‘তোমার মামার কী একটুও ভব্যতাবোধ নেই শ্রীমন্ত।’ সত্য মিশ্র ঈষৎ উত্তেজিত স্বরে এগিয়ে আসা শ্রীমন্তকে বলল। ‘যে মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যে স্কুল তার চেয়ারম্যানকে ডায়াসে বসানো উচিত। জানো কোথায় বসতে দিয়েছিল?’
‘ক্ষমা চাইছি সত্যবাবু। ভুল হয়ে গেছে।’ শ্রীমন্ত হাতজোড় করল।
‘ভুল! এটাকে ভুল বলছ? প্রাক্তন ছাত্র বলে তিনটে চ্যাংড়াকে তো ডায়াসে বসাতে ভুল হয় না!….স্কুল কমিটিতে আমারও লোক আছে, আমি কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা চাইব….আর তোমার টিভি-র কী হল? অ্যাঁ, এই শুনলুম টিভি-তে নাকি জনে জনে মুখ দেখানো হবে! এখন তো জনে জনে মুখ টিপে হাসছে। তা সেই সব হাসিমুখই কী ক্যামেরায় তোলা হল নাকি?’
‘প্রেস লেখা একটা টেবিলও দেখলাম।’ সত্য মিশ্রর সঙ্গীদের একজন টিপ্পুনি কাটল। ‘ফটো-টটোও খুব তোলা হচ্ছিল।’
‘কাগজে ছবি দেখব, রিপোর্টও পড়ব।’ সত্য মিশ্র কথাটা বলেই অসীমা পালের দিকে একনজরে তাকিয়ে এগিয়ে গেল মুচকি হেসে।
‘আপনি কী চলে যাচ্ছেন? গাড়ি আপনাকে দিয়ে আসবে, আসুন আসুন একটু মিষ্টিমুখ না করলে কী হয়? অকাদাদুর সঙ্গেও তখন কথা বলে নেবেন।’
‘ওঁর খোঁজ নিতে গিয়ে শুনলাম বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আচ্ছা চলুন, কথা বলে একটা দিন ঠিক করে আবার আসব।’
দু-জনে ব্রজরাখালের বাড়ির পথ ধরল। শ্রীমন্তর ঘাড়ে যে দায়িত্ব তার অর্ধেকটা আজকের মতো শেষ, শুধু অসীমা পালকে আপ্যায়নটাই বাকি। এর পর রিপোর্ট আর ছবি ছেপে বার করার জন্য কাগজের নিউজ এডিটরদের ত্যালানোর কাজ শুরু হবে। এটা লটারির টিকিট কাটার মতো। এক কলম ছবির সঙ্গে এক প্যারা লেখা ছাপা হলে ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া হয়েছে মনে করতে হবে। তবে শ্রীমন্ত ধরেই রেখেছে, ছবি ছাপাতে তাকে বিজ্ঞাপন বিভাগের সঙ্গেই কথা বলতে হবে।
‘আমি ভেবেছিলাম আপনি বাকি অনুষ্ঠান দেখে যাবেন।’ শ্রীমন্ত এই বলে আলাপ শুরু করল।
‘না, নাচগান ম্যাজিক আর ভালো লাগে না।’ শুকনো নিস্পৃহ স্বর। বোধ হয় অসীমা পাল ক্লান্ত। মুখের দিকে আড়চোখে শ্রীমন্ত তাকিয়ে নিল।
‘দাদুর বক্তৃতা কেমন লাগল?’
‘খুব সংক্ষেপেই বললেন। আরও কিছু শুনতে চাই বলেই ওঁকে ইন্টারভিউ করব। এই পরিবেশ দূষণ নিয়ে কে কীরকম ভাবছেন তাই নিয়ে একটা লেখা লিখব।’
‘কোথায়?’
‘দৈনিকে নয় কোনো ম্যাগাজিনেই, দেখি কথা বলে।’
আলাপের এইখানেই সমাপ্তি। শ্রীমন্তর মনে হল অসীমা যেন নিজের ওজন বাড়াবার জন্য শব্দগুলোকে আলুর সাইজ বাছাইয়ের মতো মেপে মুখ থেকে বার করল।
‘দাদু খুব ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার।’
কোনো উত্তর এল না।
‘বিয়ে করেননি কিন্তু খুব রসিক লোক।’
এতেও উত্তর এল না।
‘উনি কিন্তু নিজের অতীত জীবন নিয়ে কখনো কথা বলেন না।’
এবারও উত্তর নেই। সাধারণ ভদ্রতাবোধটুকুও নেই নাকি? তাকে কী এলেবেলে ভেবে কথা বলার যোগ্য মনে করছে না? শ্রীমন্তর মাথাগরম শুরু হতেই নিজেকে বলল : বাপু হে, ঠান্ডা হও। তোমার দরকার রিপোর্ট ছাপানো আর এই মহিলা সেটি লিখবেন। একে এখন খুশি রাখ। তোমাকে যে কাজের জন্য ব্রজমামা টাকা দেয় সেই কাজটা মন দিয়ে করো নইলে এক লাথিতে তোমাকে আবার দর্জিপাড়ায় পাঠিয়ে দেবে। আর রামরাখাল উচ্চচ বিদ্যায়তন রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির তরফে ব্রজমামার নাম করে একটা শাড়ি কালই ওকে দিয়ে এসো।
‘আমি ওঁর অতীত জীবন জানতে চাই না।’ অবশেষে একটা উত্তর এল। ‘বর্তমান সম্পর্কে ওঁর চিন্তাভাবনাটা শুধু চাই।’
শ্রীমন্ত উত্তর দিল না। শোধ নেওয়ার জন্য নয়, আসলে সে অকাদাদুর সঙ্গে কখনো গম্ভীর বিষয় নিয়ে কথাই বলেনি। ওঁর চিন্তাভাবনার হদিশ তার জানা নেই।
‘হ্যাঁ, কথা শুনে ওঁকে ইন্টারেস্টিংই মনে হল।’
তা হলে তার কথা কানে ঢুকেছে, মাথাতেও এতক্ষণ ধরে রেখেছিল। শ্রীমন্ত এবার তার বিশেষ ধরনের হদিশটা ঠোঁটে লাগিয়ে অসীমার দিকে মুখ ফেরাল। ঠিক সেই সময় মুখ নীচু করে অসীমা, ভ্রূ কুঁচকে কী যেন একটা ডিঙিয়ে যাচ্ছে। হাসিটার অপমৃত্যুতে সে ক্ষুণ্ণ হল।
ফাংশন শুনতে ব্রজরাখালের স্ত্রী, পুত্র, শ্বশুরবাড়ি থেকে আসা মেয়ে স্কুলে গিয়েছে। যাননি ব্রজরাখালের মা, শ্রীমন্তর দিদিমা সুরুচি। বয়স চুয়াত্তর, দাদা অক্ষয়ধনের মতোই ছোটোখাটো আকৃতির, উজ্জ্বল শ্যামা। নারকেল ছোবড়ার মতো কাঁচাপাকা ছাঁটা চুল ঘাড়ের কাছে ইঞ্চি তিনেক ঝুলছে। দেহ সামর্থ্য স্থূলকায়া পুত্রবধূর থেকে বেশি, দাপটে থরহরি না হলেও ব্রজরাখালের মাথাটা মায়ের সামনে দাঁড়ালেই পাঁচ ডিগ্রি ঝুঁকে যায়।
বাড়ির সামনে মারুতিটা দাঁড়িয়ে। শ্রীমন্ত ড্রাইভারকে অপেক্ষা করতে বলল। বৈঠকখানায় বসেই অসীমা বলল, ‘অক্ষয়ধনবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করব।’
‘নিশ্চয়।’
শ্রীমন্ত ব্যস্ত হয়ে ভিতরে গেল। মোজাইক করা লম্বা দালানের বাঁদিকে প্রথমেই উপরে যাবার সিঁড়ি। তার পাশে ব্রজরাখালের অফিসঘর। দালান থেকে দু-ধাপ নামলে একটা পাথর বসানো উঠোন। এই উঠোনকে বেড় দিয়ে দালানটা পশ্চিম থেকে পুবে গেছে। সেখানে পরপর কয়েকটি ঘর। তারই একটিতে থাকেন অক্ষয়ধন। এর পর দালানটা ডানদিকে ঘুরে সরু হয়ে শেষ হয়েছে শ্রীমন্তর ঘরে।
দালানে আলো জ্বলছে। পুরনো, মাঝবয়সি চাকর বিজয় সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল। অকাদাদুর ঘরের দরজা বন্ধ দেখে শ্রীমন্ত তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদু তো এইমাত্র ফিরলেন, গেলেন কোথায়?’
