগ তাই ওঁকে মঞ্চে জায়গা দেননি।’
